রাঙ্গামাটিতে শোকের ছায়া
বিমান কেড়ে নিল গিটারের সুর
- সর্বশেষ আপডেট ০১:৪২:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
- / 1305
উক্যছাই মারমাকে সহপাঠীরা চিনত এরিকশন নামে। ১২ বছরের এই কিশোর গত সোমবার উত্তরায় প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত ঘটনায় দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। বিমান বিধ্বস্ত সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন ক্লাসের বারান্দায়। হঠাৎ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। তার শরীরে তখন কিছুটা অংশ আগুনে পুড়েছিল। আগুনে পোড়া নিয়ে বন্ধুদের বাঁচাতে গিয়ে শতভাগ দগ্ধ হয়ে পড়েন উক্যছাই মারমা। আগুনে দগ্ধ অবস্থায় তার শিক্ষককে বলেছিলেন—”আমার হাতে বাবা নাম্বার লিখে দেন। আমার দেহটি যেন সনাক্ত করতে পারে। আমার এই ঘটনাটি শুনে বাবা দ্রুত ছুটে আসবে।”
পুরোপুরি দগ্ধ অবস্থায় বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয় উক্যছাই মারমাকে। সেখানেও শিক্ষক আর বন্ধুদের সাথে কথা বলেছিল হাসিমুখে। শুধু বলেছিল—”পানি তৃষ্ণা পেয়েছে খুব”—কিন্তু সে পানি পান করতে পারেনি। তার সাথে বেস্ট ফ্রেন্ডসহ আরো কয়েকজন একই জরুরি বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। একে একে সবাই প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু উক্যছাই তখনই বাবা আসবে এমন প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রায় ৭ ঘণ্টা মৃত্যুর সাথে লড়াই করেছিল। পাশে থাকা তার খালাকে বলেছিল—”আমাকে যেতে হবে, আমি আর বাঁচব না।” বাবা না আসা পর্যন্ত জ্বালাপোড়া নিয়ে ধৈর্য ধরে ছিল। বাবা আসার পর দিবাগত রাত আড়াইটায় দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চিরতরে বিদায় নিয়ে চলে যান উক্যছাই মারমা।
উক্যছাই মারমা রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া খেয়াদং পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরিবারে একমাত্র সন্তান উক্যছাই মারমা। ছোটবেলায় ছিলেন শান্তশিষ্ট, নম্র ভদ্র, ছিলেন মেধাবীও। এলাকার মানুষ ও বন্ধুবান্ধব তাকে ‘এরিকশন’ নামেই চিনত। বাঙ্গালহালিয়া পাহাড়িকা স্কুলে প্রথম শিক্ষা জীবন শুরু হয়। সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন ইংরেজি বিভাগে। এরপর তাকে ঢাকা ক্যাডেট স্কুলে পরীক্ষা দিতে গেলে সেখানে চান্স না পেয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। এরপর শুরু হয় শিক্ষা জীবনের স্বপ্ন ছোঁয়ার দৌড়।
উক্যছাই মারমা শিক্ষা জীবনের নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। আর আত্মীয়স্বজনদের স্বপ্ন ছিল সেনা কর্মকর্তা বানানো। পড়ালেখার পাশাপাশি তার গিটারের শব্দ যেন মন কেড়ে নিত শিক্ষক, আত্মীয়স্বজনসহ বন্ধু-বান্ধবের মাঝে। সবচেয়ে পছন্দ ছিল গিটার বাজিয়ে গান করা, আর প্রিয় খাবার হিসেবে তালিকায় ছিল বিরিয়ানি। সে গিটার সুর কিংবা প্রিয় খাবারের তালিকা এখন চিরতরে বিদায় নিয়েছে। আর শোনা যাবে না গিটারের শব্দ, শোনা যাবে না তার মধুর কণ্ঠে গানের সুর। শুধু রয়ে গেছে তার রেখে যাওয়া স্মৃতিচারণ।
গত সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটায় মৃত্যু হয় উক্যছাই মারমার। মৃত্যুর খবর শোনার মাত্রই ছেলেকে হারিয়ে যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হওয়া উক্যছাই মারমার মা ডেইজি প্রু মারমা। চোখের অশ্রু ভেজা কান্নায় কণ্ঠস্বরে বলছেন—”বাবা, কোথায় তুমি? বুকে ফিরে আয় আমার ধন। একা কেন চলে গেলি? আমাকেও সাথে নিতে পারতি!” ছেলে হারানো মায়ের আর্তনাদ দেখে পুরোপুরি স্তব্ধ প্রতিটি মানুষ। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মা ডেইজি প্রু মারমা। শোকে কাতর হয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে বারবার হাউমাউ করে কাঁদছেন তিনি। প্রতিটি সময় শুধু ছেলের দেহটিকে দেখে কান্নায় অশ্রু ঝরিয়েছেন। যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না ছেলে পৃথিবীতে আর নেই। সবাইকে কাঁদিয়ে চিরতরে বিদায় নিয়ে চলে গেছে ওপারে।
ছেলের এমন মর্মান্তিক ঘটনার খবর শোনার সাথে সাথেই ঢাকায় ছুটে গিয়েছিলেন উক্যছাইয়ের বাবা উসাই মং মারমা। চট্টগ্রাম থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ করে বিমানে করে ছুটে যান বার্ন ইউনিট হাসপাতালে। সেখানে পৌঁছানোর পর তার বাবাকে দেখে কিছুক্ষণের মধ্যে উক্যছাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ছেলের মৃত্যু দেখে থমকে গেছে বাবার স্বপ্ন। চোখেমুখে নেই হাসি-কান্না, চোখে অশ্রু না ঝরলেও বুকের পাথর চেপে এক কোণে কেঁদেছেন বাবা উসাই মং। কারো সামনে এক মুহূর্তও প্রকাশ করেননি যে, ছেলেকে হারিয়ে বাবা ভেঙে পড়েছেন।
গত মঙ্গলবার উক্যছাই মারমার নিথর মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সযোগে গ্রামে নিয়ে আসেন বাবা উসাই মং মারমা। তাকে এক পলক দেখতে ছুটে আসে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ প্রতিবেশীরা। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামার মাত্রই কান্নায় হাউমাউ করে ভেঙে পড়ে সকলে। শোকের ছায়ায় পরিণত হয় বান্দরবান-রাঙামাটি দুই জেলার মানুষের মাঝে। কান্নায় ভেসে ওঠে পুরো এলাকার মানুষ। তার এমন মর্মান্তিক ঘটনা যেন কেউ মেনে নিতে পারছে না।
গতকাল উক্যছাইকে শেষ বিদায় জানাতে ছুটে এসেছে আত্মীয়স্বজন, প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা, শিক্ষকসহ বন্ধুরা। বন্ধুরাও এমন খবর পেয়ে সকলেই মর্মাহত হয়েছে। তারাও হারিয়েছে একই স্কুলের পড়া প্রকৃত বন্ধুকে। যে বন্ধুর সাথে খেলাধুলার পাশাপাশি গিটার সুরে গানে ভেসে উঠত বন্ধুদের আড্ডায়। আজ সে বন্ধু চিরতরে বিদায় নেওয়ায় চোখের জল ফেলেছেন বন্ধুরাও। তারাও জানে তাদের বেস্ট ফ্রেন্ড আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, কখনো আর বেজে উঠবে না গিটারের সুর, জমবে না আর গানের ছন্দ। শুধু পড়ে থাকবে তার বাজানো গিটার।
গতকাল বেলা তিনটায় নিজ জন্মভূমিতে বৌদ্ধদের ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসারে তার ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করা হয়। এসময় ছেলেকে বিদায় দিতে ভেঙে পড়েন মা ডেইজি প্রু ও বাবা উসাই মং মারমা। প্রতিবেশীরা কান্নায় অশ্রুভেজা নিয়ে চিরতরে বিদায় দিয়েছেন উক্যছাই মারমাকে। আগামী প্রজন্মের ভালো ঘরে জন্মগ্রহণ করুক—এমন আশীর্বাদ জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ।
উক্যছাই বা এরিকশন সাথে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে একসাথে পড়ালেখা করেছিল মংটিং তো, ছাই শৈ অং মারমা, মো. শাহরিয়া জামিল সাফোয়ান, রায়ান বড়ুয়া, জাহেদ ইবনে আশরাফ ও সিলভার বম। নিজ বন্ধুকে শেষ বিদায় জানাতে এক পলক দেখতে এসেছেন তারা।
কান্নায় জর্জরিত কণ্ঠস্বরের বন্ধুরা বলেন, এরিকশনের স্বপ্ন ছিল আর্মি অফিসার হওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় ভর্তি হয়েছিল চট্টগ্রামের শহীদ ক্যাডেট একাডেমিতে। কিন্তু ক্যাডেট কলেজে ভর্তি না হওয়ায় পরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হয়। বন্ধুদের অনেকেই তাকে অনুরোধ করেছিল আবার বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ফিরে আসতে, কিন্তু সে দৃঢ় ছিল তার সিদ্ধান্তে—ভর্তি হয়েছিল ঢাকাতেই। “আজ আমরা গভীর শোকে নিঃস্ব। আমরা একজন নিঃস্বার্থ, সৎ এবং প্রিয় বন্ধুকে হারালাম। প্রিয় বন্ধুকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছি।”
ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা শারমিন আক্তার বলেন, “উক্যছাই ছিল আমাদের ফুল, আমাদের সন্তান। সে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র ছিল। তার স্বপ্ন ছিল একদিন ক্যাডেট হওয়ার। সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল। এমন একটি দুর্ঘটনা যেন আমাদের সেই বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। এমন ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
ছেলেকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন উসাই মং মারমা। তিনি বলেন, “আমি ওর জন্য কিছুই করতে পারলাম না, এটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। অথচ আমি জানি, সে ছিল এক অসাধারণ মেধাবী সন্তান। রাস্তায়, মোবাইলে কিংবা টেলিভিশনে যেকোনো গাড়ি দেখলেই অনায়াসে বলে দিত সেই গাড়ির নাম, মডেল—সবকিছু। ওর ভেতরে এক ধরনের সৃজনশীলতা ছিল, যেটা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। ওর স্বপ্ন ছিল, বড় হয়ে একজন ইঞ্জিনিয়ার হবে।”
উক্যছাইয়ের বাবা উসাই মং মারমা বলেন, “দুর্ঘটনার একদিন আগে ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। বলেছিলাম, ‘বাবা, তুমি ভালো করে থেকো। আমি আগামী মাসে আসছি। তোমার যা যা দরকার, সব নিয়ে আসব।’ কে জানত, এটাই হবে আমাদের শেষ কথা! সেটাই ছিল নির্মম পরিহাস।”


































