ঢাকা ০৮:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

লামায় আ’লীগ নেতার অবৈধ ইটভাটা ঘিরে সন্ত্রাসের রাজত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:২৪:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 58

আজিজনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোঃ আজম উল্লাহ ও তার ইটভাটা। ছবি: বাংলা অ্যাফেয়ার্স

বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া এলাকায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক আশ্রয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি অবৈধ ইটভাটা পরিচালিত হয়ে আসছে, যা পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি স্থানীয় জনজীবনে ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আজিজনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোঃ আজম উল্লাহ খানের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পরিচালিত এসবিএম নামের ইটভাটাটি প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই দিনের আলো ও রাতের আঁধারে চলছে। অভিযোগ রয়েছে, ইটভাটাকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সন্ত্রাসী তৎপরতা গড়ে উঠেছে, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটাটি পাহারা দেয় সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা। হাতে দেশীয় অস্ত্র, মুখে হুমকি আর চোখে ভয়ঙ্কর রক্তচক্ষু- এদের দাপটে এলাকাবাসী কার্যত জিম্মি। কোনো সংবাদকর্মী ছবি বা তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে শুরু হয় ভয়ভীতি, হুমকি এমনকি প্রাণনাশের হুঁশিয়ারিও। ফলে পুরো এলাকা একপ্রকার অঘোষিত সন্ত্রাসের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।

অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন আজম উল্লাহ খানের পুত্র ফরহাদ হোসেন। প্রভাবশালী পরিচয়ের কারণে বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অব্যাহত রয়েছে অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মোঃ আজম উল্লাহ খান আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দুর্গম গজালিয়া এলাকায় এসবিএম নামে অবৈধ ইটভাটা স্থাপন করা হয়। এরপর থেকে স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর শক্তিতে ভর করে ইটভাটাটি পরিচালিত হয়ে আসছে।

প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট ইটভাটাটির পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন কিংবা কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। বর্তমানে লামা উপজেলায় ৩১টি ইটভাটা চালু রয়েছে। এরই মধ্যে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে মোট ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গজালিয়া-আজিজনগর সড়কের গহীন জঙ্গলে পাহাড় কেটে স্থাপন করা হয়েছে এই ইটভাটা। বনের কাঠ অবাধে পোড়ানো হচ্ছে চুল্লিতে, ফলে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এলাকার প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য। ইটভাটাকে সচল রাখতে সশস্ত্র লোকজন সার্বক্ষণিক মজুদ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

মেজাং মেম্বার পাড়া, নাজিরাম ত্রিপুরা ও রাসুঙ্গ ত্রিপুরা- এই তিনটি পাড়ার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ইটভাটার শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকদের কারণে তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে পাহাড়ি নারীরা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারছেন না। একা বের হলে ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শ্রমিক ও ম্যানেজারদের হাতে অস্ত্র থাকায় কেউ ইটভাটার মালিক বা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাতে সাহস পাচ্ছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সংবাদকর্মী জানান, এসবিএম ইটভাটায় তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে মালিকের ছেলে ফরহাদ হোসেন, ম্যানেজার কবিরসহ শ্রমিকরা তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং উদ্ধত আচরণ করা হয়। এমনকি “ইটভাটার চুল্লিতে মানুষ পুড়িয়ে ফেললেও কিছু হবে না”- এমন হুমকির কথাও জানান তারা।

এ বিষয়ে এসবিএম ইটভাটার মালিক মোঃ আজম উল্লাহ খান স্বীকার করেন যে ইটভাটাটির কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার দায় তিনি শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেন।

বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ রেজাউল করিম বলেন, “গজালিয়া ইউনিয়নের মোঃ আজম উল্লাহ খানের এসবিএম ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে লজিস্টিক সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”

লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মঈন উদ্দিন বলেন, “আগে অভিযান চালিয়ে এসবিএম ইটভাটাটি গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুনেছি আবার চালু করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সহযোগিতা পেলে যেকোনো সময় পুনরায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ করা হবে।”

