ঢাকা ১০:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাব-রেজিস্ট্রারের কক্ষেই ‘ঘুষ’ লেনদেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১২:৫০:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 73

মোহাম্মদপুর সাব-রেজিষ্টারের এজলাসের সামনে যখন এই নগদ অর্থ লেদদেন করা হয় তখন উপরে এজলাসে বসা ছিলেন সাব-রেজিষ্টার আব্দুল কাদির। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া।

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় অবস্থিত মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর খোদ সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদিরের দিকে।

বাংলা অ্যাফেয়ার্সের হাতে আসা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সাব-রেজিস্টারের এজলাসের সামনে বসে এক গ্রাহকের কাছ থেকে নগদ টাকা নিচ্ছেন অফিসের নকল নবিশ আওলাদ হোসেন। তখন এজলাসে বসে ছিলেন সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদির। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো ধরনের নগদ অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাব-রেজিস্টারের হয়ে ঘুষ লেনদেনের পুরো নেটওয়ার্কটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করতেন নকল নবিশ আওলাদ হোসেন ও তার ভাই আকিব হোসেন। আকিব সরকারি কর্মচারী না হলেও প্রায়ই তাকে এজলাসে বসে গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র নাড়াচাড়া করতে দেখা যেত। তেজগাঁও এলাকার স্থানীয়; এই প্রভাব খাটিয়ে দুই সহোদর বছরের পর বছর ধরে দালালি ও ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।

গত রবিবার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দলিল সইয়ের সময় সাব-রেজিস্টারের এজলাসে একাধিক ব্যক্তি জড়ো হয়ে আছেন। তাদের অধিকাংশই দলিল করতে আসা গ্রাহক। একের পর এক কাগজপত্রে ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদির ফাইলগুলো পাঠিয়ে দিচ্ছেন তার ডান পাশে বসা সহকারী মো. হারিজ মিয়ার কাছে। সেখানেই গ্রাহকদের সঙ্গে শুরু হচ্ছে ‘ম্যানেজ’-এর আলোচনা। দর কষাকষি শেষ হলে ফাইল আবার সাব-রেজিস্টারের টেবিলে ফিরে আসে এবং চোখের ইশারা পেয়ে সেগুলোতে অনুমোদন দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি চলাকালীন ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন এই প্রতিবেদক।

জানা গেছে, অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর গত এক থেকে দেড় মাস ধরে আওলাদ ও আকিব অফিসে আসছেন না। তবে তাদের জায়গা পূরণ করেছেন নতুন কয়েকজন নকল নবিশ ও দালাল।

আওলাদের স্থলে দায়িত্ব নিয়েছেন নকল নবিশ মো. এনামুল। এছাড়া মো. মোস্তফা, মো. সুরুজ খান, মো. ইমরান ও মো. ইউসুফসহ আরও কয়েকজন এখন ঘুষ লেনদেনের এই সিন্ডিকেট পরিচালনার সাথে জড়িত।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, দালাল ছাড়া এই অফিসে কোনো কাজই সম্পন্ন হয় না। টাকা দিলে দলিলের দাগ, খতিয়ান কিংবা মৌজা পর্যন্ত পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক বলেন, “আইনের কথা বলে আমাদের ভয় দেখানো হয়। পরে দালালের মাধ্যমে টাকা দিলে সব ঠিক হয়ে যায়।”

এ বিষয়ে সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদের বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, “দলিলে যা লেখা থাকে, তার ভিত্তিতেই কাজ করা হয়। কে কী করছে, তা দেখা আমার দায়িত্ব নয়।” তবে ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ফুটেজের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি কিছুটা থমকে যান। পরে বলেন, “এ বিষয়টি আমার জানা নেই।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঢাকা জেলা রেজিষ্টার মুন্সী মোকলেছুর রহমান বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, ‘বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে কেন টাকাটা নিলেন’।

এদিকে সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে এভাবে প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ গ্রাহকরা। তারা দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সাব-রেজিস্ট্রারের কক্ষেই ‘ঘুষ’ লেনদেন

সর্বশেষ আপডেট ১২:৫০:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় অবস্থিত মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর খোদ সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদিরের দিকে।

বাংলা অ্যাফেয়ার্সের হাতে আসা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সাব-রেজিস্টারের এজলাসের সামনে বসে এক গ্রাহকের কাছ থেকে নগদ টাকা নিচ্ছেন অফিসের নকল নবিশ আওলাদ হোসেন। তখন এজলাসে বসে ছিলেন সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদির। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো ধরনের নগদ অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাব-রেজিস্টারের হয়ে ঘুষ লেনদেনের পুরো নেটওয়ার্কটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করতেন নকল নবিশ আওলাদ হোসেন ও তার ভাই আকিব হোসেন। আকিব সরকারি কর্মচারী না হলেও প্রায়ই তাকে এজলাসে বসে গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র নাড়াচাড়া করতে দেখা যেত। তেজগাঁও এলাকার স্থানীয়; এই প্রভাব খাটিয়ে দুই সহোদর বছরের পর বছর ধরে দালালি ও ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।

গত রবিবার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দলিল সইয়ের সময় সাব-রেজিস্টারের এজলাসে একাধিক ব্যক্তি জড়ো হয়ে আছেন। তাদের অধিকাংশই দলিল করতে আসা গ্রাহক। একের পর এক কাগজপত্রে ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদির ফাইলগুলো পাঠিয়ে দিচ্ছেন তার ডান পাশে বসা সহকারী মো. হারিজ মিয়ার কাছে। সেখানেই গ্রাহকদের সঙ্গে শুরু হচ্ছে ‘ম্যানেজ’-এর আলোচনা। দর কষাকষি শেষ হলে ফাইল আবার সাব-রেজিস্টারের টেবিলে ফিরে আসে এবং চোখের ইশারা পেয়ে সেগুলোতে অনুমোদন দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি চলাকালীন ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন এই প্রতিবেদক।

জানা গেছে, অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর গত এক থেকে দেড় মাস ধরে আওলাদ ও আকিব অফিসে আসছেন না। তবে তাদের জায়গা পূরণ করেছেন নতুন কয়েকজন নকল নবিশ ও দালাল।

আওলাদের স্থলে দায়িত্ব নিয়েছেন নকল নবিশ মো. এনামুল। এছাড়া মো. মোস্তফা, মো. সুরুজ খান, মো. ইমরান ও মো. ইউসুফসহ আরও কয়েকজন এখন ঘুষ লেনদেনের এই সিন্ডিকেট পরিচালনার সাথে জড়িত।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, দালাল ছাড়া এই অফিসে কোনো কাজই সম্পন্ন হয় না। টাকা দিলে দলিলের দাগ, খতিয়ান কিংবা মৌজা পর্যন্ত পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক বলেন, “আইনের কথা বলে আমাদের ভয় দেখানো হয়। পরে দালালের মাধ্যমে টাকা দিলে সব ঠিক হয়ে যায়।”

এ বিষয়ে সাব-রেজিস্টার আব্দুল কাদের বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, “দলিলে যা লেখা থাকে, তার ভিত্তিতেই কাজ করা হয়। কে কী করছে, তা দেখা আমার দায়িত্ব নয়।” তবে ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ফুটেজের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি কিছুটা থমকে যান। পরে বলেন, “এ বিষয়টি আমার জানা নেই।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঢাকা জেলা রেজিষ্টার মুন্সী মোকলেছুর রহমান বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, ‘বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে কেন টাকাটা নিলেন’।

এদিকে সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে এভাবে প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ গ্রাহকরা। তারা দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।