ঢাকা ১২:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জুলাই চার্টার নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:৪৭:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 51

সিজিএস আয়োজিত সংলাপে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা। ছবি: বাংলা অ্যাফেয়ার্স

জুলাই চার্টার নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু জনগণের মধ্যে এখনও ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে- গণভোটটি ঠিক কোন বিষয়ে, কীভাবে হবে এবং এ সংক্রান্ত নাগরিক অধিকার সম্পর্কে মানুষ পর্যাপ্তভাবে জানে কি না। সে প্রশ্নও থেকে যায়। একইসঙ্গে, প্রশাসনিক কাঠামো কোনো রাজনৈতিক দলকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে কি না, তা নিয়েও জনমনে উদ্বেগ আছে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন” শীর্ষক একটি নীতি সংলাপে বিশিষ্টজনেরা এ মন্তব্য করেন। আজ রবিবার ( ১৮ জানুয়ারি ) সকালে রাজধানীর সিরডাপ (সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, জাপা মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, সিপিবি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বিএনপি এর সাবেক মন্ত্রী নিলুফার চৌধুরী মনি ব্রিটিশ স্কুল অব ল’ এর ভাইস প্রিন্সিপাল ব্যারিস্টার নুসরাত খান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বজলুর রশীদ ফিরোজ, খেলাফত মজলিস-এর যুগ্ম মহাসচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সাবেক জজ ইকতেদার আহমেদ, ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর সাবেক অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শওকত আলী হাওলাদার, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান, ব্যারিস্টার সারওয়ার হোসেন, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী, সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী প্রমুখ।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, সংস্কার কি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে বলেন যে কোনো সংস্কারই হয়নি, কিন্তু এতো অল্প সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এতগুলো সংস্কার কখনো হয়নি। আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে। যেখানে আগে মোটামুটি রাখার অবস্থাও ছিল না, এখন সেখানে তা সম্ভব হয়েছে। সংস্কারে ১০টি কথার পরামর্শের মধ্যে ৬টি রাখা হয়েছে, তাই আপনাদের বলার সুযোগ নেই যে আপনারা কোনো পরামর্শ রাখেননি।

তিনি উল্লেখ করেন, কিছু মানুষ নেতিবাচকতা ছড়িয়ে দেয় যা এক ধরনের উদ্দীপক হতে পারে, তবে এগুলো মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তিনি বলেন, ১৯৫৪-৫৫ সালের যে প্রত্যাশা ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠন করা, তা আমরা করেছি। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ যে নিয়োগ হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো। তিনি আরও বলেন, সরকারের সব ক্ষমতা উচ্চ আদালতকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে জবাবদিহিতা ছাড়া স্বাধীনতা সফল হয় না। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের কোড অব কন্ডাক্টকে কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। মেজরিটি প্রোভিশন মানুষকে সফলতা দেবে। আইনগত সহায়তা এখন ৫ গুণ বেড়েছে। তিনি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য যা কিছু প্রয়োজন ছিল, আমরা তা করেছি। তিনি বলেন, যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়, তবে আপনি এর সফলতা পাবেন।

পরিশেষে তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আইনের শাসনের পথে আমরা অনেকটাই এগিয়ে গেছি। তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার যদি পরবর্তীতে আন্তরিকতা না দেখায়, তবে আমরা এর সফলতা অর্জন করতে পারব না।

একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহিতা এবং আইন প্রয়োগে সমতা বিধানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন কীভাবে সুনিশ্চিত করা সম্ভব, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।

জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সংস্কার নিয়ে যে মাত্রায় আলোচনা শুরু হয়েছে, তা আগে এত ব্যাপকভাবে দেখা যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, যে দেশে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে, সে দেশে রাষ্ট্র পরিচালনার নানা ক্ষেত্রও সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যায়। একইভাবে, আইনের শাসন নিশ্চিত থাকলেই বোঝা যায় দেশে গণতন্ত্র বিদ্যমান। আর গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্যও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

তিনি বলেন, আমরা অনেক কথা বলি, কাজও করি, কিন্তু বাস্তবে করার চেয়ে বলার পরিমাণই বেশি থাকে। সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে রিফর্ম কমিশন গঠন করলেও কমিশন প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনও হয়নি।

 

জিল্লুর রহমান বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ যে জায়গায় ন্যায়বিচার ও আস্থা খুঁজে পাবে বলে আশা করে, বাস্তবে সেই প্রত্যাশা অনেক সময় পূরণ হচ্ছে না।

 

তিনি জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারপতি নিয়োগ, এবং মামলার জট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।

 

তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচার বিভাগের জবাবদিহিতাও প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে আইন পরিবর্তন করেছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে।

 

রিফর্ম কমিশনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় ৪৩ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই মামলাজট কমাতে বিচার বিভাগকে আরও পরিকল্পিত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে।

