ঢাকা ১২:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গণমাধ্যম সংস্কারে কমিশন গঠনের প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:০৭:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 11

সিজিএস আয়োজিত সংলাপে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ।

দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অপর্যাপ্ত, আর নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণও তুলনামূলকভাবে কম—এসব ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা।

সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত “বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কারঃ স্বাধীনতা, দায়িত্ব ও ক্ষমতার সমন্বয়” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব দাবি উঠে আসে।

শুক্রবার বিকাল ৩টায় সিরডাপ (সেন্টার অফ ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন সিজিএস প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ; সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির; বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক এ.কে.এম. মনজুরুল ইসলাম; ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ; প্রথম আলোর ইংরেজি ওয়েব বিভাগের প্রধান আয়েশা কবির, বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. সাজেদুল হক রুবেল; বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ; জি-৯-এর সাধারণ সম্পাদক ডাঃ সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস. এম. শামীম রেজা ও রুবায়েত ফেরদৌস; জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খান; সিনিয়র সাংবাদিক পারভীন এফ চৌধুরী, দ্য ডেইলি স্টার’র সাংবাদিক সামসুদ্দোজা সাজেন; সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান।

নুরুল কবির বলেছেন, সাধারণত ‘মব’ বলতে বিশৃঙ্খল জনশক্তি হিসেবে পরিচিত, কিন্তু তিনি দেখেছেন এটি সুসংগঠিত এবং পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করেছে। তার মতে, এই সুশৃঙ্খল হামলার পৃষ্ঠপোষকতা সরকারের কাছ থেকে এসেছে। তিনি আরও বলেন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব তাকে এভিডেন্স ছাড়া মিথ্যা অভিযোগ করেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে ফেসবুকে প্রকাশিত স্ট্যাটাসই প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট যে, সরকার কোনোভাবে সহায়তা করেনি বলে দাবিটি ভিত্তিহীন। এছাড়াও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতা পড়ালে কেউ পক্ষপাতী হয়ে উঠত না বলেও মতামত দেন। তিনি বলেন, “শুধুমাত্র অর্থের অভাবে সাংবাদিকরা দুর্নীতিগ্রস্থ হয়, এটি সত্য নয়; অনেক ধনী সাংবাদিক ও সম্পাদকও দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকেন। প্রকৃত সাংবাদিক হলেন তারা যারা ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, আর যারা তা করেন না তারা হলো পাবলিক রিলেশন অফিসার।”

কামাল আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকার তাদের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে হঠাৎ করে তাড়াহুড়ায় নানা কাজ শুরু করেছে, গত কয়েকদিনে একের পর এক অধ্যাদেশ পাশ করা হচ্ছে, যা আগামী সংসদে আদৌ টিকবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে আগামী বৃহস্পতিবার একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে, সেখানে জোড়াতালি দিয়ে আবার কয়েকটি অধ্যাদেশ করা হতে পারে, যা বাস্তবে তেমন কোনো কার্যকারিতা বয়ে আনবে না।

তিনি আরও মন্তব্য করেন, ইতিমধ্যেই তথ্য সম্প্রচার কমিশন ও গণমাধ্যম কমিশন নামে দুটি নতুন অধ্যাদেশ তাড়াহুড়ায় চালু করা হয়েছে, যা এক ধরনের জগাখিচুড়ী উদ্যোগ হিসেবে মনে হচ্ছে। কামাল বলেন, গণমাধ্যম কমিশনের রিপোর্টের আগে কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়নি, যা সরকারের একটি সীমিত অর্জন বলা যায়, তবে গণমাধ্যমের মালিকদের উচিত তাদের আর্থিক লাভের প্রতিফলন কর্মীদের মধ্যেও দেখা যাওয়া। সরকারের এই শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়োকে তিনি স্পষ্টভাবে সমালোচনা করেছেন, যা দেখাচ্ছে যে তারা সুপারিশ ও পরিকল্পনা না মেনে মাত্র শেষ মুহূর্তে জোড়াতালি দিয়ে কাজ করছে।

অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস বলেন, ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মধ্যে রাখতে সংসদ ও গণমাধ্যমের কার্যকর জবাবদিহিতা জরুরি।

