ঢাকা ১১:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কেন জাতির পিতার স্বীকৃতি পাননি ‘গান্ধী’

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:৪৬:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর ২০২৫
  • / 114

মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের ইতিহাসে যে কয়েকটি নাম স্বর্ণ খোঁচিত তাদের একজন মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। যিনি অহিংসার মাধ্যমে স্বাধীনতার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে “মহাত্মা” নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। আজ ২ অক্টোবর এই জাতীয় বীরের জন্মদিন। ১৮৬৯ সালের এই দিনে ভারতের গুজরাটের পোরবন্দরে জন্ম নেন তিনি।

ভারতের কোটি মানুষ তাকেই একবাক্যে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকার করে নেন। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো- দেশটির সরকারি কোনো নথিতে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে “জাতির পিতা” বলা হয়নি। কিন্তু কেন? তার আগে এই জাতীয় বীর সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য জেনে আসি।

মহাত্মা গান্ধী পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরে আইনচর্চা শুরু করেছিলেন কিন্তু তেমন সাফল্য পাননি। ভাগ্যের পথ পরিবর্তন হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়। ১৮৯৩ সালের এক শীতল রাতে, ট্রেনে ভ্রমণকালে গান্ধীকে তার বর্ণের কারণে ফার্স্ট-ক্লাস কামরা থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এ অপমান তাঁকে বদলে দেয়। তিনি বুঝলেন, ব্রিটিশ শাসনের অন্যায় কেবল ভারতেই নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে।

দক্ষিণ আফ্রিকাতেই তিনি প্রথম “সত্যাগ্রহ” বা সত্যের জন্য অহিংস আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এখানেই জন্ম নেয় তাঁর দর্শন- সহিংসতার বদলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিবাদ। ১৯১৫ সালে গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন। দেশ তখন ব্রিটিশ শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট। কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ- সবাই ছিল শোষিত। গান্ধী একে একে চাম্পারন, খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তাঁর আহ্বান ছিল সহজ- “অন্যায় মান্য করো না, কিন্তু সহিংসতায় জড়িও না।”

১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহ তাঁর জীবনের অন্যতম মাইলফলক। ব্রিটিশ সরকার লবণ উৎপাদনে কর বসিয়েছিল। গান্ধী হাজারো মানুষ নিয়ে ২৪০ মাইল হেঁটে সমুদ্রতটে পৌঁছান, নিজ হাতে লবণ তৈরি করেন। এই কর্মসূচি সমগ্র ভারতবাসীর মধ্যে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু স্বাধীনতার পথে গান্ধীর সংগ্রাম ছিল কঠিন। বারবার তিনি কারাবরণ করেছেন, অসংখ্যবার লাঞ্ছিত হয়েছেন। তবুও তাঁর অহিংস আদর্শে কেঁপে উঠেছিল সম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন। ১৯৮২ সালে তিনি আহ্বান করেন “ভারত ছাড়ো আন্দোলন” যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার রূপকল্প তৈরি করে।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। ভারতের কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি স্থান করে নেন জাতির পিতার। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো- দেশটির সরকারি কোনো নথিতে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে “জাতির পিতা” বলা হয়নি। তাহলে প্রশ্ন জাগে- যাকে গোটা ভারত জাতির পিতা মানে, তাঁকে কেন সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি?

প্রথমত ভারতের সংবিধানে বা আইনে “জাতির পিতা” নামে কোনো উপাধির বিধান নেই। আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ স্বীকৃতি দিতে পারেনি। পাশাপাশি স্বাধীনতা আন্দোলনে অসংখ্য নেতার অবদান ছিল- যেমন: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ভগৎ সিং, জওহরলাল নেহরু, সরদার প্যাটেলসহ অনেকে। এককভাবে কাউকে এই উপাধি দিলে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারত। তাই সরকারিভাবে ঘোষণা হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো-জনমানসে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং ইতিহাসের পাতায় গান্ধীই ভারতের জাতির পিতা। তাঁর জন্মদিন জাতিসংঘে পালিত হয় আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস হিসেবে।

যে জাতিকে তিনি স্বাধীণতা এনে দিয়েছিলেন, সেই জাতির সন্তান নাথুরাম গডস’র গুলিতে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নিহত হন গান্ধী। তবে মরেও তিনি অমর হয়ে রয়েছেন গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

কেন জাতির পিতার স্বীকৃতি পাননি ‘গান্ধী’

সর্বশেষ আপডেট ০১:৪৬:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর ২০২৫

ভারতের ইতিহাসে যে কয়েকটি নাম স্বর্ণ খোঁচিত তাদের একজন মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। যিনি অহিংসার মাধ্যমে স্বাধীনতার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে “মহাত্মা” নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। আজ ২ অক্টোবর এই জাতীয় বীরের জন্মদিন। ১৮৬৯ সালের এই দিনে ভারতের গুজরাটের পোরবন্দরে জন্ম নেন তিনি।

ভারতের কোটি মানুষ তাকেই একবাক্যে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকার করে নেন। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো- দেশটির সরকারি কোনো নথিতে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে “জাতির পিতা” বলা হয়নি। কিন্তু কেন? তার আগে এই জাতীয় বীর সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য জেনে আসি।

মহাত্মা গান্ধী পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরে আইনচর্চা শুরু করেছিলেন কিন্তু তেমন সাফল্য পাননি। ভাগ্যের পথ পরিবর্তন হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়। ১৮৯৩ সালের এক শীতল রাতে, ট্রেনে ভ্রমণকালে গান্ধীকে তার বর্ণের কারণে ফার্স্ট-ক্লাস কামরা থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এ অপমান তাঁকে বদলে দেয়। তিনি বুঝলেন, ব্রিটিশ শাসনের অন্যায় কেবল ভারতেই নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে।

দক্ষিণ আফ্রিকাতেই তিনি প্রথম “সত্যাগ্রহ” বা সত্যের জন্য অহিংস আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এখানেই জন্ম নেয় তাঁর দর্শন- সহিংসতার বদলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিবাদ। ১৯১৫ সালে গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন। দেশ তখন ব্রিটিশ শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট। কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ- সবাই ছিল শোষিত। গান্ধী একে একে চাম্পারন, খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তাঁর আহ্বান ছিল সহজ- “অন্যায় মান্য করো না, কিন্তু সহিংসতায় জড়িও না।”

১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহ তাঁর জীবনের অন্যতম মাইলফলক। ব্রিটিশ সরকার লবণ উৎপাদনে কর বসিয়েছিল। গান্ধী হাজারো মানুষ নিয়ে ২৪০ মাইল হেঁটে সমুদ্রতটে পৌঁছান, নিজ হাতে লবণ তৈরি করেন। এই কর্মসূচি সমগ্র ভারতবাসীর মধ্যে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু স্বাধীনতার পথে গান্ধীর সংগ্রাম ছিল কঠিন। বারবার তিনি কারাবরণ করেছেন, অসংখ্যবার লাঞ্ছিত হয়েছেন। তবুও তাঁর অহিংস আদর্শে কেঁপে উঠেছিল সম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন। ১৯৮২ সালে তিনি আহ্বান করেন “ভারত ছাড়ো আন্দোলন” যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার রূপকল্প তৈরি করে।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। ভারতের কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি স্থান করে নেন জাতির পিতার। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো- দেশটির সরকারি কোনো নথিতে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে “জাতির পিতা” বলা হয়নি। তাহলে প্রশ্ন জাগে- যাকে গোটা ভারত জাতির পিতা মানে, তাঁকে কেন সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি?

প্রথমত ভারতের সংবিধানে বা আইনে “জাতির পিতা” নামে কোনো উপাধির বিধান নেই। আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ স্বীকৃতি দিতে পারেনি। পাশাপাশি স্বাধীনতা আন্দোলনে অসংখ্য নেতার অবদান ছিল- যেমন: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ভগৎ সিং, জওহরলাল নেহরু, সরদার প্যাটেলসহ অনেকে। এককভাবে কাউকে এই উপাধি দিলে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারত। তাই সরকারিভাবে ঘোষণা হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো-জনমানসে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং ইতিহাসের পাতায় গান্ধীই ভারতের জাতির পিতা। তাঁর জন্মদিন জাতিসংঘে পালিত হয় আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস হিসেবে।

যে জাতিকে তিনি স্বাধীণতা এনে দিয়েছিলেন, সেই জাতির সন্তান নাথুরাম গডস’র গুলিতে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নিহত হন গান্ধী। তবে মরেও তিনি অমর হয়ে রয়েছেন গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে।