চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যকর হলো ৪১ শতাংশ বর্ধিত মাশুল
- সর্বশেষ আপডেট ১২:২০:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫
- / 144
ব্যবসায়ীদের আপত্তি সত্ত্বেও এক মাসের স্থগিতাদেশের পর মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে ৪১ শতাংশ বর্ধিত মাশুল কার্যকর করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারা একে ‘বন্দর বন্ধের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, বন্দরের নতুন দায়িত্ব পাওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আলোচনা ছাড়া ট্যারিফ কার্যকর হওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে গিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, জেটি, শেড ও টার্মিনাল নির্মাণের ব্যয় পূরণে ৩৯ বছর পর ট্যারিফ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বন্দরের অর্থ ও হিসাব বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আবদুস শাকুর স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়েছে, ১৫ অক্টোবর থেকে নতুন হারে ট্যারিফ কার্যকর হবে। বন্দরের তালিকাভুক্ত শিপিং এজেন্টদের তপশিলি ব্যাংকে নতুন হারে অর্থ জমা দিয়ে জাহাজ ছাড়পত্র (এনওসি) নিতে হবে।
বর্তমানে বন্দরের ৫২টি সেবা খাতের মধ্যে ২৩টিতে সরাসরি নতুন ট্যারিফ প্রযোজ্য হয়েছে। গড়ে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিশেষ করে কনটেইনার হ্যান্ডলিং খাতে সবচেয়ে বেশি মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি ২০ ফুট কনটেইনারের ট্যারিফ ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি। আমদানি কনটেইনারে ৫ হাজার ৭২০ টাকা এবং রপ্তানিকৃত কনটেইনারে ৩ হাজার ৪৫ টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে। মাশুল, ভাড়া ও ফি ডলারের বিনিময়মূল্যে নির্ধারিত হওয়ায় ডলারের দর বাড়লে ট্যারিফও বৃদ্ধি পাবে। কিছু সেবা খাতে মাশুল দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, একটি ২০ ফুট কনটেইনারে আমদানি ও রপ্তানিতে খরচ ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা বাড়বে, যা বহনযোগ্য নয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি হলেও ব্যবসায়ীদের চাপে তা এক মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক জানান, বন্দরের আয় বাড়লেও অপারেশনাল ব্যয় ও আধুনিকায়নের জন্য ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরের মোট আয় ৫ হাজার ২২৭ কোটি টাকা, নিট আয় ২ হাজার ৯১২ কোটি টাকা ছিল। তার ভাষ্য, ‘আগে প্রতি কেজি আমদানিকৃত পণ্যের বিপরীতে বন্দর আদায় করত ৩২ পয়সা, এখন তা বেড়ে ৪৪ পয়সা হয়েছে, অর্থাৎ প্রতি কেজিতে মাত্র ১২ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, এ পরিবর্তনের প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে তেমন পড়বে না।
তবে ব্যবসায়ীদের আপত্তি এখনও অব্যাহত। চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১৯৮৬ সালে সর্বশেষ ট্যারিফ নির্ধারণের সময় ডলারের বিনিময় হার ৩০.৬১ টাকা, যা বর্তমানে ১২২ টাকা। ‘ট্যারিফ না বাড়িয়েও বন্দরের আয় চারগুণ বেড়েছে। তাই ট্যারিফ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নেই।’ তিনি আরও বলেন, এতে আমদানি-রপ্তানির খরচ বেড়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রভাব পড়বে।
বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করলেও অতিরিক্ত মাশুল আরোপের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। এ ধরনের সিদ্ধান্তে রপ্তানি খরচ বাড়বে এবং প্রতিযোগিতায় প্রভাব পড়বে বলে মত প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক আমিরুল হক জানান, মোংলা ও পায়রায় মাশুল বাড়ানো হয়নি, শুধু চট্টগ্রামে বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনো খাতে ছয়গুণ পর্যন্ত মাশুল বাড়ানো হয়েছে, যা ভোক্তা ও রপ্তানিকারককে বহন করতে হবে।’
বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, ‘২৯ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে বন্দরকে কখনো লোকসানে দেখিনি। তাহলে ৪১ শতাংশ ট্যারিফ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা কোথায়?’ এশিয়ান-ডাফ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, ‘মাশুল বৃদ্ধির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তা ও রপ্তানিকারকরা হবেন।’ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন জানান, একটি ২০ ফুট কনটেইনার রপ্তানি করতে ১০০ ডলারের বেশি অতিরিক্ত খরচ পড়ছে।
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মাশুল কার্যকর হলে ভিয়েতনামের তুলনায় খরচ তিনগুণ বেড়ে যাবে। এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’ বেপজিয়ার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘প্রতিযোগী দেশগুলো ব্যবসার খরচ কমাচ্ছে, আমরা বাড়াচ্ছি—এটা হতাশাজনক।’ বারভিডার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কাউকে সুবিধা দিতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করা ঠিক নয়।’
