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ৪৭ লাখ মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, হাই কোর্টের যে মামলার রিপোর্টগুলো রয়েছে, সেগুলো নিষ্পত্তি করতে ২৫ থেকে ৩০ বছর সময় লাগবে।

তিনি বলেন, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা ছাড়া, দক্ষ বিচারক ও গতিশীল বিচারক না থাকলে এই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, হাই কোর্ট বিভাগে বর্তমানে যে বেঞ্চগুলো রয়েছে, সেগুলোর মতো নতুন বেঞ্চ গঠন না করলে মামলার নিষ্পত্তি কমানো সম্ভব নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেমন বৃদ্ধি করতে হবে, তেমনি বিচার বিভাগে যোগ্য ব্যক্তির সংখ্যা বাড়াতে হবে।

তিনি জানান, যতদিন না বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততদিন বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠাও সম্ভব হবে না। তিনি মব নিয়ে সন্দিহান এবং তাদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব রয়েছে কি না, তা জানেন না। মবের মাধ্যমে বিপ্লবী নেতা বা বিপ্লবী মতাদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। ডিজিটাল ফর্মে বিচার কাজ পরিচালিত হলে, বিপুল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে।

 

ড. বোরহান উদ্দিন খান বলেন, বিচার বিভাগ এবং আইনের শাসন অতীতে আরও শক্তিশালী ছিল; তবে সময়ের সাথে সাথে, আইনের চর্চা অবনতির দিকে এগিয়েছে, যদিও আইনের প্রয়োগের বিষয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। অনেক রাজনৈতিক দল আইনের শাসন রক্ষা এবং শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু খুব কমই এই প্রতিশ্রুতিগুলি পূর্ণ হয়েছে। বিচার ব্যবস্থায় জনগণের বিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এটি পুনরুদ্ধার করতে হবে। এজন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বিচারিক নেতৃত্বের প্রয়োজন, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রচারে এবং আইন সঠিকভাবে ও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, সরকার আছে, তবে মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হচ্ছে না। তিনি বলেন, বিচারকের নিয়োগ প্রক্রিয়া আগের মতোই চলছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মামলার ক্ষেত্রে যে বিচারপতিরা ছিলেন, তাদের কারো না কারো পক্ষ থেকে ছোটাছুটি ছিল। তিনি মন্তব্য করেন, যদি সরকারের বিরুদ্ধে ভয় কাজ না করে, তবে আমাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে রয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না এবং তাদের স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, যখন রাজনৈতিক দলগুলো সরকারে থাকে, তখন সেই দল বিচার বিভাগের কাজে প্রভাব ফেলেছে, যা আমাদের হতাশ করে।

তিনি বলেন, বিচারকদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে, এবং বিচার বিভাগের সুষ্ঠু কাজের জন্য আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে।

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে বিচার বিভাগে।

তিনি বলেন, বিচারকের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মানদণ্ডের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকারের যদি সদিচ্ছা রাখে, তবে একদিনেই সরকারের ক্ষমতা-বিভাগ (separation of power) সম্ভব। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সরকার এই সদিচ্ছা প্রকাশ করেনি।

তিনি মন্তব্য করেন, ক্ষমার সংস্কৃতির বন্ধ করা প্রয়োজন। মব সৃষ্টি হয়েছে ৯ আগস্ট সচিবালয় থেকে এবং মবের হাত থেকে আপনি নিজেও রক্ষা পাবেন না।

তিনি বলেন, সরকার মবকে উৎসাহিত করছে তাদের ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য।

তিনি বলেন, গণভোটটি অগ্রহণযোগ্য। গণভোট সম্পর্কে আপনি প্রচার করতে পারেন, কিন্তু “হ্যাঁ” বা “না” প্রচার করতে পারবেন না। এখানে সরকারের নিরপেক্ষতা হারিয়ে গেছে।

অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, বিচারকদের আচরণ আগে যেমন ছিল, এখনো তারা সেই ধারা থেকে বের হতে পারেনি।

তিনি উল্লেখ করেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য আমরা দিনের পর দিন ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করে আসছি, কিন্তু এখনো কোনো পরিবর্তন আসে নাই।

তিনি বলেন, এখন বিচারক নিয়োগের জন্য জুডিশিয়াল সাভিস কমিশনের এ ভালো ভালো ছেলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আসছে, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এখন থেকেই তাদের উপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সব রাজনৈতিক দলই ইস্তেহার দিলেও, কেউই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে না। তিনি বলেন, বিচারপতিরা নিজেদের স্বাধীনতার ব্যাপারে সচেতন না হলে, অনেক সময় তাদের সহনশীলতা এবং শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে।
তিনি মনে করেন, যদি আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ থাকেন, তবে যে কোনো সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে।

অ্যাডভোকেট শওকত আলী হাওলাদার বলেন, দেশে অনেক আইন থাকলেও সেগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, তা দেখা জরুরি।

