ঢাকা ০৯:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সরকারি সহায়তা ও পুরোনো ব্যবস্থায় আস্থার সংকট:প্রধান উপদেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪৭:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 12

ছবি- ভিডিও থেকে নেয়া

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকার টাকা বা জমি দিতে শুরু করলে প্রকৃত প্রয়োজনীয় মানুষ নয়, বরং ভুল লোকেরাই সুবিধা নিয়ে যায়। এতে আসল মানুষ বঞ্চিত হয় এবং সুবিধাভোগীরা আরও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। তাই তিনি নাগরিকদের সরকার থেকে অনুদান বা সুবিধা না চেয়ে নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. ইউনূস বলেন, যারা সরকারের কাছে সুবিধা চাইতে আসে, তাদের সন্দেহের চোখে দেখা উচিত। কারণ, সহায়তার নামে যে ব্যবস্থা চালু হয়, তা শেষ পর্যন্ত অযোগ্য ও প্রভাবশালীদের হাতে চলে যায়। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও মেধাবীরা পিছিয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, সরকার ও মন্ত্রণালয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বড় একটি কাঠামোর অংশ। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল না মেলায় এই কাঠামো দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। নীতিনির্ধারকেরা সময়ের পরিবর্তন দেখলেও নিজেরা বদলাতে পারছেন না। ফলে পরিবর্তন অনুভব করা মানুষদের সামনে আনা জরুরি।

সরকারি কর্মচারীদের একই জায়গায় দীর্ঘদিন থাকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, পাঁচ বছরের বেশি এক জায়গায় থাকলে চিন্তাধারা স্থবির হয়ে যায়। প্রযুক্তিনির্ভর যুগে পুরোনো জ্ঞান নিয়ে দায়িত্বে থাকলে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নতুন প্রজন্ম ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষকে সুযোগ দিতে হবে।

নীতিনির্ধারণ প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, পরিবর্তন অব্যাহত থাকায় নিয়ম-কানুনও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে পুরোনো ব্রিটিশ আমলের কাঠামোর ওপর শুধু সংশোধন করা হচ্ছে, মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাঁর মতে, গোড়া থেকেই নতুনভাবে ব্যবস্থা গড়ে তোলার মানসিকতা নেই বলেই সংস্কার থেমে থাকে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন। বলেন, রাজনীতিকদের মূল লক্ষ্য থাকে মেয়াদ শেষ করে পুনর্নির্বাচিত হওয়া। অথচ প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ১০ বছর পর পর নতুন করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ, প্রযুক্তি পুরোনো কাঠামো ভেঙে দেয়, আর সরকার সেগুলো আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। এই দ্বন্দ্বে প্রযুক্তিকেই জয়ী হতে হবে, না হলে দেশ পিছিয়ে পড়বে।

জালিয়াতিকে বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ভুয়া ভিসা, পাসপোর্ট ও সনদের কারণে বহু দেশ বাংলাদেশিদের গ্রহণ করতে চায় না। জালিয়াতি এখন একটি “কারখানায়” পরিণত হয়েছে। এতে সৃজনশীলতা থাকলেও তা ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশের মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ভুয়া সনদের কারণে বাংলাদেশিদের আবেদন নিয়মিত প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। এমনকি নাবিকদেরও বন্দরে নামতে দেওয়া হয় না। ওই দেশ কর্তৃপক্ষ জাল কাগজপত্র দেখিয়েই বাংলাদেশিদের প্রতি অনাস্থার কারণ ব্যাখ্যা করেছে।

ড. ইউনূস সতর্ক করে বলেন, নিজেদের সংশোধন না করলে আধুনিক প্রযুক্তিও জালিয়াতির হাতিয়ার হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে ভুয়া সার্টিফিকেট ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে বৈধ অফিস থেকেই অর্থের বিনিময়ে ইস্যু করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। জালিয়াতির শেকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। স্পষ্ট ভাষায় তিনি ঘোষণা দেন, “এই দেশ জালিয়াতির কারখানা হবে না।”

