বড়পুকুরিয়া এমডির বড় দুর্নীতি!
- সর্বশেষ আপডেট ১১:২৯:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল ২০২৫
- / 2607
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি প্রকল্প। এই প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ সাইফুল ইসলাম সরকার দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদকে) জমা হওয়া এক অভিযোগে, তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, অবৈধ নিয়োগ ও সম্পত্তি অর্জনের বিশদ বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে।
সাইফুল ইসলামের সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি প্রকল্প শাখায় থাকা সঞ্চয়ী হিসাব (নং: ১৮৩১…২৪৯২) গত তিন বছরে নগদ জমা হয়েছে এক কোটি ৬০ লক্ষ টাকারও বেশি। এছাড়াও জনতা ব্যাংক লিমিটেড, ফুলবাড়ী বাজার শাখার সঞ্চয়ী হিসাব (নং: ০১০…৭৪৮৪) থেকেও বহু অপ্রদর্শিত অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে জানা যায়। তথ্য ফাঁস হওয়ার পর, এসব হিসাবে অর্থ জমা বন্ধ করে দেন তিনি।

প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম সরকার ২০২২ সালের ২১ জুলাই ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে বিসিএমসিএলে কর্মরত আছেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পদোন্নতির পূর্বে তিনি চাইনিজ ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির ইঞ্জিনিয়ার টু কন্ট্রাক্ট ও মহাব্যবস্থাপক (মাইনিং) পদে দায়িত্বে ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, চাইনিজ ঠিকাদারের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে মোঃ সাইফুল ইসলাম সরকার কয়লা খনিতে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি আমদানিতে মদদ দেন। যেগুলো অল্প সময়ের ব্যবধানে বিকল হয়ে যায়। বর্তমানে এসব যন্ত্রপাতি খনির ইন্ডাস্ট্রিয়াল গেটের উত্তরে স্তুপ আকারে পড়ে রয়েছে।
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকার পরেও খনি এলাকার বিপুল পরিমাণ স্ক্র্যাব মালামাল বিক্রি করেন সাইফুল ইসলাম । অভিযোগ রয়েছে, একজন নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রে বাড়তি কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়; যাতে অন্য কেউ সেসব শর্ত পূরণ করতে না পারেন। এর ফলে নামমাত্র প্রতিযোগিতায় প্রায় ৫০ কোটি টাকার স্ক্র্যাব মালামাল ২৩ কোটি টাকায় বিক্রি হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মাত্র ৩০ টাকা প্রতি কেজি দরে ৬,০০০ মেট্রিক টন লোহা, চার টাকা দরে ২৫ মেট্রিক টন রাবার ও ৮০০ টাকা দরে ২.৫ মেট্রিক টন তামা বিক্রি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালিন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী নসরুল হামিদ ও সাইফুল ইসলাম মিলে ওই ঠিকাদারের কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করেন।
এই খনিতে চাকরিরত অবস্থায় তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের পেছন দিকে ৮/১০ শতক জমির উপর ৫/৬ তলা বিশিষ্ট একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে ঢাকার মিরপুর-২ এ একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। এছাড়াও তিনি বগুড়া ও ফুলবাড়ীতে নামে বেনামে কয়েক কোটি টাকার জমি কিনেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগগুলো বলছে, তার নামে অফিস আদেশের মাধ্যমে প্রধান কার্যালয়, চৌহাটি, পার্বতীপুর, দিনাজপুর-এ চলাচলের জন্য একটি পাজেরো স্পোর্টস জিপ বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। অফিস আদেশ বহির্ভূত আরও একটি পাজেরো ভি-৬ জিপ এককভাবে ঢাকাতে ব্যবহার করে থাকেন। এছাড়াও তিনি অবৈধভাবে ঢাকায় বসবাসরত তার পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য একটি মিতসুবিসি ল্যান্সার কার ব্যবহার করে থাকেন।
যদিও তাঁর স্থায়ী পোস্টিং বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে, তবুও সাইফুল ইসলাম গত দুই বছরে অর্ধেকের বেশি সময় ঢাকায় অবস্থান করেছেন। বিভিন্ন ভ্রমণ ও সভার অজুহাতে ৩০ লাখ টাকারও বেশি টিএডিএ উত্তোলন করেছেন, যেগুলোর অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তিনি গত দুই বছরে প্রায় ২৫ জনকে আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে নিয়োগ দিয়েছেন, যাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫-৭ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে মোট ২৭৫ জন নিয়োগ পেয়েছে, প্রতিদিন বায়োমেট্রিক হাজিরায় পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ২৫০-২৫৫ জন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মচারী শুধু বেতন নিচ্ছেন কিন্তু কাজ করছেন না।
গত কয়েক বছরে খনির সকল বড় কাজ ও সরবরাহ কার্যক্রম মাত্র তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এগুলো হলো, মেসার্স জাকাউল্লাহ এন্ড ব্রাদার্স, মেসার্স মানিক ট্রেডার্স ও মেসার্স দুলাল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ।
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কাজ বরাদ্দ দিয়ে তিনি কমিশন হিসেবে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করতেন।
এছাড়াও কয়লা খনির আবাসিক এলাকার প্রায় ৫০টি ২৮-৩০ বছর পুরাতন ফলজ গাছ কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই বিক্রি করে দেন মোঃ সাইফুল ইসলাম সরকার। এই গাছ বিক্রির অর্থ তিনি ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. সাইফুল ইসলাম সরকার বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, এটা ছয় মাস আগের অভিযোগ। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে কোন সত্যতা পায়নি। ব্যাংক একাউন্টে লেনদেনের বিষয়টিকে তিনি অস্বাভাবিক মানতে নারাজ। তিনি জানান, কোম্পানির প্রফিট বোনাস এবং এডিআর থেকে অর্জিত আয় এই একাউন্টে লেনদেন হয়েছে। কিছু ব্যবসায়ি ও তার সহকর্মীরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
তবে বাংলা অ্যাফেয়ার্স হাতে থাকা তার সোনালী ব্যাংক একাউন্টের স্টেটমেন্ট থেকে অস্বাভাবিক লেনদেন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।






































