ঢাকা ০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ভোলা-ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম: দুর্নীতির একই চিত্র, ভিন্ন স্থান

তিনি গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর লোক!

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:৩৫:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 233

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাভার সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাভার সার্কেলকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আর এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান। তার বিরুদ্ধে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রনেরও অভিযোগ উঠেছে।

দুদকে দাখিল করা এক লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, বদরুল আলম খান ২০০৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন; সে সময় তিনি নিজেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। আর এই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি কর্মক্ষেত্রে দ্রুত সময়ের মধ্যে পদোন্নতি পেয়ে সংস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টিং বাগিয়ে নেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভোলায় কর্মরত থাকাকালে আদালত ভবন, হাসপাতাল, থানা, ভূমি অফিস, টিটিসি ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ একাধিক প্রকল্পে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেন তিনি। বিনিময়ে এসব কাজ থেকে শতকরা ১৫ ভাগ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

 

এই কর্মকর্তার বাড়ি ব্রাহ্মনবাড়িয়ায়; সেই সুবাধে সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীর কাছাকাছি চলে আসেন তিনি। একদিকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা; অন্যদিকে মন্ত্রীর নির্বাচনী আসনের- এই দুই পরিচয় কাজে লাগিয়ে ২০২০ সালে ময়মনসিংহে পোস্টিং নেন তিনি। সেখানে বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনে ঘুষ গ্রহণ ও বিধিবহির্ভূত কার্যক্রমের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে একপর্যায়ে তাকে ওএসডিও করা হয়।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও বদরুল আলম খান নিজেকে ‘জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী’ এবং কখনো কখনো ‘সচিবের লোক’ পরিচয়ে প্রভাব বজায় রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

দুদকের নথি অনুযায়ী, সংস্থাটির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাভার সার্কেলে পদায়ন নেন।
এই সার্কেলের আওতাধীন মিরপুর, সাভার, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ বিভাগের বড় প্রকল্পগুলোতে শতকরা ৮০ ভাগ কাজ এলটিএম হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, তিনি ১৫ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে ওটিএম পদ্ধতিতে কাজ বিক্রি করেছেন।

 

দুদকের অভিযোগপত্রে একাধিক প্রকল্পের ই-জিপি আইডি উল্লেখ করে বলা হয়েছে-গাজীপুর সদর থানা, কালিয়াকৈর থানা, ভাষানটেক থানা, মডেল মসজিদ, র‍্যাব ট্রেনিং স্কুল, পুলিশ ব্যারাক ও আবাসিক ভবন নির্মাণসহ অন্তত ১৫টি বড় প্রকল্প থেকে শতকরা ৫ ভাগ হারে কমিশন আদায় করা হয়েছে। শুধু এসব প্রকল্প থেকেই ১৫ কোটি টাকার বেশি কমিশন সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নের নামে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগও দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে বদরুল আলম খানের স্ত্রী; যিনি নিজেও শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা তার পরিচয় গোপন করে ঢাকার মালিবাগে গার্মেন্টস ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট কার্যক্রম, গুলশানে একাধিক ফ্ল্যাট, বসুন্ধরায় তিনটি প্লট, কোটি কোটি টাকার এফডিআর এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে।

 

গণপূর্ত বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বদরুল আলম খান একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দিতে চাপ, হুমকি, এমনকি অফিস ঘেরাওয়ের পরিকল্পনার অভিযোগও রয়েছে। নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকা এবং সাইট পরিদর্শনে গাফিলতির অভিযোগও উঠেছে।

 

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদ বদরুল আলম খান বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ঘনিষ্ট লোক হওয়ায় তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে।

তার রাজধানীতে কোন সম্পদ নেই। মালিবাগে তিনি শ্বশুরের ফ্ল্যাটে থাকেন। আর তার স্ত্রী যেহেতু সরকারি কর্মকর্তা; সুতরাং তারও ব্যবসা করার সুযোগ নেই। এসবই অপপ্রচার বলে দাবি করেন তিনি।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ভোলা-ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম: দুর্নীতির একই চিত্র, ভিন্ন স্থান

তিনি গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর লোক!

