ঢাকা ০৭:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

১৮ বছর মালয়েশিয়ার কারাগারে, ফিরে দেখেন স্ত্রী অন্যের ঘরে

সিনিয়র প্রতিবেদক, নরসিংদী
  • সর্বশেষ আপডেট ০২:২৩:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫
  • / 95

১৮ বছর মালয়েশিয়ার কারাগারে, ফিরে দেখেন স্ত্রী অন্যের ঘরে

নরসিংদীর চরদিঘলদী ইউনিয়নের জিতরামপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম দালালের প্রলোভনে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন বহু বছর আগে। শুরুতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও এক সময় সব বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবার ধরে নেয়—জাহাঙ্গীর আর বেঁচে নেই। এমন ভুল ধারণা নিয়েই কেটে গেছে ১৮টি বছর।

অবশেষে চলতি মাসের ৭ নভেম্বর দেশে ফিরেছেন তিনি। ফিরে এসে দেখেন—বাবা–মা আর জীবিত নেই, আর স্ত্রীও দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে অন্য পরিবারে গেছেন।

৬৬ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর পেশায় ছিলেন জেলে। বিশাল মেঘনা নদীতে মাছ ধরেই চলত তাঁর জীবন। বাবা-মা, স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে ছিল তার পরিবার। কিন্তু এক পর্যায়ে দালালের কথায় অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভাবনা।

প্রথমদিকে যোগাযোগ থাকলেও পরে হঠাৎই সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সবাই ধরে নেয়—তিনি আর বেঁচে নেই।

নরসিংদী সদর উপজেলার ইউএনও আসমা জাহান জানান, ২১ অক্টোবর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ফোন আসে। কাউন্সেলর (লেবার) সৈয়দ শরীফুল ইসলাম জানান—এক বাংলাদেশি লোক ক্যাম্পে আটক আছেন, যার কাছে পাসপোর্ট, আইডি কার্ড বা কোনো কাগজপত্রই নেই। অসুস্থতার কারণে কথা বলেন না, ফলে পরিচয়ও নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না।

পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় হাইকমিশন সামাজিক মাধ্যমে তার ছবি প্রকাশ করে পরিচয় জানতে চায়। অনেকেই নিজেদের স্বজন বলে দাবি করলেও যাচাইয়ে কেউই সত্য প্রমাণ করতে পারেননি।

ঠিক তখনই নরসিংদীর একজন ব্যক্তি মন্তব্য করেন—লোকটি চরদিঘলদীর কেউ হতে পারেন। বিষয়টি নিশ্চিত করতে ইউএনও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে একটি পরিবারকে চিহ্নিত করে জানা যায়—এটাই ১৮ বছর ধরে নিখোঁজ জাহাঙ্গীর আলম।

পরিবারটি আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে বিনামূল্যে দেশে ফেরানোর আবেদন করেন ইউএনও।

দেড় যুগ পর ৭ নভেম্বর দেশে পৌঁছান জাহাঙ্গীর। পরিবার তাকে গ্রহণ করলেও তিনি এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। এত বছরের কারাবাসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়েছেন, বাকশক্তিও প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন। কখনো চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন, আবার কখনো অঝোরে কেঁদে ফেলেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসন তার হাতে ২০ হাজার টাকা আর কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেয়। সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন তিনি নরসিংদী জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

জাহাঙ্গীরের বড় ছেলে আমান উল্লাহ বলেন, “বাবাকে আমরা আর কখনো পাব না ভেবেছিলাম। এখন উনি ফিরে এসেছেন—এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

চরদিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোসা. সেলিনা আক্তার বলেন, পরিষদ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা চলছে। তিনি আরও বলেন—দালালের প্রলোভনে কেউ যেন এমন ভুল না করে, সে জন্য তারা এলাকাবাসীকে সচেতন করছেন।

নরসিংদী সদর উপজেলার ইউএনও  আসমা জাহান সরকার বলেন, “অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কখনোই শুভ হয় না। একটি ভুল সিদ্ধান্ত কোনো পরিবারের সারাজীবনের জন্য কান্না বয়ে আনতে পারে—জাহাঙ্গীর আলমের ঘটনা তার বাস্তব উদাহরণ।”

