সুন্দরবনে তৎপর ২০ বনদস্যু বাহিনী
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:৫৩:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
- / 154
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও ছয় বছর পর আবারও সক্রিয় হয়েছে বনদস্যুরা। অন্তত ২০টি দস্যুবাহিনী ফের তৎপর হয়ে উঠেছে, যা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে অশান্তি সৃষ্টি করছে।
পুরোনো আত্মসমর্পণকারী দস্যু এবং নতুনভাবে সংগঠিত দল মিলিয়ে এই বাহিনীগুলি গঠিত। জেলেদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং অন্যান্য অপরাধে তারা আবারও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
জেলেদের এবং বনজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর উপকূলজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশেষ করে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে দস্যুদের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি।
২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৩২টি দস্যুবাহিনীর ৩২৮ সদস্য বিপুল অস্ত্রসহ র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে। ছয় বছরের শান্তিপূর্ণ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে পরিস্থিতি আবার পরিবর্তিত হতে শুরু করে।
আত্মসমর্পণকারী দস্যুরা অভিযোগ করেছেন, সরকার পরিবর্তনের পর তারা কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অনেকেই ব্যবসা শুরু করেও চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। ‘সাবেক দস্যু’ পরিচয়ের কারণে সামাজিকভাবে হেয়মর্যাদা ভোগ করেছেন। হতাশা ও ক্ষোভ থেকেই অনেকেই আবার অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ, দাদা ভাই বাহিনীর জয়নাল আবেদীন এবং মানজুর বাহিনীর মানজুর সরদার।
সক্রিয় বাহিনীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: জাহাঙ্গীর বাহিনী, মানজুর বাহিনী, দাদা ভাই বাহিনী, করিম শরীফ বাহিনী, আসাবুর বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবি বাহিনী, দুলাই ভাই বাহিনী, রাঙা বাহিনী, সুমন বাহিনী, আনারুল বাহিনী, হান্নান বাহিনী, আলিফ বাহিনীসহ আরও ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টির বেশি বাহিনী।
প্রতিটি বাহিনীতে ১৫–৪০ সদস্য রয়েছে এবং তাদের হাতে দেশি-বিদেশি বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। বনের মরাভোলা, আলীবান্দা, ধনচেবাড়িয়া, দুধমুখী, শ্যালা, নারকেলবাড়িয়া, তেঁতুলবাড়িয়া, টিয়ারচর, পশুর, আন্দারমানিক, শিবসা–এইসব এলাকায় তাদের আস্তানা আছে।
গত এক বছরে তিন শতাধিক জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন। কেবল সেপ্টেম্বরের পর এক মাসে শতাধিক জেলে জিম্মি হয়েছেন। নৌকাপ্রতি ২০–৩০ হাজার টাকা এবং অপহৃত জেলেকে মুক্ত করতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বনসংলগ্ন এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এখনো দস্যুদের গডফাদার হিসেবে সক্রিয়। জিম্মি জেলেদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ করেন তারা। দস্যুদের দেওয়া টোকেন নৌকায় রাখলে নিরাপদে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হয়।
জেলে ও ব্যবসায়ীরা জানান, দস্যুদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা নিরাপদ নয়। আড়ত ও জেলে পল্লির আশপাশে দস্যুদের সহযোগীরা সক্রিয় থাকে। তথ্য ফাঁস হলে বনে গেলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ে। অনেকেই এখন আর বনে যেতে সাহস পান না।
সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের সমন্বয়কারী নূর আলম শেখ বলেছেন, সুন্দরবনের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দস্যুরা শুধু মানুষ নয়, বন জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি। তারা বাঘ ও হরিণ শিকার করে মাংস, চামড়া, কঙ্কাল পাচার করছে। বন কাঠও কেটে পাচার করা হচ্ছে। দস্যু ও গডফাদারদের দমন ছাড়া সুন্দরবন রক্ষা সম্ভব নয়।
মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার লে. কমান্ডার আবরার হাসান জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে, তবে কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।
গত এক বছরে ২৭টি সফল অভিযানে ৪৪ দস্যুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭০ রাউন্ড তাজা গুলি, শতাধিক দেশীয় অস্ত্রসহ নানা সরঞ্জাম। এ ছাড়া ৪৮ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও রেজাউল করীম চৌধুরী জানান, বনরক্ষীদের টহল জোরদার করা হয়েছে। দস্যুদের অবস্থান শনাক্তে কাজ চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সম্মিলিত অভিযান শিগগিরই জোরদার করা হবে।
ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন, দ্রুত ও কঠোর অভিযান চালিয়ে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
































