জাতীয় সরকার প্রস্তাব
জুলাই অভ্যুত্থান বিতর্কে ছাত্র আন্দোলনের জবাব
- সর্বশেষ আপডেট ০৯:০৪:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫
- / 269
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জাতীয় সরকারের কোনো প্রস্তাব ছাত্রদের পক্ষ থেকে তাদের কাছে দেওয়া হয়নি, বরং অন্য কোনো মাধ্যমে তারা প্রস্তাব পেয়েছেন। এই বক্তব্য সত্য নয়।
৫ আগস্ট রাতের প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল; তারা একটি অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করছে। সেই ব্রিফিংয়ের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাবিত সরকার এবং নতুন সংবিধান বিষয়ে আলোচনা হয়, তবে তারেক রহমান এতে সম্মতি দেননি। তিনি বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে নাগরিক সমাজের সদস্যদের দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের পরামর্শ দেন। ওই আলোচনায় ছাত্রদের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়।
এরপর ৭ আগস্ট ভোরে মির্জা ফখরুলের বাসভবনে জাতীয় সরকার প্রস্তাব ছাত্র নেতাদের সঙ্গে একটি সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপদেষ্টা পরিষদের কাঠামো এবং সম্ভাব্য সদস্যদের নাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পরবর্তী এক ভার্চুয়াল বৈঠকে তারেক রহমান উপদেষ্টা পরিষদের খসড়া তালিকা পর্যালোচনা করেন।
শিবির নিয়ে সাদিক কায়েমের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর
সাবেক শিবির নেতা সাদিক কায়েম সম্প্রতি একটি টকশোতে দাবি করেছেন, ছাত্রশক্তির গঠনে শিবির জড়িত ছিল এবং সংগঠনটি শিবিরের নির্দেশনায় কাজ করত। এই দাবি মিথ্যাচার।
ছাত্রশক্তি গঠিত হয় মূলত ‘গুরুবার আড্ডা’ পাঠচক্র, ঢাবির ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করা একাংশ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্টাডি সার্কেলের যৌথ উদ্যোগে। দীর্ঘদিন ধরে একটি নতুন ছাত্র সংগঠন গঠনের লক্ষ্যে গুরুবার আড্ডায় আলোচনা চলছিল।
ছাত্রশক্তির নেতৃত্বদানকারী অনেকেই দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে রাজনীতি করায়, তারা বিভিন্ন সংগঠন ও নেতৃত্বের সঙ্গে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে যোগাযোগ রাখতেন। এর অংশ হিসেবে শিবিরের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। তবে যোগাযোগ বা সম্পর্ক থাকার মানে এই নয় যে শিবির এই সংগঠনের নীতিনির্ধারণ বা গঠন প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল।
সাদিক কায়েম কখনো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন না। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তিনি এই পরিচয় ব্যবহার করতে থাকেন। অভ্যুত্থানে শিবিরের কিছু ভূমিকা থাকলেও সেটিকে কেন্দ্র করে সাদিক কায়েম ও তার ঘনিষ্ঠরা প্রচার করে যে পুরো আন্দোলন শিবিরের নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে। বাস্তবে এটি ছিল বহু পক্ষীয় ছাত্র নেতৃত্বের সম্মিলিত উদ্যোগ। প্রতিটি সিদ্ধান্ত বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া হতো।
২ আগস্টের সামরিক চাপ: গণঅভ্যুত্থানকে ভিন্ন পথে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ
২০২৪ সালের ২ আগস্ট রাতে জুলকারনাইন সায়েরের নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠী ছাত্র সমন্বয়কদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে একটি সামরিক অভ্যুত্থান বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একদফা সরকার পতনের ঘোষণা ছাত্রদের মুখে দিয়ে সেনাবাহিনীর এক অংশকে ক্ষমতায় বসানো।
তথাকথিত সেইফ হাউসে থাকা ছাত্রদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। বলা হয়, তারা যেন ফেসবুকে ঘোষণা দেয় এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন করে। অথচ সেই সময় থেকেই ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান ছিল পরিষ্কার; সেনাবাহিনী কিংবা কোনো সেনা-সমর্থিত গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া যাবে না। সেটি আরেকটি ‘এক-এগারো’ ঘটিয়ে আবারও আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনতে পারে এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্যও ক্ষতিকর হবে।
৫ আগস্ট থেকে এই অবস্থান স্পষ্ট করে জানানো হয়; এই অভ্যুত্থানকে সফল করতে হবে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্মিলিতভাবে।
সায়ের গোষ্ঠীর পাল্টা নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা অব্যাহত
৫ আগস্টের পর সায়ের গোষ্ঠী বারবার চেষ্টা করেছে বিকল্প ছাত্র নেতৃত্ব দাঁড় করাতে। এতে তারা সাদিক কায়েমদের ব্যবহার করেছে, এবং তারা ব্যবহৃতও হয়েছে।
এ গোষ্ঠী ফোনালাপ ফাঁস, নজরদারি, চরিত্রহনন, অপপ্রচার এবং প্রোপাগান্ডা সব উপায়ে আন্দোলনের নেতৃত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো ক্ষমতাসীন মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও এত আক্রমণাত্মক ও ভিত্তিহীন প্রচারণা হয়নি।
তবে স্মরণ রাখতে হবে, মিথ্যার ভিত্তি যত জোরালোই হোক, সেটি স্থায়ী হতে পারে না। এ গোষ্ঠীও টিকবে না। জনগণের গণআন্দোলনকে বিকৃত করে ক্ষমতা কাঠামোয় প্রবেশের এই অপচেষ্টা ব্যর্থ হবে।































