রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাড়ছে মতের অমিল
- সর্বশেষ আপডেট ১০:১০:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
- / 114
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আলোচনার অবসান ঘটলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত এ সনদে এখন পর্যন্ত ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট যোগ দিয়েছে। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একে “নতুন বাংলাদেশের সূচনা” হিসেবে অভিহিত করলেও, বাস্তবে দলগুলোর মধ্যে মতের অমিল কমেনি—বরং আরও গভীর হয়েছে।
একদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ খুঁজে বের করতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিভিন্ন দল। পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সময় ও প্রক্রিয়া নিয়েও দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে। কেউ নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, আবার কেউ নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলাদা অবস্থান নিচ্ছেন। জামায়াতসহ সাতটি রাজনৈতিক দল রাজপথে কর্মসূচি পালন করছে। গত দুই দিনে তিনটি দলের শীর্ষ নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন, যা প্রমাণ করে রাজনৈতিক ঐক্য এখনো গড়ে ওঠেনি।
জামায়াতে ইসলামী ঘোষণা দিয়েছে, তাদের দাবি না মানলে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জানিয়েছে, “শাপলা” প্রতীক না পেলে তারা নির্বাচনে যাবে না। অন্যদিকে বিএনপির নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ ও নির্বাচনের কারিগরি দিক নিয়ে তাদের মতামত জানিয়েছেন। এসব অবস্থান আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে আরও জটিল করে তুলছে।
অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য বলছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে, এবং তারা এ বিষয়ে আশাবাদী। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দলগুলোকে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ‘নিশ্চিন্ত থাকতে’ আহ্বান জানিয়েছেন। তবু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অনৈক্য ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় স্বার্থে সব দলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, অন্যথায় দেশ নতুন সংকটে পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, “জুলাই সনদের মতো চ্যালেঞ্জিং বিষয়ে বেশিরভাগ দল একমত হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সক্রিয়তা ও অবস্থান টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন ইস্যু সামনে আনছে। এতে রাজনীতি সচল থাকে এবং জনগণের আগ্রহও বজায় থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। ১৫ বছর ধরে আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন দলও বিরোধিতার ভেতর দিয়ে রাজনীতিকে সচল রাখত। এখনকার অবস্থাও তেমনই। একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দলগুলো মাঠ গরম রাখছে এবং নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছে।”
চলমান অচলাবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, “শেষ পর্যন্ত এসব বিষয় আইনি ও প্রক্রিয়াগতভাবে মীমাংসিত হবে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে দলগুলোকে এক বিন্দুতে এসে একমত হতেই হবে—যদিও তার মানে কিছু দাবি থেকে সরে আসা। সরকারকে শুধু চাপ দিয়ে নয়, আলোচনার পথেই সমাধান আসবে।”
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সাম্প্রতিক এক সভায় বলেন, সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব যৌক্তিক নয়। তার মতে, “দুটি ভোট এক দিনে হলে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। ইতিহাসে দেখা গেছে, রেফারেন্ডাম সর্বোচ্চ ২৬ দিনের মধ্যে আয়োজন করা হয়েছে। নভেম্বরের মধ্যেই তা সম্পন্ন করা সম্ভব। তা না হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাবে এবং ভোটার উপস্থিতি কমে যাবে।”
অন্যদিকে, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর জানান, “আমরা ‘শাপলা’ প্রতীক ছাড়া নির্বাচনে যাচ্ছি না। নির্বাচন কমিশনের গঠন ও আচরণ আমাদের কাছে নিরপেক্ষ মনে হচ্ছে না। কিছু দলের প্রতি পক্ষপাত এবং অন্যদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ দেখা যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “প্রশাসনের বিভিন্ন পদে রাজনৈতিক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এসব ঠিক না হলে সরকারের ওপর দায় আসবে। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন হোক এবং প্রশাসনিক পদায়নে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হোক।”
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর এখন প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সংলাপ। জুলাই সনদের লক্ষ্য পূরণ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ঐক্যই হতে পারে একমাত্র পথ। অন্যথায় অনৈক্য ও বিভাজন জাতীয় অগ্রযাত্রায় বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে।