সর্বশেষ আপডেট ০১:৩৫:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাভার সার্কেলকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আর এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান। তার বিরুদ্ধে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রনেরও অভিযোগ উঠেছে।

দুদকে দাখিল করা এক লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, বদরুল আলম খান ২০০৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন; সে সময় তিনি নিজেকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। আর এই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি কর্মক্ষেত্রে দ্রুত সময়ের মধ্যে পদোন্নতি পেয়ে সংস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টিং বাগিয়ে নেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভোলায় কর্মরত থাকাকালে আদালত ভবন, হাসপাতাল, থানা, ভূমি অফিস, টিটিসি ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ একাধিক প্রকল্পে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেন তিনি। বিনিময়ে এসব কাজ থেকে শতকরা ১৫ ভাগ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

 

এই কর্মকর্তার বাড়ি ব্রাহ্মনবাড়িয়ায়; সেই সুবাধে সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীর কাছাকাছি চলে আসেন তিনি। একদিকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা; অন্যদিকে মন্ত্রীর নির্বাচনী আসনের- এই দুই পরিচয় কাজে লাগিয়ে ২০২০ সালে ময়মনসিংহে পোস্টিং নেন তিনি। সেখানে বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনে ঘুষ গ্রহণ ও বিধিবহির্ভূত কার্যক্রমের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে একপর্যায়ে তাকে ওএসডিও করা হয়।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও বদরুল আলম খান নিজেকে ‘জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী’ এবং কখনো কখনো ‘সচিবের লোক’ পরিচয়ে প্রভাব বজায় রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

দুদকের নথি অনুযায়ী, সংস্থাটির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাভার সার্কেলে পদায়ন নেন।
এই সার্কেলের আওতাধীন মিরপুর, সাভার, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ বিভাগের বড় প্রকল্পগুলোতে শতকরা ৮০ ভাগ কাজ এলটিএম হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, তিনি ১৫ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে ওটিএম পদ্ধতিতে কাজ বিক্রি করেছেন।

 

দুদকের অভিযোগপত্রে একাধিক প্রকল্পের ই-জিপি আইডি উল্লেখ করে বলা হয়েছে-গাজীপুর সদর থানা, কালিয়াকৈর থানা, ভাষানটেক থানা, মডেল মসজিদ, র‍্যাব ট্রেনিং স্কুল, পুলিশ ব্যারাক ও আবাসিক ভবন নির্মাণসহ অন্তত ১৫টি বড় প্রকল্প থেকে শতকরা ৫ ভাগ হারে কমিশন আদায় করা হয়েছে। শুধু এসব প্রকল্প থেকেই ১৫ কোটি টাকার বেশি কমিশন সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নের নামে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগও দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে বদরুল আলম খানের স্ত্রী; যিনি নিজেও শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা তার পরিচয় গোপন করে ঢাকার মালিবাগে গার্মেন্টস ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট কার্যক্রম, গুলশানে একাধিক ফ্ল্যাট, বসুন্ধরায় তিনটি প্লট, কোটি কোটি টাকার এফডিআর এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে।

 

গণপূর্ত বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বদরুল আলম খান একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দিতে চাপ, হুমকি, এমনকি অফিস ঘেরাওয়ের পরিকল্পনার অভিযোগও রয়েছে। নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকা এবং সাইট পরিদর্শনে গাফিলতির অভিযোগও উঠেছে।

 

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদ বদরুল আলম খান বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ঘনিষ্ট লোক হওয়ায় তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে।

তার রাজধানীতে কোন সম্পদ নেই। মালিবাগে তিনি শ্বশুরের ফ্ল্যাটে থাকেন। আর তার স্ত্রী যেহেতু সরকারি কর্মকর্তা; সুতরাং তারও ব্যবসা করার সুযোগ নেই। এসবই অপপ্রচার বলে দাবি করেন তিনি।