ঢাকা ০২:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বড়পুকুরিয়ায় কয়লার অতিরিক্ত মূল্য

সরকারি কোম্পানিতে মুনাফা, বিদ্যুৎকেন্দ্র লোকসানে

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:০১:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 55

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি

দেশে আমদানি করা কয়লার গড় মূল্য যেখানে টনপ্রতি প্রায় ৭৫ ডলার, সেখানে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে টনপ্রতি ১৭৬ ডলার—যা দ্বিগুণেরও বেশি। এই অতিরিক্ত দামে কয়লা বিক্রির ফলে টানা তিন বছর সরকারি বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি বিপুল মুনাফা করেছে। কর্মকর্তারা মুনাফার ১০ শতাংশ বোনাস হিসেবে পেয়েছেন, যার ফলে তাঁদের বার্ষিক অতিরিক্ত আয় প্রায় ১০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে, একই দামে কয়লা কিনতে গিয়ে লোকসানে পড়েছে পাশের সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র

বড়পুকুরিয়া খনিটি পেট্রোবাংলার একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, আর কয়লা উত্তোলন ও বিক্রির দায়িত্ব পালন করে একটি চীনা ঠিকাদার। খনির পাশের পিডিবির মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কেবল এখানকার কয়লা দিয়েই চালানো সম্ভব—যন্ত্রপাতিও সে অনুযায়ী স্থাপন করা। ফলে বাইরে থেকে কয়লা আমদানি করে কেন্দ্র চালানো যায়নি।

জ্বালানি বিভাগ জানায়, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে টনপ্রতি কয়লার দাম ১৩০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৭৬ ডলার করা হলে কোম্পানির লাভ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে তিন অর্থবছর ধরে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। পরে লোকসান কমাতে গত জানুয়ারি থেকে ইন্দোনেশিয়া সূচক অনুযায়ী গড়ে ৯৯.৫৮ ডলারে অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। যদি ১৭৬ ডলার ধরা হতো, তাহলে ঘাটতি দাঁড়াত প্রায় ১,৭৪২ কোটি টাকায়।

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির এমডি মো. আবু তালেব ফরাজী বলেন, ইন্দোনেশিয়া সূচকের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়নি। তিনি ব্যাখ্যা দেন, খনি থেকে দেড় হাজার মিটার গভীরে কয়লা উত্তোলন করতে বিপুল ব্যয় হয় এবং ঠিকাদারদের টনপ্রতি ৯০ ডলারের বেশি দিতে হয়। এছাড়া ডলার–মূল্য বৃদ্ধির কারণে খরচ আরও বেড়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, চীনা ঠিকাদারকে ডলার ও টাকায় নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ, শুল্ক–কর বৃদ্ধি, খনি পরিচালন ব্যয়, ১০ শতাংশ মুনাফা, রয়্যালটি, মাসিক বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত করে এই দাম নির্ধারণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণেও সরকারকে এখন ১,২০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, কয়লার দাম ডলারে নির্ধারণ করায় বড়পুকুরিয়ার আয় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে আমদানি করা কয়লার গড় দাম ছিল টনপ্রতি ৭৪.৭৬ ডলার, আর আন্তর্জাতিক বাজারে বড়পুকুরিয়ার মতো মানের কয়লার দাম ছিল প্রায় ৯১.২০ ডলার—যা স্থানীয় দামের তুলনায় অনেক কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন ব্যয় না থাকায় বড়পুকুরিয়ার কয়লার দাম আরও কম হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সম্প্রসারণ প্রকল্পের খরচ মেটাতে জ্বালানি বিভাগ আরও বেশি দাম চাইছে। নতুন দর নির্ধারণে গঠিত কমিটি ২০১ ডলার পর্যন্ত দাম সুপারিশ করেছে।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরকার নিজেই জ্বালানি খাতে অনিয়মে অংশ নিয়েছে এবং পিডিবিকে লোকসানের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, “আমদানির চেয়ে দ্বিগুণ দামে কয়লা বিক্রি করার যৌক্তিকতা কোথায়?”

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, বিদ্যুৎ বিভাগ ও জ্বালানি বিভাগকে নিয়ে বসে বড়পুকুরিয়ার কয়লার ন্যায্য দাম নির্ধারণ করা হবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

বড়পুকুরিয়ায় কয়লার অতিরিক্ত মূল্য

সরকারি কোম্পানিতে মুনাফা, বিদ্যুৎকেন্দ্র লোকসানে

সর্বশেষ আপডেট ০৫:০১:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫

দেশে আমদানি করা কয়লার গড় মূল্য যেখানে টনপ্রতি প্রায় ৭৫ ডলার, সেখানে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে টনপ্রতি ১৭৬ ডলার—যা দ্বিগুণেরও বেশি। এই অতিরিক্ত দামে কয়লা বিক্রির ফলে টানা তিন বছর সরকারি বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি বিপুল মুনাফা করেছে। কর্মকর্তারা মুনাফার ১০ শতাংশ বোনাস হিসেবে পেয়েছেন, যার ফলে তাঁদের বার্ষিক অতিরিক্ত আয় প্রায় ১০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে, একই দামে কয়লা কিনতে গিয়ে লোকসানে পড়েছে পাশের সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র

বড়পুকুরিয়া খনিটি পেট্রোবাংলার একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, আর কয়লা উত্তোলন ও বিক্রির দায়িত্ব পালন করে একটি চীনা ঠিকাদার। খনির পাশের পিডিবির মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কেবল এখানকার কয়লা দিয়েই চালানো সম্ভব—যন্ত্রপাতিও সে অনুযায়ী স্থাপন করা। ফলে বাইরে থেকে কয়লা আমদানি করে কেন্দ্র চালানো যায়নি।

জ্বালানি বিভাগ জানায়, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে টনপ্রতি কয়লার দাম ১৩০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৭৬ ডলার করা হলে কোম্পানির লাভ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে তিন অর্থবছর ধরে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। পরে লোকসান কমাতে গত জানুয়ারি থেকে ইন্দোনেশিয়া সূচক অনুযায়ী গড়ে ৯৯.৫৮ ডলারে অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। যদি ১৭৬ ডলার ধরা হতো, তাহলে ঘাটতি দাঁড়াত প্রায় ১,৭৪২ কোটি টাকায়।

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির এমডি মো. আবু তালেব ফরাজী বলেন, ইন্দোনেশিয়া সূচকের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়নি। তিনি ব্যাখ্যা দেন, খনি থেকে দেড় হাজার মিটার গভীরে কয়লা উত্তোলন করতে বিপুল ব্যয় হয় এবং ঠিকাদারদের টনপ্রতি ৯০ ডলারের বেশি দিতে হয়। এছাড়া ডলার–মূল্য বৃদ্ধির কারণে খরচ আরও বেড়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, চীনা ঠিকাদারকে ডলার ও টাকায় নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ, শুল্ক–কর বৃদ্ধি, খনি পরিচালন ব্যয়, ১০ শতাংশ মুনাফা, রয়্যালটি, মাসিক বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত করে এই দাম নির্ধারণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণেও সরকারকে এখন ১,২০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, কয়লার দাম ডলারে নির্ধারণ করায় বড়পুকুরিয়ার আয় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে আমদানি করা কয়লার গড় দাম ছিল টনপ্রতি ৭৪.৭৬ ডলার, আর আন্তর্জাতিক বাজারে বড়পুকুরিয়ার মতো মানের কয়লার দাম ছিল প্রায় ৯১.২০ ডলার—যা স্থানীয় দামের তুলনায় অনেক কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন ব্যয় না থাকায় বড়পুকুরিয়ার কয়লার দাম আরও কম হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সম্প্রসারণ প্রকল্পের খরচ মেটাতে জ্বালানি বিভাগ আরও বেশি দাম চাইছে। নতুন দর নির্ধারণে গঠিত কমিটি ২০১ ডলার পর্যন্ত দাম সুপারিশ করেছে।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরকার নিজেই জ্বালানি খাতে অনিয়মে অংশ নিয়েছে এবং পিডিবিকে লোকসানের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, “আমদানির চেয়ে দ্বিগুণ দামে কয়লা বিক্রি করার যৌক্তিকতা কোথায়?”

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, বিদ্যুৎ বিভাগ ও জ্বালানি বিভাগকে নিয়ে বসে বড়পুকুরিয়ার কয়লার ন্যায্য দাম নির্ধারণ করা হবে।