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সরকারি সহায়তা ও পুরোনো ব্যবস্থায় আস্থার সংকট:প্রধান উপদেষ্টা

সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪৭:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকার টাকা বা জমি দিতে শুরু করলে প্রকৃত প্রয়োজনীয় মানুষ নয়, বরং ভুল লোকেরাই সুবিধা নিয়ে যায়। এতে আসল মানুষ বঞ্চিত হয় এবং সুবিধাভোগীরা আরও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। তাই তিনি নাগরিকদের সরকার থেকে অনুদান বা সুবিধা না চেয়ে নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. ইউনূস বলেন, যারা সরকারের কাছে সুবিধা চাইতে আসে, তাদের সন্দেহের চোখে দেখা উচিত। কারণ, সহায়তার নামে যে ব্যবস্থা চালু হয়, তা শেষ পর্যন্ত অযোগ্য ও প্রভাবশালীদের হাতে চলে যায়। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও মেধাবীরা পিছিয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, সরকার ও মন্ত্রণালয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বড় একটি কাঠামোর অংশ। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল না মেলায় এই কাঠামো দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। নীতিনির্ধারকেরা সময়ের পরিবর্তন দেখলেও নিজেরা বদলাতে পারছেন না। ফলে পরিবর্তন অনুভব করা মানুষদের সামনে আনা জরুরি।

সরকারি কর্মচারীদের একই জায়গায় দীর্ঘদিন থাকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, পাঁচ বছরের বেশি এক জায়গায় থাকলে চিন্তাধারা স্থবির হয়ে যায়। প্রযুক্তিনির্ভর যুগে পুরোনো জ্ঞান নিয়ে দায়িত্বে থাকলে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নতুন প্রজন্ম ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষকে সুযোগ দিতে হবে।

নীতিনির্ধারণ প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, পরিবর্তন অব্যাহত থাকায় নিয়ম-কানুনও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে পুরোনো ব্রিটিশ আমলের কাঠামোর ওপর শুধু সংশোধন করা হচ্ছে, মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাঁর মতে, গোড়া থেকেই নতুনভাবে ব্যবস্থা গড়ে তোলার মানসিকতা নেই বলেই সংস্কার থেমে থাকে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন। বলেন, রাজনীতিকদের মূল লক্ষ্য থাকে মেয়াদ শেষ করে পুনর্নির্বাচিত হওয়া। অথচ প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ১০ বছর পর পর নতুন করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ, প্রযুক্তি পুরোনো কাঠামো ভেঙে দেয়, আর সরকার সেগুলো আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। এই দ্বন্দ্বে প্রযুক্তিকেই জয়ী হতে হবে, না হলে দেশ পিছিয়ে পড়বে।

জালিয়াতিকে বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ভুয়া ভিসা, পাসপোর্ট ও সনদের কারণে বহু দেশ বাংলাদেশিদের গ্রহণ করতে চায় না। জালিয়াতি এখন একটি “কারখানায়” পরিণত হয়েছে। এতে সৃজনশীলতা থাকলেও তা ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশের মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ভুয়া সনদের কারণে বাংলাদেশিদের আবেদন নিয়মিত প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। এমনকি নাবিকদেরও বন্দরে নামতে দেওয়া হয় না। ওই দেশ কর্তৃপক্ষ জাল কাগজপত্র দেখিয়েই বাংলাদেশিদের প্রতি অনাস্থার কারণ ব্যাখ্যা করেছে।

ড. ইউনূস সতর্ক করে বলেন, নিজেদের সংশোধন না করলে আধুনিক প্রযুক্তিও জালিয়াতির হাতিয়ার হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে ভুয়া সার্টিফিকেট ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে বৈধ অফিস থেকেই অর্থের বিনিময়ে ইস্যু করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। জালিয়াতির শেকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। স্পষ্ট ভাষায় তিনি ঘোষণা দেন, “এই দেশ জালিয়াতির কারখানা হবে না।”