খেলাপি ঋণ লাফিয়ে বাড়লো কেন?
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৫৮:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
- / 121
গাজীপুরের টঙ্গীতে অ্যাননটেক্স গ্রুপের একটি পোশাক কারখানা। সাত বছর ধরে কারখানাটি বন্ধ। চাকরি হারিয়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক।
কারখানাটিতে গিয়ে দেখা গেল, মূল ফটক থেকে খুলে ফেলা হয়েছে কারখানার নাম এবং মালিকপক্ষের কোম্পানির লোগো। ভেতরে কয়েকটি বহুতল ভবন অলস পড়ে আছে।
মূল ফটকের ভেতরে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী আড্ডা দিচ্ছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তাদের একজন মালিকপক্ষ থেকে নিয়োজিত, অন্যজন জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে আছেন।
মূলত কারখানাটির মালিক অ্যাননটেক্স গ্রুপের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের পাওনা সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি। যার পুরোটাই খেলাপি হয়ে গেছে। মালিকপক্ষ ঋণ শোধ করছেন না, কিস্তিও দিচ্ছেন না। ফলে বন্ধকি এই সম্পত্তি এখন ব্যাংকের অধীনে।
সেখানে কথা হয় জনতা ব্যাংকের নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এটার তো লোন আছে। সেজন্যই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাদের এখানে রাখছে। আমাদের কাজ হলো যেন এখান থেকে কোনো মালামাল বের না হতে পারে, কিংবা মালিকপক্ষ কিছু নিয়ে যেতে না পারে। অর্থাৎ যেখানে যা আছে, সেভাবেই থাকবে।”
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণে অ্যাননটেক্স গ্রুপ একমাত্র উদাহরণ নয়। বেক্সিমকো, এস আলমসহ বড় বড় কোম্পানি নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপি হয়েছে।
বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত এক বছরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।
এছাড়া নানা কৌশলে খেলাপি না দেখানো ঋণগুলোও এখন প্রকাশ্যে আসছে, ফলে মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশই এখন খেলাপি।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, ঋণ খেলাপিদের অনেকে যখন পলাতক, তখন এই বিপুল ঋণ আদায় কতটা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ কত?
২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকায়।
আর ২০২৫ সালের জুন নাগাদ খেলাপি ঋণ গিয়ে ঠেকেছে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় — অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে রেকর্ড ৩ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ।
এই বিশাল অঙ্কের ঋণ দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।
এক. এই টাকা আদায় হবে কি না, তা অনিশ্চিত।
দুই. যেসব ব্যাংক এই ঋণ দিয়েছে, তারা ধুঁকছে; গ্রাহকদের টাকায় ঋণ দেওয়ায় এখন তাদের হাতে নগদ অর্থ নেই। ফলে আমানতকারীরা তাদের টাকা পাচ্ছেন না।
তিন. ব্যাংকগুলো নতুন করে বিনিয়োগে অনাগ্রহী, ফলে উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এখানে একটা দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মানুষের জীবনমান — সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।”
খেলাপি ঋণ লাফিয়ে বাড়লো কেন?
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগেও খেলাপি ঋণের চিত্র কমবেশি এমনই ছিল, তবে প্রকৃত তথ্য আড়াল করা হয়েছিল। এখন সেই বাস্তবতা প্রকাশ পাচ্ছে।
তবে এর বাইরেও কিছু কারণ রয়েছে—
* শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগপন্থী অনেক ব্যবসায়ী দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, যেমন বেক্সিমকো, এস আলম, নাসা গ্রুপ ইত্যাদি। তাদের ব্যবসা স্থবির, কিস্তি পরিশোধও বন্ধ।
* আইএমএফ-এর চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী খেলাপি ঋণ হিসাব করছে, ফলে সংখ্যা বেড়েছে।
* আদালতের আদেশে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না এমন ঋণগুলো এখন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
* কিছু ব্যাংকে ‘ফরেনসিক অডিট’ চালানো হয়েছে, যেখানে নতুন খেলাপি ঋণের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে এক বছরে খেলাপি ঋণের এই বৃদ্ধি ঘটেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
ঋণ আদায়ের অভিজ্ঞতা: ‘কোনো যন্ত্রই কাজ করছে না’
খেলাপি ঋণ শনাক্ত করা হচ্ছে, কিন্তু আদায় কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলো জামানত বিক্রি বা ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছু অর্থ উদ্ধারে চেষ্টা করছে।
তবে সমস্যা তিনটি—
এক. জামানতের মূল্য ঋণের তুলনায় অনেক কম।
দুই. অনেক বড় ঋণ বেনামে দেওয়া হয়েছে।
তিন. ঋণগ্রহীতারা বিদেশে পলাতক, টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ ৫৯ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ। এর মধ্যে মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকা আদায় হয়েছে।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, “এই ব্যাংকের মোট ডিপোজিট ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৯ হাজার কোটি টাকা এমনভাবে ঋণ দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রকৃত সুবিধাভোগীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মনে করেন, কাজের বুয়াকে একশ কোটি টাকা দিয়ে দিলেন, চটপটিওয়ালার নামে দুইশ কোটি টাকা দিলেন — এখানেই লুটপাটটা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে সরকারের সহায়তা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে বিদেশে অর্থ ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছে।”
কী করছে বাংলাদেশ ব্যাংক?
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে পাঁচটি পদক্ষেপ নিয়েছে—
১. দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ব্যবসাগুলোকে সহজ শর্তে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
২. জামানত ও শেয়ার বিক্রি করে ঋণ আদায়ের প্রচেষ্টা চলছে।
৩. মন্দ ঋণগুলো ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে আলাদা করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
৪. ঋণ আদায়ে দক্ষ ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।
৫. বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “আমাদের টাস্কফোর্স বিদেশে কাজ শুরু করেছে। যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, সেসব জায়গায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
সরকার ইতোমধ্যে পাঁচটি দুর্বল ইসলামি ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ব্যাংকে টাকা রাখেন সাধারণ গ্রাহকরা। সেই টাকা দিয়েই ঋণ দেওয়া হয়। এখন যদি এই ঋণ বিশাল অঙ্কে খেলাপি হয়ে যায়, তাহলে ব্যাংকের কাছে আর নগদ অর্থ থাকে না। ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে পারলে গ্রাহকদের চাহিদা কিছুটা পূরণ সম্ভব হবে, যদিও বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত পাওয়া কঠিন।”