তিনি বলেন, সংসদ ও গণমাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত জবাবদিহিতার সংস্কৃতি না থাকায় সরকারকে নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

জিল্লুর রহমান বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ‘তিন শূন্য’-এর কথা বললেও বাস্তবে তিনি চারপাশে কেবল শূন্যতাই দেখতে পাচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে এবং সেখানে সরকারের কড়া সমালোচক এক প্রবীণ সম্পাদককে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, একই অনুষ্ঠানে একজন সরকারি প্রতিনিধি এসব ঘটনাকে ‘মব’ হিসেবে আখ্যা দিতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তাতে অভ্যুত্থানের অবমাননা হয় বলে দাবি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অধ্যাপক এস. এম. শামীম রেজা বলেন, আগামী সরকার গঠনের আগেই গণমাধ্যমকে আত্মসমালোচনা করতে হবে এবং বিগত বছরগুলোর ভুল সাংবাদিকতা স্বীকার করা জরুরি, তবেই ভবিষ্যতে স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করা সহজ হবে। তিনি বলেন, গণমাধ্যম আন্দোলনে জনগণের সম্পৃক্ততা কম থাকায় গণমাধ্যম ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো, সুরক্ষা আইন, প্রেস কাউন্সিলের কার্যকারিতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং দমনমূলক আইন নিয়েও মত দেন।

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সাংবাদিকদের নামে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে এবং সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক সংকটের যথাযথ সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে সরকারকে তোষামোদ করার একটি প্রবণতা রয়েছে, যা বিগত সরকারের সময় ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। সুষ্ঠু ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।

ডা. সাজেদুল হক রুবেল বলেছেন, দেশে কোন ধরনের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় রয়েছে তার ওপরই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নির্ভর করে। তিনি উল্লেখ করেছেন, পার্টিজান হলেও মানিক শাহের সাংবাদিকতায় তা প্রকাশ পেতো না। ডা. রুবেল আরও বলেন, দেশে বসে প্ররোচনামূলক বক্তব্যের দায় নিতে হয়, কিন্তু গত ১৮ মাসে বিদেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্ররোচনা ছড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

জাহিদ নেওয়াজ খান জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের শেষ বা ২০২৪ সালের শুরুতে একটি এজেন্সি তার সঙ্গে যোগাযোগ করে চা খাওয়ার জন্য ডাকে, তিনি প্রথমে যাননি, পরে বাধ্য হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা হয় এবং তার সম্পর্কে একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করার নির্দেশ আসে, যা মূলত একজন মন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি উল্লেখ করেন, ফটোকার্ড বিষয়টি সমস্যা তৈরি করেছে এবং এই নামে করা সাংবাদিকতা দীর্ঘমেয়াদে কতটা ফলপ্রসূ হবে জানা নেই। টেলিভিশন মিডিয়া বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভরশীল, তবে কিছু চ্যানেল সাবস্ক্রিপশন ছাড়া বিনামূল্যে বিতরণ হয়, যা তাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

এ. কে. এম. মনজুরুল ইসলাম ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলার ঘটনায় যেন উল্টো এক ধরনের “লাভই” হয়েছে, কারণ এসব ঘটনার পর সাংবাদিকদের মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে উঠতে দেখা গেছে এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নানামুখী তৎপরতা চোখে পড়েছে, যা অতীতে অন্যান্য গণমাধ্যমের ওপর হামলার সময় তেমনভাবে দেখা যায়নি। একই সঙ্গে তিনি প্রেস কাউন্সিলের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, প্রেস কাউন্সিল এখনো যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে যথাযথভাবে গঠিত হয়নি এবং ভবিষ্যতে এটি দক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে কার্যকর করা প্রয়োজন।

রিয়াজ আহমেদ বলেন, স্বল্প সময় ও সীমিত সম্পদের মধ্যেও গণমাধ্যম বিষয়ক সংস্কার কমিশন যে কাজটি সম্পন্ন করেছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আগামীতে যারা সরকারে আসবেন, তারা গণমাধ্যম সংস্কারে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবুও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আয়েশা কবির বলেন, গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম, যা প্রত্যাশিত নয়।

