খাস কালেকশনের নামে
টোলবাজ জামায়াত নেতার রমরমা চাঁদা আদায়
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৫৯:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ জুলাই ২০২৫
- / 1051
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নাফ নদে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপের জেটিঘাট। এখান দিয়ে যাতায়াতকারী জনসাধারণ বা জেলে নৌকা থেকে নিয়মিত টোল আদায় করা হয়। এ জন্য জেটিঘাটের ইজারা নিতে হয় জেলা পরিষদ থেকে। চলতি বছরের ইজারা না হলেও জেলা অফিসের পিয়নকে ইজারাদার সাজিয়ে একটি চক্র তিন মাস ধরে টোল আদায় করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলে লুটপাট চালাচ্ছে। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কক্সবাজারের এক জামায়াত নেতাসহ স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী লোকজন।
এদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৫৫০ মিটার লম্বা ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত জেটিটি ২০০৪ সালে কক্সবাজার জেলা পরিষদকে স্থানান্তর করলে, সেটি ২০০৬ সালে উদ্বোধনের পর জেটিটির দেখভালের দায়িত্ব পান জেলা পরিষদ। প্রতি বছর জেটিটি ইজারা দেওয়া হলেও চলতি বছরে জেটিটি ইজারা না হওয়ায় এবার খাস কালেকশন আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয় জেলা পরিষদ। এই সুযোগে জেলা পরিষদ কার্যালয়ের পিয়ন মোহাম্মদ শাহ আলমকে ইজারাদার সাজিয়ে একটি চক্র টোল আদায় শুরু করে। সম্প্রতি শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাটে চার-পাঁচজন ব্যক্তিকে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে টোল আদায় করতে দেখা যায়। সেই রসিদেও ইজারাদার হিসেবে শাহ আলমের নাম আছে। যদিও পিয়নের নামে ইজারার কোনো বিধান নেই। তারপরও খাস কালেকশন যে নিয়মে আদায় করার কথা, তার সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূতভাবে স্থানীয়দের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা উত্তোলন করে লুটপাট চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো বিষয়টিই লোক দেখানো। ওই ঘাটের কোনো ইজারা দেওয়া হয়নি। কিন্তু কক্সবাজার পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি আনোয়ার হোসেন এবং দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইউনুছ ওরফে বাইলা সহ কয়েকজন লোক মিলে সেখান থেকে টোল আদায় শুরু করেন। এপ্রিলের (বৈশাখের শুরু) মাঝামাঝি থেকে এই চক্রটি জেটিতে আসা প্রতিজনের কাছ থেকে ১০-২০ টাকা করে আদায় করছে। এছাড়া জেটির অদূরে অবস্থিত জেলেপল্লির জালিয়াপাড়া ঘাট ও দক্ষিণ জালিয়াপাড়া ঘাট এবং জেটিঘাট আলাদাভাবে ২৪ লাখ টাকায় ইজারা দেয়। তারা সেখান থেকেও প্রতি ড্রাম মাছ থেকে ১০০ টাকা করে আদায় করছে এবং প্রতি মাছ ধরার ট্রলার থেকে বছরে ৪ হাজার টাকা করেও নিচ্ছে বলে জেলেরা জানিয়েছেন। এলাকায় প্রচার রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে মোটা অঙ্কের টাকা লুটপাট চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিজেকে খাস কালেকশন আদায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত দাবি করে জামায়াত নেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শুরুতে জেলা পরিষদ থেকে জেটিঘাট ইজারা নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও পরে সে কথা থেকে সরে এসে বলেন, তাকে জেলা পরিষদ থেকে খাস কালেকশন উত্তোলনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জেটিঘাটসহ আশপাশের কোনো ঘাট ইজারা বা বিক্রি করিনি। যেহেতু খাস কালেকশন আদায় করতে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাই আমার লোকজন সেখানে খাস কালেকশন আদায় করছে। পরবর্তীতে সেই টাকা গুলো জেলা পরিষদকে জমা দেওয়া হয়। এখানে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের কোনো সুযোগ নেই।’
তবে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-মারুফ বলেন, ‘শাহপরী জেটিঘাট ইজারা না হওয়ায় খাস কালেকশন আদায় চলছে। আমাদের অফিসের মোহাম্মদ শাহ আলম খাস কালেকশনের দায়িত্বে আছেন। তাই কোনোভাবে কেউ ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই। যদি এ ধরনের কোনো বিষয় থাকে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শাহপরীর দ্বীপে মাছ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শফিক বলেন, ‘ইজারাদার দাবি করে স্থানীয় মো. ইউনুছ বাইলা এবং জিয়াবুল আমাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে। টাকা না দিলে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতদিন ইজারাদার দাবি করে টাকা আদায় করে আসছিল। কিন্তু এখন জেনেছি জেলা পরিষদ থেকে জেটিঘাট কোনো ইজারা দেয়নি। তারপরও ঘাটে টাকা আদায় করছে।’
এদিকে শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাটে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে খাস কালেকশন নামে ৪-৫ জন মিলে টাকা আদায় করেন। এ সময় তারা জেলা পরিষদের নামে একটি টোল আদায়ের রসিদও দিচ্ছেন, যেখানে ইজারাদার হিসেবে জেলা পরিষদের অফিস পিয়ন মোহাম্মদ শাহ আলমের নাম রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে একজন পিয়ন ইজারাদার হয়?