তিনি উল্লেখ করেন, আইন যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে আইন প্রণয়ন করে লাভ কী—এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে অনেক মামলা হলেও বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলতে থাকে, কিন্তু সময়মতো সমাধান আসে না। এ অবস্থার পরিবর্তনে কীভাবে আইন বাস্তবায়ন কার্যকর করা যায় এবং বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও ফলপ্রসূ করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের আরও সিরিয়াস হতে হবে এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, আমরা বাংলাদেশের জন্ম থেকেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি, কিন্তু যে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় ছিল, তারা এই বিশেষ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক মামলাগুলি এখনও রয়েছে, এবং কিছু মামলার নিষ্পত্তি করতে ৩০ দিন লাগে, আবার কিছু মামলার সমাধান করতে ৩০ বছরও লাগে।

তিনি বলেন, এই বিষয়গুলোকে আমাদের খুবই সিরিয়াসভাবে দেখতে হবে। স্বচ্ছতার মাধ্যমে বিচার নিয়োগ কমিশন তৈরি করতে হবে, এবং রাজনৈতিক মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মানুষকে মামলার বিষয়ে সচেতন করতে হবে এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার টার্মিনোলজিতে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, আমরা শুধু প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের কথা বলছি, কিন্তু স্বাধীনতার পরেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, সংবিধানের শুরুতেই আমরা এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারিনি। আমাদের মানসিকতা হচ্ছে, বিচার বিভাগের যে উদ্দেশ্য ছিল, তার শুরু থেকেই সেটি আমাদের কাছে অবাস্তব ছিল।

তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে, তার প্রতি আমরা যথাযথ মনোযোগ দিচ্ছি না।

ব্যারিস্টার নুসরাত খান বলেন, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা বা নতুন করে স্বাধীনভাবে কাজ করার বিষয়টি কার্যকরভাবে চালু করতে হলে, সেখানে যাঁরা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছেন, তাঁদের ক্ষমতা-বিভাগের পরিপূর্ণতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যে রাজনৈতিক দল সরকারে থাকে, তাদের বিচার বিভাগে যথেষ্ট প্রভাব থাকে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নতুন করে করতে হবে, এবং ক্ষমতা-বিভাগ নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা কাগজে কলমে অনেক কিছু লিখতে পারি, কিন্তু বাস্তবে সেগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয় না।

শামীম হায়দার পাটওয়ারী বলেন, যদি দীর্ঘ সময় ধরে অন্যায় চলতে থাকে, তবে তা আরও বড় আকারে ফিরে আসে এবং গণ বিচারকে উৎসাহিত করে। যদিও বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন হওয়া উচিত, কিন্তু এটি বাস্তবে প্রায়ই স্বাধীনতার অভাব থাকে। বিচার বিভাগের অত্যাচার অন্যায়ের একটি অন্যতম বিপজ্জনক রূপ, যা প্রতিরোধ করতে হবে জবাবদিহিতা এবং সংস্কারের মাধ্যমে। বিচার বিভাগের প্রতিষ্ঠানের উন্নতি প্রয়োজন, কিন্তু যথাযথ বাজেট বরাদ্দ এখনও হয়নি। বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন, কারণ ভারতসহ অনেক দেশ বাংলাদেশের তুলনায় বিচার ব্যবস্থায় এগিয়ে। যখন মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর সময় লাগে, তখন ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়, প্রায়ই প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের জন্য তা অস্বীকারিত হয়।

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন আলোচনা করার সময়, এটি চিহ্নিত করা জরুরি যে, আইনের শাসন শুধু আইন থাকার মাধ্যমে নয়, বরং সেগুলি কিভাবে সঠিকভাবে এবং ন্যায়পরায়ণভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর নির্ভর করে। বাস্তবে, আইন প্রণয়ন একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক স্তরের মাধ্যমে ঘটে, যেখানে নীতিগত সিদ্ধান্তগুলি প্রায়শই প্রক্রিয়া বিলম্ব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়ে। যদিও এটি সব সময়ে প্রতিটি আইন সমানভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে, তবে রাষ্ট্রকে ন্যূনতম শর্তে নাগরিকদের জন্য সময়মতো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এসব ন্যূনতম ন্যায়বিচারের গ্যারান্টি অপরিহার্য; এটি জনগণের কল্যাণ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক শাসনের বৈধতার জন্য মৌলিক প্রয়োজন।

 

ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল বলেন, প্রায়ই, ক্ষমতাসীনরা অপরাধ এবং দুর্নীতির জন্য জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পেয়ে যান। তাই একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামো থাকা প্রয়োজন যাতে নাগরিকরা সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন, কোনও ভয় বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। বিচারিক নিয়োগ অবশ্যই মেধাভিত্তিক এবং স্বচ্ছ হওয়া উচিত যাতে বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয়। বিচারিক সচিবালয় (সচিবালয়) রাজনৈতিক প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকতে হবে, একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দ্বারা সমর্থিত যাতে এর সততা এবং কর্মক্ষমতা বজায় থাকে। বিচার পরিষদও পক্ষপাতিত্ব এবং প্রিয়জনের সম্পর্ক থেকে মুক্ত থাকতে হবে, যাতে নিয়োগগুলি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সংযোগ দ্বারা চালিত না হয়। অবশেষে, ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এবং কার্যকর হতে হবে, কারণ বিলম্বিত ন্যায়বিচার জনগণের বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং নাগরিকদের অধিকার অস্বীকারিত হয়।