তিনি বলেন, একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে হলে গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি তিনি মন্তব্য করেন, নারীদের অংশগ্রহণ ও অধিকার নিয়ে এ ধরনের আলোচনা যদি নারী সাংবাদিকদের বদলে পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকেও উঠে আসে, তবে গণমাধ্যমে নারীদের জন্য কাজের পরিবেশ আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হবে।
ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত বলেছেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নিজেদের স্বাধীনতা ঠিক করতে হবে, কারণ ক্ষমতায় আসা যেকেউ তোষামোদ করতে চায়।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমে সীমিত স্বাধীনতা থাকলেও পেশাজীবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের সরাসরি সম্পৃক্ততায় বিধিনিষেধ থাকা উচিত। পাশাপাশি, এআই তৈরি ভিডিও ও সম্পাদিত ফটো অনেকেই যাচাই না করে শেয়ার করছেন, যা নির্বাচনের আগে আরও বাড়বে।

পারভিন এফ চৌধুরি বলেছেন, দেশে বর্তমানে সরকার জনগণ বা সাংবাদিকদের দাবি মেনে নেওয়ার অবস্থায় নেই। তিনি উল্লেখ করেন, সাংবাদিকদের বেতন দেওয়া হয় না এবং অনেক সংবাদমাধ্যম বেতনের আগে কর কেটে নেয়, ফলে ইতিমধ্যেই কম বেতনে কর্মরত সাংবাদিকদের চলতে কঠিন হয়ে পড়ে।

মুক্তাদীর রশিদ বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে এর দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এ জন্য তিনি একটি ‘মিডিয়া অ্যাকাউন্টেবিলিটি কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি সাংবাদিকদের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, দেশে বহু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকরা দুই থেকে তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতি নিরসন ছাড়া গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন খান বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। তবে মালিকানাগত কারণে অধিকাংশ গণমাধ্যম কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকায় সাংবাদিকতায় হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, দেশে সাহসী সাংবাদিকতার ঘাটতি রয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে জনমানসে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

গণমাধ্যম সংস্কারে কমিশন গঠনের প্রস্তাব

সর্বশেষ আপডেট ০৯:০৭:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অপর্যাপ্ত, আর নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণও তুলনামূলকভাবে কম—এসব ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা।

সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত “বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কারঃ স্বাধীনতা, দায়িত্ব ও ক্ষমতার সমন্বয়” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব দাবি উঠে আসে।

শুক্রবার বিকাল ৩টায় সিরডাপ (সেন্টার অফ ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন সিজিএস প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ; সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির; বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক এ.কে.এম. মনজুরুল ইসলাম; ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ; প্রথম আলোর ইংরেজি ওয়েব বিভাগের প্রধান আয়েশা কবির, বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. সাজেদুল হক রুবেল; বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ; জি-৯-এর সাধারণ সম্পাদক ডাঃ সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস. এম. শামীম রেজা ও রুবায়েত ফেরদৌস; জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খান; সিনিয়র সাংবাদিক পারভীন এফ চৌধুরী, দ্য ডেইলি স্টার’র সাংবাদিক সামসুদ্দোজা সাজেন; সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান।

নুরুল কবির বলেছেন, সাধারণত ‘মব’ বলতে বিশৃঙ্খল জনশক্তি হিসেবে পরিচিত, কিন্তু তিনি দেখেছেন এটি সুসংগঠিত এবং পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করেছে। তার মতে, এই সুশৃঙ্খল হামলার পৃষ্ঠপোষকতা সরকারের কাছ থেকে এসেছে। তিনি আরও বলেন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব তাকে এভিডেন্স ছাড়া মিথ্যা অভিযোগ করেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে ফেসবুকে প্রকাশিত স্ট্যাটাসই প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট যে, সরকার কোনোভাবে সহায়তা করেনি বলে দাবিটি ভিত্তিহীন। এছাড়াও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতা পড়ালে কেউ পক্ষপাতী হয়ে উঠত না বলেও মতামত দেন। তিনি বলেন, “শুধুমাত্র অর্থের অভাবে সাংবাদিকরা দুর্নীতিগ্রস্থ হয়, এটি সত্য নয়; অনেক ধনী সাংবাদিক ও সম্পাদকও দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকেন। প্রকৃত সাংবাদিক হলেন তারা যারা ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, আর যারা তা করেন না তারা হলো পাবলিক রিলেশন অফিসার।”

