নষ্ট ও মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক পণ্য ছিলো বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৩৬:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
- / 366
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুড়ে যাওয়া কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে ছিলো নষ্ট-মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক পণ্য এবং অতি পুরাতন ও ব্যবহার অনুপোযোগী পণ্য। সর্বশেষ গত মে মাসে সতর্ক করা হলেও এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তবে দুর্ঘটনার পর এর দায় নিতে নারাজ সব কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর দায় কেউ এড়াতে পারে না।
ঢাকা কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে নতুন রাসায়নিক পন্যের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দ্রব্য, পুরাতন ও নষ্ট মালামাল স্তূপ করে রাখা ছিল। সবশেষ চলতি বছরের মে মাসেও একটি ইনভেন্ট্রি প্রতিবেদন তৈরী করে ঢাকা কাস্টমস। আরও ফরিদ উদ্দিনের নেতৃত্বে চারজন এআরও সেই প্রতিবেদন তৈরী করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ি, কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে রাসায়নিক পন্যের মধ্যে ছিলো জিংক ক্লোরাইড। যা ধুলা বা ধোঁয়া নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা করতে পারে। কেমিকেল পাউডার, অতিদাহ্য এভারক্লিয়ার, উচ্চ মাত্রার বিষাক্ত কীটনাশক ক্লোরপাইরিফস, জৈব রঞ্জক রিঅ্যাকটিভ ডাইসসহ বেশ কিছু ঝুকিপূর্ণ পণ্যও ছিলো সেখানে। এছাড়াও ছিলো মেয়াদোত্তীর্ণ পন্য।
ইনভেন্ট্রি প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্গো ভিলেজে সাত ধরণের নষ্ট ও মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক পন্য এবং দুই ধরণের অতি পুরাতন ও ব্যবহার অনুপোযোগী পন্য রয়েছে।
ফরিদ উদ্দিন বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন তৈরী কাস্টমসের রুটিন ওয়ার্ক। তবে মে মাসের প্রতিবেদন সম্পর্কে ভুলে গেছেন তিনি।
এদিকে আগুন লাগার ২৪ ঘন্টা পার হলেও ধোয়া উড়তে থাকে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় নিয়েও নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাসায়নিক পন্য থাকায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।
জানা যায়, আমদানী করা অন্যান্য পন্যের সাথেই রাখা হয় ঝুকিপূর্ণ পণ্য। তবে ঝুকির কথা মাথায় রেখে এসব পণ্যের জন্য ভিন্ন স্থান নির্ধারণ করার কথা ছিলো। কিন্তু পরে তা করা হয়নি। সবশেষ গেলো বছরের ডিসেম্বরেও এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো।
কাস্টমস হাউজের উপকমিশনার মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের একটি বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছিলো। তবে এরপর কি হয়েছে তা জানা নেই।
উপকমিশনার কামরুল ইসলাম জানান, ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে অন্যান্য সংস্থার পাশাপাশি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি করে দিয়েছে। তারা প্রতিবেদন দিলে ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।
জানা যায়, কাস্টমস বিভাগ থেকে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তারা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল যে, এসব সামগ্রী বিপজ্জনক ও আগুন লাগার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এগুলো দ্রুত সরানো না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবুও দীর্ঘদিন ধরে এসব মালামাল সরানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ঝুকিপূর্ণ পন্যের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও, এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বুশরা ইসলাম।
বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, আর কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এছাড়া নিলাম ও মালামাল ধ্বংসের দায়িত্ব কাস্টমস বিভাগের।
বিমানের কর্মকর্তারা জানান, কার্গো ভিলেজে পন্য আসার পর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অবগত করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী তিন কার্যদিবসের মধ্যে মালামাল বুঝে নিতে হয়। আর কেউ পণ্য না নিলে ২১ কার্যদিবস পর সেটি বাজেয়াপ্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তা নিলাম করে।
তারা জানায়, কার্গো কমপ্লেক্সের যেকোন পণ্য নিলাম বা ধ্বংস করা কাস্টমসের আওতাধীন। বিমানের পক্ষ থেকে দফায় দফায় তাগাদা দেওয়ার পরও তা করা হয়নি।
এদিকে কাস্টমস জানায়, আইনি জটিলতায় মালামাল নিলাম বা ধ্বংসে বছরের পর বছর লেগে যায়। আর সেজন্যই গুদামে ঝুকিপূর্ণ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ মালামাল থেকে যায়। সেক্ষেত্রে ভিন্ন স্থান থাকলে ঝুকি কিছুটা কম হয়।
বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা, উদাসীনতা এবং অব্যবস্থাপনাই এই বিপর্যয়ের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনা বড় ধরনের শিক্ষা হওয়া উচিত। বিমানবন্দর এলাকা যেহেতু সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিশিষ্ট এলাকা হিসেবে বিবেচিত, সেখানে এভাবে বিপজ্জনক ও পরিত্যক্ত রাসায়নিক পণ্য মজুদ রাখা চরম নিরাপত্তা হুমকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সমন্বয় এবং তদারকির প্রয়োজন ছিল সর্বোচ্চ মাত্রায়, সেখানে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও উদাসীনতা আজ প্রাণহানি না ঘটলেও, ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ ইঙ্গিত দিয়ে গেল। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কেবল ক্ষতিপূরণের হিসাব করে থেমে যায়, না কি দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা রোধে উদ্যোগ নেয়।




