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

১৮ বছর মালয়েশিয়ার কারাগারে, ফিরে দেখেন স্ত্রী অন্যের ঘরে

সর্বশেষ আপডেট ০২:২৩:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫

নরসিংদীর চরদিঘলদী ইউনিয়নের জিতরামপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম দালালের প্রলোভনে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন বহু বছর আগে। শুরুতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও এক সময় সব বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবার ধরে নেয়—জাহাঙ্গীর আর বেঁচে নেই। এমন ভুল ধারণা নিয়েই কেটে গেছে ১৮টি বছর।

অবশেষে চলতি মাসের ৭ নভেম্বর দেশে ফিরেছেন তিনি। ফিরে এসে দেখেন—বাবা–মা আর জীবিত নেই, আর স্ত্রীও দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে অন্য পরিবারে গেছেন।

৬৬ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর পেশায় ছিলেন জেলে। বিশাল মেঘনা নদীতে মাছ ধরেই চলত তাঁর জীবন। বাবা-মা, স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে ছিল তার পরিবার। কিন্তু এক পর্যায়ে দালালের কথায় অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভাবনা।

প্রথমদিকে যোগাযোগ থাকলেও পরে হঠাৎই সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সবাই ধরে নেয়—তিনি আর বেঁচে নেই।

নরসিংদী সদর উপজেলার ইউএনও আসমা জাহান জানান, ২১ অক্টোবর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ফোন আসে। কাউন্সেলর (লেবার) সৈয়দ শরীফুল ইসলাম জানান—এক বাংলাদেশি লোক ক্যাম্পে আটক আছেন, যার কাছে পাসপোর্ট, আইডি কার্ড বা কোনো কাগজপত্রই নেই। অসুস্থতার কারণে কথা বলেন না, ফলে পরিচয়ও নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না।

পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় হাইকমিশন সামাজিক মাধ্যমে তার ছবি প্রকাশ করে পরিচয় জানতে চায়। অনেকেই নিজেদের স্বজন বলে দাবি করলেও যাচাইয়ে কেউই সত্য প্রমাণ করতে পারেননি।

ঠিক তখনই নরসিংদীর একজন ব্যক্তি মন্তব্য করেন—লোকটি চরদিঘলদীর কেউ হতে পারেন। বিষয়টি নিশ্চিত করতে ইউএনও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে একটি পরিবারকে চিহ্নিত করে জানা যায়—এটাই ১৮ বছর ধরে নিখোঁজ জাহাঙ্গীর আলম।

পরিবারটি আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে বিনামূল্যে দেশে ফেরানোর আবেদন করেন ইউএনও।

দেড় যুগ পর ৭ নভেম্বর দেশে পৌঁছান জাহাঙ্গীর। পরিবার তাকে গ্রহণ করলেও তিনি এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। এত বছরের কারাবাসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়েছেন, বাকশক্তিও প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন। কখনো চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন, আবার কখনো অঝোরে কেঁদে ফেলেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসন তার হাতে ২০ হাজার টাকা আর কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেয়। সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন তিনি নরসিংদী জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

জাহাঙ্গীরের বড় ছেলে আমান উল্লাহ বলেন, “বাবাকে আমরা আর কখনো পাব না ভেবেছিলাম। এখন উনি ফিরে এসেছেন—এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

চরদিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোসা. সেলিনা আক্তার বলেন, পরিষদ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা চলছে। তিনি আরও বলেন—দালালের প্রলোভনে কেউ যেন এমন ভুল না করে, সে জন্য তারা এলাকাবাসীকে সচেতন করছেন।

নরসিংদী সদর উপজেলার ইউএনও  আসমা জাহান সরকার বলেন, “অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কখনোই শুভ হয় না। একটি ভুল সিদ্ধান্ত কোনো পরিবারের সারাজীবনের জন্য কান্না বয়ে আনতে পারে—জাহাঙ্গীর আলমের ঘটনা তার বাস্তব উদাহরণ।”