স্থানীয়রা বলছেন, একটি অসাধু চক্র মূলত ইজারার নাম ভাঙিয়ে লোকজনকে ইজারা দিয়ে লাখ লাখ টাকা লুটপাট করেছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে একাধিকবার কল করেও ইজারাদার মোহাম্মদ শাহ আলমকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, ‘জামায়াত নেতা আনোয়ার জেলা পরিষদের কাছ থেকে ইজারা নেওয়ার কথা বলে স্থানীয় কিছু ব্যক্তিকে আলাদা করে ঘাটগুলো বিক্রি করে দেন। এসব ঘাট থেকে এ পর্যন্ত ২৪ লাখ টাকা আদায় করেছেন। তিন মাসের মাথায় এসে জানতে পারি শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট কোনো ইজারা দেয়নি জেলা পরিষদ। এখন প্রশ্ন হলো—কার প্রশ্রয়ে তারা এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে? এমনকি জেটিঘাটে অসহায় জেলে, বড়শি নিয়ে মাছ শিকারীদের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা নিয়ে এক বছরের জন্য ইজারা দিয়েছেন মো. ইউনুছ ওরফে বাইলা।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. ইউনুছ বাইলা বলেন, ‘আমি কোনো ইজারাদার নই। ফলে আমি কাউকে ইজারা দেওয়ার প্রশ্নও আসে না। মূলত আমি এক নেতার অধীনে টোল আদায় করছি। এর বাইরে আমি কোনো কিছুতে জড়িত নই।’

নাম না বলার শর্তে শাহপরীর দ্বীপের এক টোল আদায়কারী বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট ইজারা না হওয়ায় জেলা পরিষদ খাস কালেকশন আদায় করছে বলে শুনেছি। তবে কিছু প্রভাবশালী ইজারাদার দাবি করে ঘাট আলাদাভাবে বিক্রি করেছে। কিন্তু এখন এসে তারা খাস কালেকশন আদায় করছে বলে প্রচার করছে। যদিও সরকারি খাস কালেকশন আদায়ের কিছু নিয়ম রয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার অধীনে প্রতিদিন যে টাকা আদায় হবে, সে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হবে। কিন্তু শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাটের চিত্র ভিন্ন। এখানে এলাকা ভাগ করে বছরের টাকা একত্রে লাখ লাখ টাকা আদায় করেছেন, যা সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত।’
শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, ‘সম্প্রতি টোল আদায় নিয়ে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্ব সমাধানে নিজেকে ইজারা দাবিদার মোহাম্মদ আনোয়ারসহ আমরা একটি বৈঠকে বসেছিলাম। কিন্তু সেখানে কোনো সমাধান হয়নি। ফলে বিষয়টি এখন ইউএনও স্যার দেখছেন।’
জেলা জামায়াতের আমির নুর আহমেদ আনোয়ারী বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমি বিষয়টি জেনেছি। ইজারার বিষয়টি খতিয়ে দেখে সত্যতা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘কতিপয় ব্যক্তি বেআইনিভাবে শাহপরীর দ্বীপের ঘাট ইজারা দিয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া অবৈধভাবে কেউ যদি চাঁদা ও খাস কালেকশন আদায় করে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাটের বিষয়ে একটি অভিযোগ এসেছে। সেটি সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখে জানাতে বলা হয়েছে। এ ধরনের অনিয়মে সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’