 

প্রাক্তন বিচারপতি ইকতেদার আহমেদ বলেন, আইনগত ক্ষেত্রের মধ্যে কর্মী নিয়োগ প্রায়ই রাজনৈতিক বিবেচনার দ্বারা প্রভাবিত হয়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সততা ক্ষুণ্ণ করে। এই প্রক্রিয়া সিস্টেমের মধ্যে বিদ্যমান কাঠামোগত সমস্যাগুলিকে আরও বাড়িয়ে তোলে, যার ফলে অকার্যকরতা এবং জবাবদিহিতার অভাব দেখা দেয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি হলো বিচারকের অপ্রতুল সংখ্যা, যা মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত করে এবং বিচার প্রক্রিয়ার সামগ্রিক কার্যকারিতাকে চাপ দেয়। এই কাঠামোগত ঘাটতিগুলি সমাধান করা ন্যায়বিচারের অ্যাক্সেস উন্নত করতে এবং একটি ন্যায়সঙ্গত আইনি সিস্টেম নিশ্চিত করতে অপরিহার্য।

 

ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, বছরের পর বছর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তবে বাস্তবিক সমাধানগুলি প্রায়ই অগ্রাধিকার পায়নি। আলোচনা প্রায়ই উচ্চ আদালতের ওপর কেন্দ্রীভূত থাকে, অথচ বৃহত্তর বিচার ব্যবস্থা কম মনোযোগ পায়। বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ২০০ আইন রয়েছে, তবে বড় উদ্বেগ হলো এগুলি কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে যেটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো সত্যিকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী পেশাদার মূল্যবোধ। কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, এই দেশটি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, না কি আইনগুলো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে, যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা নীতিগত রিপোর্টিং এবং দুর্বল জবাবদিহিতায় পরিণত হয়।

 

ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রায়ই, ন্যায়বিচার পক্ষপাতিত্ব দ্বারা বিঘ্নিত হয়, এবং মৌলিক স্বাধীনতা যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা যথাযথভাবে রক্ষা করা হয় না। আজকের সবচেয়ে জরুরি সমস্যা হলো ব্যাপক দুর্নীতি, যা উচ্চ স্তর থেকে নিচু আদালত পর্যন্ত বিদ্যমান, যা বিচার বিভাগের সততাকে আরও দুর্বল করে দেয়। বিলম্বিত ন্যায়বিচার ন্যায়বিচার অস্বীকারিত করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এবং এই বাস্তবতা একটি সিস্টেম তৈরি করতে থাকে যেখানে নাগরিকদের অধিকার দুর্বল হয় এবং জবাবদিহিতা অনুপস্থিত থাকে।

 

ব্যারিস্টার সারওয়ার হোসেন বলেন, যদি বিচার বিভাগের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব অব্যাহত থাকে, তবে সত্যিকার বিচারিক স্বাধীনতা কখনও বাস্তবায়িত হতে পারে না। বিচার ব্যবস্থার সততা নিশ্চিত করতে হলে, এটি বাহ্যিক চাপ এবং প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে, যাতে ন্যায়বিচারের ব্যবস্থাপনায় নিরপেক্ষতা এবং সঠিকতা নিশ্চিত হয়।

 

পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, একটি প্রবাদ আছে, “ক্ষমতা হচ্ছে সঠিকতা।” তবে সমাজগুলি সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে, এটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে শুধু ক্ষমতা দিয়ে শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার বা বৈধতা স্থাপন করা যায় না। এটি একটি সামাজিক চুক্তির ধারণা তৈরি করেছিল, যেখানে কর্তৃপক্ষকে আইন, জবাবদিহিতা এবং নাগরিকদের অধিকার দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়। ইতিহাস জুড়ে, নেতৃবৃন্দ এবং সংস্কারকরা আইনি কাঠামো প্রবর্তন করেছেন যা সমাজগুলোকে পরিচালনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাধা প্রদান করতে সহায়ক। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। বিশ্ব ন্যায়বিচার প্রকল্পের আইন শাসন সূচক ২০২৫ অনুযায়ী, ১৪৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে ১২৫ তম স্থানে রয়েছে, যা পূর্বের ১২৭ তম স্থান থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতে, বাংলাদেশ পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের পরেই অবস্থান করছে, যেখানে নেপাল এবং ভারত আমাদের উপরে রয়েছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং দেশের বিচার ব্যবস্থার বিষয়ে বেড়ে চলা জনগণের উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

জুলাই চার্টার নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে

সর্বশেষ আপডেট ০৪:৪৭:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

জুলাই চার্টার নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু জনগণের মধ্যে এখনও ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে- গণভোটটি ঠিক কোন বিষয়ে, কীভাবে হবে এবং এ সংক্রান্ত নাগরিক অধিকার সম্পর্কে মানুষ পর্যাপ্তভাবে জানে কি না। সে প্রশ্নও থেকে যায়। একইসঙ্গে, প্রশাসনিক কাঠামো কোনো রাজনৈতিক দলকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে কি না, তা নিয়েও জনমনে উদ্বেগ আছে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন” শীর্ষক একটি নীতি সংলাপে বিশিষ্টজনেরা এ মন্তব্য করেন। আজ রবিবার ( ১৮ জানুয়ারি ) সকালে রাজধানীর সিরডাপ (সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, জাপা মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, সিপিবি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বিএনপি এর সাবেক মন্ত্রী নিলুফার চৌধুরী মনি ব্রিটিশ স্কুল অব ল’ এর ভাইস প্রিন্সিপাল ব্যারিস্টার নুসরাত খান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বজলুর রশীদ ফিরোজ, খেলাফত মজলিস-এর যুগ্ম মহাসচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সাবেক জজ ইকতেদার আহমেদ, ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর সাবেক অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শওকত আলী হাওলাদার, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান, ব্যারিস্টার সারওয়ার হোসেন, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী, সিজিএস’র নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী প্রমুখ।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, সংস্কার কি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে বলেন যে কোনো সংস্কারই হয়নি, কিন্তু এতো অল্প সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এতগুলো সংস্কার কখনো হয়নি। আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে। যেখানে আগে মোটামুটি রাখার অবস্থাও ছিল না, এখন সেখানে তা সম্ভব হয়েছে। সংস্কারে ১০টি কথার পরামর্শের মধ্যে ৬টি রাখা হয়েছে, তাই আপনাদের বলার সুযোগ নেই যে আপনারা কোনো পরামর্শ রাখেননি।

তিনি উল্লেখ করেন, কিছু মানুষ নেতিবাচকতা ছড়িয়ে দেয় যা এক ধরনের উদ্দীপক হতে পারে, তবে এগুলো মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তিনি বলেন, ১৯৫৪-৫৫ সালের যে প্রত্যাশা ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠন করা, তা আমরা করেছি। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ যে নিয়োগ হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো। তিনি আরও বলেন, সরকারের সব ক্ষমতা উচ্চ আদালতকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে জবাবদিহিতা ছাড়া স্বাধীনতা সফল হয় না। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের কোড অব কন্ডাক্টকে কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। মেজরিটি প্রোভিশন মানুষকে সফলতা দেবে। আইনগত সহায়তা এখন ৫ গুণ বেড়েছে। তিনি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য যা কিছু প্রয়োজন ছিল, আমরা তা করেছি। তিনি বলেন, যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়, তবে আপনি এর সফলতা পাবেন।

পরিশেষে তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আইনের শাসনের পথে আমরা অনেকটাই এগিয়ে গেছি। তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার যদি পরবর্তীতে আন্তরিকতা না দেখায়, তবে আমরা এর সফলতা অর্জন করতে পারব না।

একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহিতা এবং আইন প্রয়োগে সমতা বিধানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন কীভাবে সুনিশ্চিত করা সম্ভব, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।

জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সংস্কার নিয়ে যে মাত্রায় আলোচনা শুরু হয়েছে, তা আগে এত ব্যাপকভাবে দেখা যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, যে দেশে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে, সে দেশে রাষ্ট্র পরিচালনার নানা ক্ষেত্রও সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যায়। একইভাবে, আইনের শাসন নিশ্চিত থাকলেই বোঝা যায় দেশে গণতন্ত্র বিদ্যমান। আর গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্যও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

তিনি বলেন, আমরা অনেক কথা বলি, কাজও করি, কিন্তু বাস্তবে করার চেয়ে বলার পরিমাণই বেশি থাকে। সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে রিফর্ম কমিশন গঠন করলেও কমিশন প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনও হয়নি।

 

জিল্লুর রহমান বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ যে জায়গায় ন্যায়বিচার ও আস্থা খুঁজে পাবে বলে আশা করে, বাস্তবে সেই প্রত্যাশা অনেক সময় পূরণ হচ্ছে না।

 

তিনি জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারপতি নিয়োগ, এবং মামলার জট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।

 

তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচার বিভাগের জবাবদিহিতাও প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে আইন পরিবর্তন করেছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে।

 

রিফর্ম কমিশনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় ৪৩ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই মামলাজট কমাতে বিচার বিভাগকে আরও পরিকল্পিত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে।

