শিশুদের জন্য ব্যতিক্রমী আয়োজন
মাইলস্টোনের ক্ষুদেরা খুঁজে পেয়েছে সাহসের রঙ
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:৫৩:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
- / 198
উত্তরার আকাশে তখনও ভেসে বেড়াচ্ছিল ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধ। তিন মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সেই জুলাইয়ের দুপুরের আতঙ্ক এখনও মাইলস্টোন স্কুলের শিশুদের চোখে লেগে আছে। কেউ হারিয়েছে ভাইকে, কেউ বোনকে- আবার কেউ এখনো কাঁপে হঠাৎ কোনো শব্দ শুনলেই।
এই ভয়, এই ব্যথা ভুলিয়ে দিতে গত মঙ্গলবার মাইলস্টোনের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল এক ভিন্নধর্মী দিনব্যাপী উৎসব- ‘আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি।’
রোটারি ক্লাব অব বনানী ও পূর্বাচলের ছুটি রিসোর্টের যৌথ উদ্যোগে দিনটি হয়ে উঠেছিল এক নিঃশব্দ আর্তনাদের পর এক গর্জনহীন পুনর্জন্মের দিন।

ছোট ছোট হাতে কেউ আঁকছে নীল আকাশ, কেউ সবুজ মাঠ। কিন্তু কিছু ছবির পটভূমিতে জ্বলছে আগুন, কোথাও চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে রঙের ফোঁটার মতো।
চিত্রশিল্পী তাহমিনা হাফিজ লিসা বললেন,
“ওদের আঁকা ছবিগুলো যেন সাক্ষ্য দিচ্ছিল— স্মৃতির রঙ কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না।”
আয়োজনটিতে ছবি আঁকা, ট্রেজার হান্ট, গান, খেলা আর গল্পে মেতে উঠেছিল প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী। ফাঁকে ফাঁকে চলছিল কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তার সেশন।
শেষ বিকেলে শিশুরা কাগজে লিখে তাদের মনের গভীরের কষ্টগুলো নৌকা বানিয়ে নীল জলে ভাসিয়ে দিল— যেন সব দুঃখ ভেসে যাক দূরে, কোনো অচেনা তীরে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন আব্দুল্লাহর কণ্ঠে এখনো লেগে আছে সেই বিকেলের চিৎকার।
“বাড়ি ফেরার পথে দেখি বিমান পড়ে আগুন লেগেছে। হন্য হয়ে বোনকে খুঁজতে থাকি। একসময় দেখি, পোড়া দেহ নিয়ে বেরিয়ে আসছে। হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, কিন্তু কয়েকদিন পর চলে গেল…”
তার চোখে তখনও সেই দিনটির আগুন ঝলসে ওঠে।
৭ম শ্রেণির সূর্য সময় বলল,
“আমি নিজেই আগুনের ভেতর গিয়েছিলাম বন্ধুদের বাঁচাতে। শ্বাস নিতে পারছিলাম না, তবু একে একে সবাইকে নামিয়ে এনেছি। তখন মনে হয়েছিল— হয়তো আমিও আর ফিরব না।”
ইভেন্ট শেষে শিক্ষার্থী আরেফিন সিদ্দিক জানাল,
“সারাদিন মজা করেছি। কষ্টটা কিছু সময়ের জন্য হলেও ভুলে থাকতে পেরেছি।”
আরেকজন, আফিফ, হাসিমুখে বলল,
“খেলেছি, গান করেছি— মনে হচ্ছিল জীবন আবার রঙিন হয়ে গেছে।”
মাইলস্টোনের সিনিয়র লেকচারার অভিজিত অধিকারী বললেন,
“ট্র্যাজেডির পর থেকে প্রতিদিনই চেষ্টা করছি ওদের ট্রমা হালকা করতে। আজকের দিনটা ছিল আমাদের সেই প্রচেষ্টার ফল।”

এই উদ্যোগের পেছনের গল্প বললেন সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার পর শিশুদের চোখে দেখেছিলাম ভয়, হতবিহ্বলতা। তখনই ভাবলাম— শুধু কাউন্সেলিং নয়, তাদের হাসির সুযোগ দরকার। তাই আয়োজনের চিন্তা করি।”
রোটারি ক্লাব বনানীর প্রেসিডেন্ট খন্দকার আব্দুল মুবিন বলেন, “এটা কেবল বিনোদন নয়; শিশুদের মনের ভয় ও দুঃখ দূর করার আন্তরিক প্রয়াস।”
ছুটি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর ফেরদৌস যোগ করেন, “মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ক্ষত এখনো তাজা। তাদের পাশে দাঁড়াতে পেরে আমরা কৃতজ্ঞ।”
মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি লিড মনিরা রহমান বলেন, “এমন আয়োজন শিশুদের মানসিক পুনর্গঠনে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। তারা আবার বিশ্বাস পায়— জীবন থেমে থাকে না।”
সূর্য যখন নেমে আসছে, শিশুরা তখন নীল জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে কাগজের নৌকা। কেউ লিখেছে— “বোন, তোমাকে মিস করি”, কেউ শুধু এঁকেছে আগুনের মাঝে একটি ফুল।
স্বজন হারানোর বেদনা নিয়েও তারা বাড়ি ফিরল হাসিমুখে। সেই হাসিতে ছিল সাহসের আলো— যা জানিয়ে দেয়, আগুন নিভে গেছে ঠিকই, কিন্তু জীবন এখনো জ্বলছে, নতুন আশায়।






































