পিরোজপুর পৌরসভায় দুর্নীতির রাজত্ব, উন্নয়ন নেই বছরজুড়ে
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৪৬:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ জুন ২০২৫
- / 5882
প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হওয়ার পরও পিরোজপুর শহরে নেই কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পৌরসভার রাজস্ব ও তহবিলের অপচয়, দলীয়করণ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণেই আজকের এই করুণ অবস্থা।
পিরোজপুর পৌরসভায় তিনবারের মেয়র ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা হাবিবুর রহমান মালেক। তাঁর মেয়াদকালে পৌরসভার প্রায় সব অর্থ তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তে ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তবে পিরোজপুর পৌরসভার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র হিসাবরক্ষক মাইনুল ইসলাম। সাবেক মেয়র মালেকের অনুপস্থিতিতেও পৌরসভার নিয়ন্ত্রণ কার্যত তাঁর হাতেই রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা তাঁকে মেয়রের ‘ছায়ামন্ত্রী’ বা ‘ডান হাত’ হিসেবে আখ্যা দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, পৌরসভার যেকোনো বিল পাস করাতে হলে মাইনুলকে দিতে হয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন।
বিগত মেয়াদে যেসব উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছে, তার অর্থছাড়ও নাকি এই কমিশন নির্ধারণ করে দিত মাইনুল। এসব করে বেশ অর্থ সম্পদেরও মালিক হয়েছেন তিনি।
পিরোজপুর পৌরসভার একজন কর্মরত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে বলেন, “মাইনুলের বর্তমান অর্থ-সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা ছুঁই ছুঁই। সে এখনো সাবেক মেয়র মালেকের ছায়া হিসেবে গুপ্তচরের মতো কাজ করে চলেছে। আমরা ভেবেছিলাম নতুন সরকার এসে অন্তত এমন দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং প্রশাসনের ভেতর দুর্নীতিবিরোধী একটি বার্তা যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা—এখানে ডেভিল এখন সুপার ডেভিলে পরিণত হচ্ছে।”
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, পৌরসভার তহবিল থেকে লোপাট করা অর্থ দিয়ে মাইনুল ইসলাম পিরোজপুর বন বিভাগ এলাকার জমিতে একটি তিন তলা ফাউন্ডেশনবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করেছেন, যার প্রথমতলা পর্যন্ত কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে তিনি ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবসার মতো লাভজনক খাতেও পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন।
তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি ধরে রাখতে ও প্রশাসনের অনুকূলতা নিশ্চিত করতে গত রমজানে পৌরসভায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক মো. আসাদুজ্জামানকে ৮২ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোবাইল ফোন উপহার দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মাইনুল ইসলাম জানান, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আর মোবাইল ফোন ক্রয়ের ইস্যুতে তিনি জানান, ওই কর্ম কর্তা নিজেই পিরোজপুরের একটি মোবাইলের শোরুম থেকে এটি নেন। সে সময় তিনি মাত্র ৭ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এর পর পরই তিনি পিরোজপুর থেকে অন্যত্র বদলি হয়ে যান। বাকি টাকার জন্য এখনও ওই দোকানের লোকজন ঘুরছেন।
মেয়র মালেকের আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত রইছ উদ্দিন। পৌরসভায় তাঁর পদ ‘ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হলেও তিনি কার্যত পানি সরবরাহ বিভাগের সুপারভাইজারের মতো ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। দীর্ঘদিন ধরেই পৌর এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও এ সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি তাঁকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২১-২২ সালে পৌরসভার পানির সংশোধনাগারের পুকুর খননের জন্য বরাদ্দ পাওয়া অর্থ তিনি আত্মসাৎ করেন। এই অবৈধ অর্থেই তিনি পিরোজপুর শহরের উকিলপাড়ায় শ্বশুরের জমির ওপর বিলাসবহুল পাঁচ তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। শুধু তাই নয়, নিজের স্ত্রীকেও পৌরসভায় চাকরি দিয়েছেন রইছ উদ্দিন, যা স্বজনপ্রীতির জঘন্য উদাহরণ হিসেবে স্থানীয় মহলে সমালোচিত।
পৌরসভায় রাস্তা নির্মাণ কিংবা সংস্কারের দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই বললেই চলে। যা অল্পকিছু হয়েছে, তারও মান অত্যন্ত নিচু এবং কার্যক্রম ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, এসব কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন হিসাবরক্ষক মাইনুল ইসলাম ও ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট রইছ উদ্দিন।
তাঁরা দুজনেই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন মেয়রের ছায়ায় থেকে পৌরসভার উন্নয়ন তহবিল লুটপাটে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। এতে একদিকে যেমন পৌর নাগরিকদের মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে, অন্যদিকে অন্যায্য উপায়ে গড়ে উঠছে ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড়। স্থানীয়দের দাবি, এসব দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।
পৌরসভায় রাস্তা নির্মাণ বা মেরামতের কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। যেটুকু হয়েছে, তারও অধিকাংশই নিম্নমানের এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এসবের পেছনে এই মাইনুল ও রইছ এসব কাজে হিসাবরক্ষক মাইনুল সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, পৌর মেয়র ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
অভিযোগের বিষয়ে রইছ উদ্দিন জানান, তার বাড়ি কুষ্টিয়ায়। ২০০৫ সালে তিনি বর্তমান চাকরিতে যোগদান করেন। এ কারনে অনেকেই ঈর্শ্বানিত হয়ে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।





