কামাল আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকার তাদের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে হঠাৎ করে তাড়াহুড়ায় নানা কাজ শুরু করেছে, গত কয়েকদিনে একের পর এক অধ্যাদেশ পাশ করা হচ্ছে, যা আগামী সংসদে আদৌ টিকবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে আগামী বৃহস্পতিবার একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে, সেখানে জোড়াতালি দিয়ে আবার কয়েকটি অধ্যাদেশ করা হতে পারে, যা বাস্তবে তেমন কোনো কার্যকারিতা বয়ে আনবে না।

তিনি আরও মন্তব্য করেন, ইতিমধ্যেই তথ্য সম্প্রচার কমিশন ও গণমাধ্যম কমিশন নামে দুটি নতুন অধ্যাদেশ তাড়াহুড়ায় চালু করা হয়েছে, যা এক ধরনের জগাখিচুড়ী উদ্যোগ হিসেবে মনে হচ্ছে। কামাল বলেন, গণমাধ্যম কমিশনের রিপোর্টের আগে কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়নি, যা সরকারের একটি সীমিত অর্জন বলা যায়, তবে গণমাধ্যমের মালিকদের উচিত তাদের আর্থিক লাভের প্রতিফলন কর্মীদের মধ্যেও দেখা যাওয়া। সরকারের এই শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়োকে তিনি স্পষ্টভাবে সমালোচনা করেছেন, যা দেখাচ্ছে যে তারা সুপারিশ ও পরিকল্পনা না মেনে মাত্র শেষ মুহূর্তে জোড়াতালি দিয়ে কাজ করছে।

অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস বলেন, ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মধ্যে রাখতে সংসদ ও গণমাধ্যমের কার্যকর জবাবদিহিতা জরুরি।

তিনি বলেন, সংসদ ও গণমাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত জবাবদিহিতার সংস্কৃতি না থাকায় সরকারকে নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

জিল্লুর রহমান বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ‘তিন শূন্য’-এর কথা বললেও বাস্তবে তিনি চারপাশে কেবল শূন্যতাই দেখতে পাচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে এবং সেখানে সরকারের কড়া সমালোচক এক প্রবীণ সম্পাদককে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, একই অনুষ্ঠানে একজন সরকারি প্রতিনিধি এসব ঘটনাকে ‘মব’ হিসেবে আখ্যা দিতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তাতে অভ্যুত্থানের অবমাননা হয় বলে দাবি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অধ্যাপক এস. এম. শামীম রেজা বলেন, আগামী সরকার গঠনের আগেই গণমাধ্যমকে আত্মসমালোচনা করতে হবে এবং বিগত বছরগুলোর ভুল সাংবাদিকতা স্বীকার করা জরুরি, তবেই ভবিষ্যতে স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করা সহজ হবে। তিনি বলেন, গণমাধ্যম আন্দোলনে জনগণের সম্পৃক্ততা কম থাকায় গণমাধ্যম ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো, সুরক্ষা আইন, প্রেস কাউন্সিলের কার্যকারিতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং দমনমূলক আইন নিয়েও মত দেন।

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সাংবাদিকদের নামে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে এবং সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক সংকটের যথাযথ সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে সরকারকে তোষামোদ করার একটি প্রবণতা রয়েছে, যা বিগত সরকারের সময় ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। সুষ্ঠু ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।

ডা. সাজেদুল হক রুবেল বলেছেন, দেশে কোন ধরনের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় রয়েছে তার ওপরই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নির্ভর করে। তিনি উল্লেখ করেছেন, পার্টিজান হলেও মানিক শাহের সাংবাদিকতায় তা প্রকাশ পেতো না। ডা. রুবেল আরও বলেন, দেশে বসে প্ররোচনামূলক বক্তব্যের দায় নিতে হয়, কিন্তু গত ১৮ মাসে বিদেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্ররোচনা ছড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

