ঢাকা ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘বিনিময়’ বাতিল করলো বাংলাদেশ ব্যাংক

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:৪২:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫
  • / 176

অনিয়ম ও চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্ম ‘বিনিময়’ বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রোভাইডার ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (পিএসপি) মধ্যে টাকা লেনদেনের সুবিধার্থে ২০২২ সালের নভেম্বরে ‘বিনিময়‘ চালু হয়।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইসিটি বিভাগের ইনোভেশন ডিজাইন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ একাডেমি (আইডিইএ) প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি তৈরি করে। লক্ষ্য ছিল নগদ লেনদেন কমানো।

তবে চালু হওয়ার পর থেকেই ‘বিনিময়’-এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ‘বিনিময়’ চালু করতে চুক্তিতে সই করার জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। এছাড়া গত কয়েক মাস ধরে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিশ্রুত ফি পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “প্ল্যাটফর্মটি চালু করতে বাধ্য হয়েছিলাম, যা এখন স্থগিত করা হয়েছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, “আগের সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁদের তৈরি একটি সেটআপ আমাদের হস্তান্তর করেছিলেন। শর্তাবলি যথাযথভাবে যাচাই করার সুযোগ ছাড়াই আমাদের চুক্তিতে সই করতে বলা হয়েছিল।”

তাঁর মতে, শুরু থেকেই অনিয়ম ছিল। এমনকি চুক্তিও অনিয়মের ভিত্তিতে হয়েছে। ডকুমেন্ট তৈরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

তিনি বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ ও অসমর্থনযোগ্য পরিস্থিতিতে প্ল্যাটফর্মটি চালানো কঠিন ছিল। পরিষ্কারভাবে তারা চুক্তি ভঙ্গ করেছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

২০১৯ সালে সই করা চুক্তিতে সরকারি খরচে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্ল্যাটফর্মটি পরিচালনার কথা বলা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, গত সাত-আট মাস ধরে কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওপেন সোর্স প্রতিষ্ঠান মোজালুপ-এর সঙ্গে অংশীদারত্বে একটি নতুন আন্তঃব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে। চলতি বছরেই নতুন ব্যবস্থাটি চালুর আশা করা হচ্ছে।

আরিফ হোসেন খান বলেন, “কাজ এগিয়ে চলছে। প্রচুর তথ্যের প্রয়োজন হচ্ছে। প্রথমে তারা একটি নথি চায়, এরপর আরেকটি। আমরা যত দ্রুত সম্ভব সবকিছু সরবরাহ করছি। আশা করছি, শিগগিরই চুক্তি সম্পন্ন হবে।”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই)-এর আদলে ‘বিনিময়’ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবহারকারীবান্ধব ফিচারের অভাব, সীমিত প্রচারণা এবং ব্যাংকগুলোর অনীহার কারণে প্ল্যাটফর্মটি জনপ্রিয়তা পায়নি।

বাতিলের আগে পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করত আটটি ব্যাংক, তিনটি এমএফএস এবং দুটি পিএসপি।

ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলো: সোনালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইউসিবি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ও মিডল্যান্ড ব্যাংক। এমএফএস: বিকাশ, রকেট ও এমক্যাশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বিনিময়’ জনপ্রিয়তা না পেলেও দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার জন্য একটি কার্যকর আন্তঃপরিচালনযোগ্য প্ল্যাটফর্ম অপরিহার্য।

বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রেমিট্যান্স গ্রহণ ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা গেলেও এমএফএসগুলোর মধ্যে লেনদেনের প্রবাহ খুবই সীমিত।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “যদি সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে, তবে লেনদেন অনেক বেড়ে যাবে। এটি ডিজিটাল লেনদেনে উল্লেখযোগ্য সুবিধা আনতে পারে এবং অবশ্যই চালু করা উচিত।”

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

‘বিনিময়’ বাতিল করলো বাংলাদেশ ব্যাংক

সর্বশেষ আপডেট ০৯:৪২:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫

অনিয়ম ও চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্ম ‘বিনিময়’ বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রোভাইডার ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (পিএসপি) মধ্যে টাকা লেনদেনের সুবিধার্থে ২০২২ সালের নভেম্বরে ‘বিনিময়‘ চালু হয়।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইসিটি বিভাগের ইনোভেশন ডিজাইন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ একাডেমি (আইডিইএ) প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি তৈরি করে। লক্ষ্য ছিল নগদ লেনদেন কমানো।

তবে চালু হওয়ার পর থেকেই ‘বিনিময়’-এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ‘বিনিময়’ চালু করতে চুক্তিতে সই করার জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। এছাড়া গত কয়েক মাস ধরে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিশ্রুত ফি পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “প্ল্যাটফর্মটি চালু করতে বাধ্য হয়েছিলাম, যা এখন স্থগিত করা হয়েছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, “আগের সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁদের তৈরি একটি সেটআপ আমাদের হস্তান্তর করেছিলেন। শর্তাবলি যথাযথভাবে যাচাই করার সুযোগ ছাড়াই আমাদের চুক্তিতে সই করতে বলা হয়েছিল।”

তাঁর মতে, শুরু থেকেই অনিয়ম ছিল। এমনকি চুক্তিও অনিয়মের ভিত্তিতে হয়েছে। ডকুমেন্ট তৈরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

তিনি বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ ও অসমর্থনযোগ্য পরিস্থিতিতে প্ল্যাটফর্মটি চালানো কঠিন ছিল। পরিষ্কারভাবে তারা চুক্তি ভঙ্গ করেছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

২০১৯ সালে সই করা চুক্তিতে সরকারি খরচে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্ল্যাটফর্মটি পরিচালনার কথা বলা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, গত সাত-আট মাস ধরে কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওপেন সোর্স প্রতিষ্ঠান মোজালুপ-এর সঙ্গে অংশীদারত্বে একটি নতুন আন্তঃব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে। চলতি বছরেই নতুন ব্যবস্থাটি চালুর আশা করা হচ্ছে।

আরিফ হোসেন খান বলেন, “কাজ এগিয়ে চলছে। প্রচুর তথ্যের প্রয়োজন হচ্ছে। প্রথমে তারা একটি নথি চায়, এরপর আরেকটি। আমরা যত দ্রুত সম্ভব সবকিছু সরবরাহ করছি। আশা করছি, শিগগিরই চুক্তি সম্পন্ন হবে।”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই)-এর আদলে ‘বিনিময়’ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবহারকারীবান্ধব ফিচারের অভাব, সীমিত প্রচারণা এবং ব্যাংকগুলোর অনীহার কারণে প্ল্যাটফর্মটি জনপ্রিয়তা পায়নি।

বাতিলের আগে পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করত আটটি ব্যাংক, তিনটি এমএফএস এবং দুটি পিএসপি।

ব্যবহারকারী ব্যাংকগুলো: সোনালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইউসিবি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ও মিডল্যান্ড ব্যাংক। এমএফএস: বিকাশ, রকেট ও এমক্যাশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বিনিময়’ জনপ্রিয়তা না পেলেও দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার জন্য একটি কার্যকর আন্তঃপরিচালনযোগ্য প্ল্যাটফর্ম অপরিহার্য।

বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রেমিট্যান্স গ্রহণ ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা গেলেও এমএফএসগুলোর মধ্যে লেনদেনের প্রবাহ খুবই সীমিত।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “যদি সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে, তবে লেনদেন অনেক বেড়ে যাবে। এটি ডিজিটাল লেনদেনে উল্লেখযোগ্য সুবিধা আনতে পারে এবং অবশ্যই চালু করা উচিত।”