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ৪৭ লাখ মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, হাই কোর্টের যে মামলার রিপোর্টগুলো রয়েছে, সেগুলো নিষ্পত্তি করতে ২৫ থেকে ৩০ বছর সময় লাগবে।

তিনি বলেন, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা ছাড়া, দক্ষ বিচারক ও গতিশীল বিচারক না থাকলে এই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, হাই কোর্ট বিভাগে বর্তমানে যে বেঞ্চগুলো রয়েছে, সেগুলোর মতো নতুন বেঞ্চ গঠন না করলে মামলার নিষ্পত্তি কমানো সম্ভব নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেমন বৃদ্ধি করতে হবে, তেমনি বিচার বিভাগে যোগ্য ব্যক্তির সংখ্যা বাড়াতে হবে।

তিনি জানান, যতদিন না বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততদিন বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠাও সম্ভব হবে না। তিনি মব নিয়ে সন্দিহান এবং তাদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব রয়েছে কি না, তা জানেন না। মবের মাধ্যমে বিপ্লবী নেতা বা বিপ্লবী মতাদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। ডিজিটাল ফর্মে বিচার কাজ পরিচালিত হলে, বিপুল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে।

 

ড. বোরহান উদ্দিন খান বলেন, বিচার বিভাগ এবং আইনের শাসন অতীতে আরও শক্তিশালী ছিল; তবে সময়ের সাথে সাথে, আইনের চর্চা অবনতির দিকে এগিয়েছে, যদিও আইনের প্রয়োগের বিষয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। অনেক রাজনৈতিক দল আইনের শাসন রক্ষা এবং শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু খুব কমই এই প্রতিশ্রুতিগুলি পূর্ণ হয়েছে। বিচার ব্যবস্থায় জনগণের বিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এটি পুনরুদ্ধার করতে হবে। এজন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বিচারিক নেতৃত্বের প্রয়োজন, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রচারে এবং আইন সঠিকভাবে ও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, সরকার আছে, তবে মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হচ্ছে না। তিনি বলেন, বিচারকের নিয়োগ প্রক্রিয়া আগের মতোই চলছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মামলার ক্ষেত্রে যে বিচারপতিরা ছিলেন, তাদের কারো না কারো পক্ষ থেকে ছোটাছুটি ছিল। তিনি মন্তব্য করেন, যদি সরকারের বিরুদ্ধে ভয় কাজ না করে, তবে আমাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে রয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না এবং তাদের স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, যখন রাজনৈতিক দলগুলো সরকারে থাকে, তখন সেই দল বিচার বিভাগের কাজে প্রভাব ফেলেছে, যা আমাদের হতাশ করে।

তিনি বলেন, বিচারকদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে, এবং বিচার বিভাগের সুষ্ঠু কাজের জন্য আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে।

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে বিচার বিভাগে।

তিনি বলেন, বিচারকের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মানদণ্ডের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকারের যদি সদিচ্ছা রাখে, তবে একদিনেই সরকারের ক্ষমতা-বিভাগ (separation of power) সম্ভব। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সরকার এই সদিচ্ছা প্রকাশ করেনি।

তিনি মন্তব্য করেন, ক্ষমার সংস্কৃতির বন্ধ করা প্রয়োজন। মব সৃষ্টি হয়েছে ৯ আগস্ট সচিবালয় থেকে এবং মবের হাত থেকে আপনি নিজেও রক্ষা পাবেন না।

তিনি বলেন, সরকার মবকে উৎসাহিত করছে তাদের ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য।

তিনি বলেন, গণভোটটি অগ্রহণযোগ্য। গণভোট সম্পর্কে আপনি প্রচার করতে পারেন, কিন্তু “হ্যাঁ” বা “না” প্রচার করতে পারবেন না। এখানে সরকারের নিরপেক্ষতা হারিয়ে গেছে।

অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, বিচারকদের আচরণ আগে যেমন ছিল, এখনো তারা সেই ধারা থেকে বের হতে পারেনি।

তিনি উল্লেখ করেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য আমরা দিনের পর দিন ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করে আসছি, কিন্তু এখনো কোনো পরিবর্তন আসে নাই।

তিনি বলেন, এখন বিচারক নিয়োগের জন্য জুডিশিয়াল সাভিস কমিশনের এ ভালো ভালো ছেলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আসছে, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এখন থেকেই তাদের উপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সব রাজনৈতিক দলই ইস্তেহার দিলেও, কেউই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে না। তিনি বলেন, বিচারপতিরা নিজেদের স্বাধীনতার ব্যাপারে সচেতন না হলে, অনেক সময় তাদের সহনশীলতা এবং শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে।
তিনি মনে করেন, যদি আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ থাকেন, তবে যে কোনো সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে।

অ্যাডভোকেট শওকত আলী হাওলাদার বলেন, দেশে অনেক আইন থাকলেও সেগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, তা দেখা জরুরি।