জাহিদ নেওয়াজ খান জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের শেষ বা ২০২৪ সালের শুরুতে একটি এজেন্সি তার সঙ্গে যোগাযোগ করে চা খাওয়ার জন্য ডাকে, তিনি প্রথমে যাননি, পরে বাধ্য হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা হয় এবং তার সম্পর্কে একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করার নির্দেশ আসে, যা মূলত একজন মন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি উল্লেখ করেন, ফটোকার্ড বিষয়টি সমস্যা তৈরি করেছে এবং এই নামে করা সাংবাদিকতা দীর্ঘমেয়াদে কতটা ফলপ্রসূ হবে জানা নেই। টেলিভিশন মিডিয়া বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভরশীল, তবে কিছু চ্যানেল সাবস্ক্রিপশন ছাড়া বিনামূল্যে বিতরণ হয়, যা তাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

এ. কে. এম. মনজুরুল ইসলাম ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলার ঘটনায় যেন উল্টো এক ধরনের “লাভই” হয়েছে, কারণ এসব ঘটনার পর সাংবাদিকদের মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে উঠতে দেখা গেছে এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নানামুখী তৎপরতা চোখে পড়েছে, যা অতীতে অন্যান্য গণমাধ্যমের ওপর হামলার সময় তেমনভাবে দেখা যায়নি। একই সঙ্গে তিনি প্রেস কাউন্সিলের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, প্রেস কাউন্সিল এখনো যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে যথাযথভাবে গঠিত হয়নি এবং ভবিষ্যতে এটি দক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে কার্যকর করা প্রয়োজন।

রিয়াজ আহমেদ বলেন, স্বল্প সময় ও সীমিত সম্পদের মধ্যেও গণমাধ্যম বিষয়ক সংস্কার কমিশন যে কাজটি সম্পন্ন করেছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আগামীতে যারা সরকারে আসবেন, তারা গণমাধ্যম সংস্কারে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবুও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আয়েশা কবির বলেন, গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম, যা প্রত্যাশিত নয়।

তিনি বলেন, একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে হলে গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি তিনি মন্তব্য করেন, নারীদের অংশগ্রহণ ও অধিকার নিয়ে এ ধরনের আলোচনা যদি নারী সাংবাদিকদের বদলে পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকেও উঠে আসে, তবে গণমাধ্যমে নারীদের জন্য কাজের পরিবেশ আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হবে।
ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত বলেছেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নিজেদের স্বাধীনতা ঠিক করতে হবে, কারণ ক্ষমতায় আসা যেকেউ তোষামোদ করতে চায়।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমে সীমিত স্বাধীনতা থাকলেও পেশাজীবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের সরাসরি সম্পৃক্ততায় বিধিনিষেধ থাকা উচিত। পাশাপাশি, এআই তৈরি ভিডিও ও সম্পাদিত ফটো অনেকেই যাচাই না করে শেয়ার করছেন, যা নির্বাচনের আগে আরও বাড়বে।

পারভিন এফ চৌধুরি বলেছেন, দেশে বর্তমানে সরকার জনগণ বা সাংবাদিকদের দাবি মেনে নেওয়ার অবস্থায় নেই। তিনি উল্লেখ করেন, সাংবাদিকদের বেতন দেওয়া হয় না এবং অনেক সংবাদমাধ্যম বেতনের আগে কর কেটে নেয়, ফলে ইতিমধ্যেই কম বেতনে কর্মরত সাংবাদিকদের চলতে কঠিন হয়ে পড়ে।

মুক্তাদীর রশিদ বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে এর দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এ জন্য তিনি একটি ‘মিডিয়া অ্যাকাউন্টেবিলিটি কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি সাংবাদিকদের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, দেশে বহু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকরা দুই থেকে তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতি নিরসন ছাড়া গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন খান বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। তবে মালিকানাগত কারণে অধিকাংশ গণমাধ্যম কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকায় সাংবাদিকতায় হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, দেশে সাহসী সাংবাদিকতার ঘাটতি রয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে জনমানসে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে।