ঢাকা ০৯:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গৃহকর্মী নির্যাতন: স্ত্রীসহ বিমানের এমডি গ্রেপ্তার

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪৭:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 13

বিমানের এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

 

শিশু গৃহকর্মীকে বীভৎসভাবে নির্যাতনের অভিযোগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি এবং আরও দুই গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

রবিবার গভীর রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার গ্রেপ্তারকৃতদের ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে হাজির করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রোমের মিয়া তাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আদালতে জামিন বিষয়ে শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই তাহমিনা আক্তার।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিক আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীকে বীভৎসভাবে নির্যাতনের অভিযোগে একটি মামলা হয়েছে। ওই মামলায় সোমবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি এবং তাদের বাসায় কর্মরত আরও দুই গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

জানা যায়, উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় বিমান বাংলাদেশের এমডি সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বীথির বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত মোহনা নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশু। শিশুটিকে দীর্ঘদিন ধরে অমানবিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগে উত্তরা পশ্চিম থানায় লিখিত এজাহার দাখিল করেন ভুক্তভোগীর বাবা মোস্তফা।

সোমবার তাদেরকে আদালতে তোলা হয়। ছবি: বাংলা অ্যাফেয়ার্স
সোমবার তাদেরকে আদালতে তোলা হয়। ছবি: বাংলা অ্যাফেয়ার্স

 

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রায় সাত থেকে আট মাস আগে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের একটি ভবনের সিকিউরিটি গার্ডের মাধ্যমে বিথির কাছে শিশু মোহনাকে গৃহকর্মী হিসেবে দেন তার বাবা। প্রথম কয়েক মাস মেয়েকে সুস্থ ও স্বাভাবিক দেখলেও পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত হয়ে যায়।

ভুক্তভোগীর বাবা মোস্তফা জানান, গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) গৃহকর্ত্রী বিথি তাকে ফোন করে দ্রুত মেয়েকে নিয়ে যেতে বলেন। ফোন পেয়ে তিনি উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর বিথি তার সঙ্গে কোনো কথা না বলে একটি সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেন। পরে রাতের বেলায় মেয়েকে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মেয়ের শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। শিশুটির হাতে কাটা ও সেলাইয়ের দাগ, সারা শরীরে পোড়া চিহ্ন এবং মুখে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানান তিনি।

গুরুতর আহত অবস্থায় শিশু মোহনাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে সে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে বলে জানিয়েছেন তার বাবা। তিনি বলেন, “মেয়ের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। সে স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারছে না। দুধ আর রুটি ভিজিয়ে অল্প অল্প করে খাওয়াতে হচ্ছে।”

এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি শিশু আইন, ২০১৩ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ভুক্তভোগী শিশুর বাবা মোস্তফা বলেন, “আমি একজন অসহায় বাবা। আমার মেয়ের সঙ্গে যে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। আর যেন কোনো শিশুর সঙ্গে এমন ঘটনা না ঘটে।”

উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ গণমাধ্যমকে জানান, শিশুটির বাবা মোস্তফার লিখিত এজাহারের ভিত্তিতে বিথি ও তার স্বামী শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড করা হয়। পরে রাত আনুমানিক ৩টার দিকে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালতে পাঠানো হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রুবেল মিয়া জানান, গ্রেপ্তারকৃত শফিকুর রহমান বিমান বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক—বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এদিকে ভুক্তভোগী শিশুর চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান থানার ওসি।

শিশু মোহনার নির্যাতনকারীদের গ্রেপ্তারের খবরে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

গৃহকর্মী নির্যাতন: স্ত্রীসহ বিমানের এমডি গ্রেপ্তার

সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪৭:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 

শিশু গৃহকর্মীকে বীভৎসভাবে নির্যাতনের অভিযোগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি এবং আরও দুই গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

রবিবার গভীর রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার গ্রেপ্তারকৃতদের ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে হাজির করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রোমের মিয়া তাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আদালতে জামিন বিষয়ে শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই তাহমিনা আক্তার।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিক আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীকে বীভৎসভাবে নির্যাতনের অভিযোগে একটি মামলা হয়েছে। ওই মামলায় সোমবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি এবং তাদের বাসায় কর্মরত আরও দুই গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

জানা যায়, উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় বিমান বাংলাদেশের এমডি সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বীথির বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত মোহনা নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশু। শিশুটিকে দীর্ঘদিন ধরে অমানবিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগে উত্তরা পশ্চিম থানায় লিখিত এজাহার দাখিল করেন ভুক্তভোগীর বাবা মোস্তফা।

সোমবার তাদেরকে আদালতে তোলা হয়। ছবি: বাংলা অ্যাফেয়ার্স
সোমবার তাদেরকে আদালতে তোলা হয়। ছবি: বাংলা অ্যাফেয়ার্স

 

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রায় সাত থেকে আট মাস আগে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের একটি ভবনের সিকিউরিটি গার্ডের মাধ্যমে বিথির কাছে শিশু মোহনাকে গৃহকর্মী হিসেবে দেন তার বাবা। প্রথম কয়েক মাস মেয়েকে সুস্থ ও স্বাভাবিক দেখলেও পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত হয়ে যায়।

ভুক্তভোগীর বাবা মোস্তফা জানান, গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) গৃহকর্ত্রী বিথি তাকে ফোন করে দ্রুত মেয়েকে নিয়ে যেতে বলেন। ফোন পেয়ে তিনি উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর বিথি তার সঙ্গে কোনো কথা না বলে একটি সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেন। পরে রাতের বেলায় মেয়েকে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মেয়ের শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। শিশুটির হাতে কাটা ও সেলাইয়ের দাগ, সারা শরীরে পোড়া চিহ্ন এবং মুখে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানান তিনি।

গুরুতর আহত অবস্থায় শিশু মোহনাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে সে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে বলে জানিয়েছেন তার বাবা। তিনি বলেন, “মেয়ের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। সে স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারছে না। দুধ আর রুটি ভিজিয়ে অল্প অল্প করে খাওয়াতে হচ্ছে।”

এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি শিশু আইন, ২০১৩ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ভুক্তভোগী শিশুর বাবা মোস্তফা বলেন, “আমি একজন অসহায় বাবা। আমার মেয়ের সঙ্গে যে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। আর যেন কোনো শিশুর সঙ্গে এমন ঘটনা না ঘটে।”

উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ গণমাধ্যমকে জানান, শিশুটির বাবা মোস্তফার লিখিত এজাহারের ভিত্তিতে বিথি ও তার স্বামী শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড করা হয়। পরে রাত আনুমানিক ৩টার দিকে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালতে পাঠানো হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রুবেল মিয়া জানান, গ্রেপ্তারকৃত শফিকুর রহমান বিমান বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক—বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এদিকে ভুক্তভোগী শিশুর চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান থানার ওসি।

শিশু মোহনার নির্যাতনকারীদের গ্রেপ্তারের খবরে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।