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

লামায় আ’লীগ নেতার অবৈধ ইটভাটা ঘিরে সন্ত্রাসের রাজত্ব

সর্বশেষ আপডেট ০৭:২৪:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া এলাকায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক আশ্রয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি অবৈধ ইটভাটা পরিচালিত হয়ে আসছে, যা পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি স্থানীয় জনজীবনে ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আজিজনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোঃ আজম উল্লাহ খানের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পরিচালিত এসবিএম নামের ইটভাটাটি প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই দিনের আলো ও রাতের আঁধারে চলছে। অভিযোগ রয়েছে, ইটভাটাকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সন্ত্রাসী তৎপরতা গড়ে উঠেছে, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটাটি পাহারা দেয় সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা। হাতে দেশীয় অস্ত্র, মুখে হুমকি আর চোখে ভয়ঙ্কর রক্তচক্ষু- এদের দাপটে এলাকাবাসী কার্যত জিম্মি। কোনো সংবাদকর্মী ছবি বা তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে শুরু হয় ভয়ভীতি, হুমকি এমনকি প্রাণনাশের হুঁশিয়ারিও। ফলে পুরো এলাকা একপ্রকার অঘোষিত সন্ত্রাসের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।

অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন আজম উল্লাহ খানের পুত্র ফরহাদ হোসেন। প্রভাবশালী পরিচয়ের কারণে বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অব্যাহত রয়েছে অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মোঃ আজম উল্লাহ খান আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দুর্গম গজালিয়া এলাকায় এসবিএম নামে অবৈধ ইটভাটা স্থাপন করা হয়। এরপর থেকে স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর শক্তিতে ভর করে ইটভাটাটি পরিচালিত হয়ে আসছে।

প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট ইটভাটাটির পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন কিংবা কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। বর্তমানে লামা উপজেলায় ৩১টি ইটভাটা চালু রয়েছে। এরই মধ্যে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে মোট ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গজালিয়া-আজিজনগর সড়কের গহীন জঙ্গলে পাহাড় কেটে স্থাপন করা হয়েছে এই ইটভাটা। বনের কাঠ অবাধে পোড়ানো হচ্ছে চুল্লিতে, ফলে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এলাকার প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য। ইটভাটাকে সচল রাখতে সশস্ত্র লোকজন সার্বক্ষণিক মজুদ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

মেজাং মেম্বার পাড়া, নাজিরাম ত্রিপুরা ও রাসুঙ্গ ত্রিপুরা- এই তিনটি পাড়ার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ইটভাটার শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকদের কারণে তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে পাহাড়ি নারীরা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারছেন না। একা বের হলে ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শ্রমিক ও ম্যানেজারদের হাতে অস্ত্র থাকায় কেউ ইটভাটার মালিক বা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাতে সাহস পাচ্ছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সংবাদকর্মী জানান, এসবিএম ইটভাটায় তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে মালিকের ছেলে ফরহাদ হোসেন, ম্যানেজার কবিরসহ শ্রমিকরা তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং উদ্ধত আচরণ করা হয়। এমনকি “ইটভাটার চুল্লিতে মানুষ পুড়িয়ে ফেললেও কিছু হবে না”- এমন হুমকির কথাও জানান তারা।

এ বিষয়ে এসবিএম ইটভাটার মালিক মোঃ আজম উল্লাহ খান স্বীকার করেন যে ইটভাটাটির কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার দায় তিনি শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেন।

বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ রেজাউল করিম বলেন, “গজালিয়া ইউনিয়নের মোঃ আজম উল্লাহ খানের এসবিএম ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে লজিস্টিক সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”

লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মঈন উদ্দিন বলেন, “আগে অভিযান চালিয়ে এসবিএম ইটভাটাটি গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুনেছি আবার চালু করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সহযোগিতা পেলে যেকোনো সময় পুনরায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ করা হবে।”