তিনি উল্লেখ করেন, আইন যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে আইন প্রণয়ন করে লাভ কী—এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে অনেক মামলা হলেও বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলতে থাকে, কিন্তু সময়মতো সমাধান আসে না। এ অবস্থার পরিবর্তনে কীভাবে আইন বাস্তবায়ন কার্যকর করা যায় এবং বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও ফলপ্রসূ করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের আরও সিরিয়াস হতে হবে এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, আমরা বাংলাদেশের জন্ম থেকেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি, কিন্তু যে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় ছিল, তারা এই বিশেষ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক মামলাগুলি এখনও রয়েছে, এবং কিছু মামলার নিষ্পত্তি করতে ৩০ দিন লাগে, আবার কিছু মামলার সমাধান করতে ৩০ বছরও লাগে।

তিনি বলেন, এই বিষয়গুলোকে আমাদের খুবই সিরিয়াসভাবে দেখতে হবে। স্বচ্ছতার মাধ্যমে বিচার নিয়োগ কমিশন তৈরি করতে হবে, এবং রাজনৈতিক মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মানুষকে মামলার বিষয়ে সচেতন করতে হবে এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার টার্মিনোলজিতে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, আমরা শুধু প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের কথা বলছি, কিন্তু স্বাধীনতার পরেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, সংবিধানের শুরুতেই আমরা এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারিনি। আমাদের মানসিকতা হচ্ছে, বিচার বিভাগের যে উদ্দেশ্য ছিল, তার শুরু থেকেই সেটি আমাদের কাছে অবাস্তব ছিল।

তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে, তার প্রতি আমরা যথাযথ মনোযোগ দিচ্ছি না।

ব্যারিস্টার নুসরাত খান বলেন, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা বা নতুন করে স্বাধীনভাবে কাজ করার বিষয়টি কার্যকরভাবে চালু করতে হলে, সেখানে যাঁরা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছেন, তাঁদের ক্ষমতা-বিভাগের পরিপূর্ণতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যে রাজনৈতিক দল সরকারে থাকে, তাদের বিচার বিভাগে যথেষ্ট প্রভাব থাকে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নতুন করে করতে হবে, এবং ক্ষমতা-বিভাগ নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা কাগজে কলমে অনেক কিছু লিখতে পারি, কিন্তু বাস্তবে সেগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয় না।

শামীম হায়দার পাটওয়ারী বলেন, যদি দীর্ঘ সময় ধরে অন্যায় চলতে থাকে, তবে তা আরও বড় আকারে ফিরে আসে এবং গণ বিচারকে উৎসাহিত করে। যদিও বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন হওয়া উচিত, কিন্তু এটি বাস্তবে প্রায়ই স্বাধীনতার অভাব থাকে। বিচার বিভাগের অত্যাচার অন্যায়ের একটি অন্যতম বিপজ্জনক রূপ, যা প্রতিরোধ করতে হবে জবাবদিহিতা এবং সংস্কারের মাধ্যমে। বিচার বিভাগের প্রতিষ্ঠানের উন্নতি প্রয়োজন, কিন্তু যথাযথ বাজেট বরাদ্দ এখনও হয়নি। বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন, কারণ ভারতসহ অনেক দেশ বাংলাদেশের তুলনায় বিচার ব্যবস্থায় এগিয়ে। যখন মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর সময় লাগে, তখন ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়, প্রায়ই প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের জন্য তা অস্বীকারিত হয়।

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন আলোচনা করার সময়, এটি চিহ্নিত করা জরুরি যে, আইনের শাসন শুধু আইন থাকার মাধ্যমে নয়, বরং সেগুলি কিভাবে সঠিকভাবে এবং ন্যায়পরায়ণভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর নির্ভর করে। বাস্তবে, আইন প্রণয়ন একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক স্তরের মাধ্যমে ঘটে, যেখানে নীতিগত সিদ্ধান্তগুলি প্রায়শই প্রক্রিয়া বিলম্ব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়ে। যদিও এটি সব সময়ে প্রতিটি আইন সমানভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে, তবে রাষ্ট্রকে ন্যূনতম শর্তে নাগরিকদের জন্য সময়মতো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এসব ন্যূনতম ন্যায়বিচারের গ্যারান্টি অপরিহার্য; এটি জনগণের কল্যাণ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক শাসনের বৈধতার জন্য মৌলিক প্রয়োজন।

 

ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল বলেন, প্রায়ই, ক্ষমতাসীনরা অপরাধ এবং দুর্নীতির জন্য জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পেয়ে যান। তাই একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামো থাকা প্রয়োজন যাতে নাগরিকরা সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন, কোনও ভয় বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। বিচারিক নিয়োগ অবশ্যই মেধাভিত্তিক এবং স্বচ্ছ হওয়া উচিত যাতে বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয়। বিচারিক সচিবালয় (সচিবালয়) রাজনৈতিক প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকতে হবে, একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দ্বারা সমর্থিত যাতে এর সততা এবং কর্মক্ষমতা বজায় থাকে। বিচার পরিষদও পক্ষপাতিত্ব এবং প্রিয়জনের সম্পর্ক থেকে মুক্ত থাকতে হবে, যাতে নিয়োগগুলি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সংযোগ দ্বারা চালিত না হয়। অবশেষে, ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এবং কার্যকর হতে হবে, কারণ বিলম্বিত ন্যায়বিচার জনগণের বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং নাগরিকদের অধিকার অস্বীকারিত হয়।

 

প্রাক্তন বিচারপতি ইকতেদার আহমেদ বলেন, আইনগত ক্ষেত্রের মধ্যে কর্মী নিয়োগ প্রায়ই রাজনৈতিক বিবেচনার দ্বারা প্রভাবিত হয়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সততা ক্ষুণ্ণ করে। এই প্রক্রিয়া সিস্টেমের মধ্যে বিদ্যমান কাঠামোগত সমস্যাগুলিকে আরও বাড়িয়ে তোলে, যার ফলে অকার্যকরতা এবং জবাবদিহিতার অভাব দেখা দেয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি হলো বিচারকের অপ্রতুল সংখ্যা, যা মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত করে এবং বিচার প্রক্রিয়ার সামগ্রিক কার্যকারিতাকে চাপ দেয়। এই কাঠামোগত ঘাটতিগুলি সমাধান করা ন্যায়বিচারের অ্যাক্সেস উন্নত করতে এবং একটি ন্যায়সঙ্গত আইনি সিস্টেম নিশ্চিত করতে অপরিহার্য।

 

ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, বছরের পর বছর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তবে বাস্তবিক সমাধানগুলি প্রায়ই অগ্রাধিকার পায়নি। আলোচনা প্রায়ই উচ্চ আদালতের ওপর কেন্দ্রীভূত থাকে, অথচ বৃহত্তর বিচার ব্যবস্থা কম মনোযোগ পায়। বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ২০০ আইন রয়েছে, তবে বড় উদ্বেগ হলো এগুলি কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে যেটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো সত্যিকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী পেশাদার মূল্যবোধ। কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, এই দেশটি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, না কি আইনগুলো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে, যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা নীতিগত রিপোর্টিং এবং দুর্বল জবাবদিহিতায় পরিণত হয়।

 

ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রায়ই, ন্যায়বিচার পক্ষপাতিত্ব দ্বারা বিঘ্নিত হয়, এবং মৌলিক স্বাধীনতা যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা যথাযথভাবে রক্ষা করা হয় না। আজকের সবচেয়ে জরুরি সমস্যা হলো ব্যাপক দুর্নীতি, যা উচ্চ স্তর থেকে নিচু আদালত পর্যন্ত বিদ্যমান, যা বিচার বিভাগের সততাকে আরও দুর্বল করে দেয়। বিলম্বিত ন্যায়বিচার ন্যায়বিচার অস্বীকারিত করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এবং এই বাস্তবতা একটি সিস্টেম তৈরি করতে থাকে যেখানে নাগরিকদের অধিকার দুর্বল হয় এবং জবাবদিহিতা অনুপস্থিত থাকে।

 

ব্যারিস্টার সারওয়ার হোসেন বলেন, যদি বিচার বিভাগের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব অব্যাহত থাকে, তবে সত্যিকার বিচারিক স্বাধীনতা কখনও বাস্তবায়িত হতে পারে না। বিচার ব্যবস্থার সততা নিশ্চিত করতে হলে, এটি বাহ্যিক চাপ এবং প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে, যাতে ন্যায়বিচারের ব্যবস্থাপনায় নিরপেক্ষতা এবং সঠিকতা নিশ্চিত হয়।

 

পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, একটি প্রবাদ আছে, “ক্ষমতা হচ্ছে সঠিকতা।” তবে সমাজগুলি সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে, এটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে শুধু ক্ষমতা দিয়ে শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার বা বৈধতা স্থাপন করা যায় না। এটি একটি সামাজিক চুক্তির ধারণা তৈরি করেছিল, যেখানে কর্তৃপক্ষকে আইন, জবাবদিহিতা এবং নাগরিকদের অধিকার দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়। ইতিহাস জুড়ে, নেতৃবৃন্দ এবং সংস্কারকরা আইনি কাঠামো প্রবর্তন করেছেন যা সমাজগুলোকে পরিচালনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাধা প্রদান করতে সহায়ক। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। বিশ্ব ন্যায়বিচার প্রকল্পের আইন শাসন সূচক ২০২৫ অনুযায়ী, ১৪৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে ১২৫ তম স্থানে রয়েছে, যা পূর্বের ১২৭ তম স্থান থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতে, বাংলাদেশ পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের পরেই অবস্থান করছে, যেখানে নেপাল এবং ভারত আমাদের উপরে রয়েছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং দেশের বিচার ব্যবস্থার বিষয়ে বেড়ে চলা জনগণের উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে।