ঢাকা ০২:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
পূর্ণাঙ্গ রায়ে উঠে এল ভয়াবহ বর্ণনা

ওসি প্রদীপের চাপে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে সিনহার মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:০৩:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫
  • / 88

ওসি প্রদীপের চাপে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে সিনহার মৃত্যু

করোনাকালীন ২০২০ সালে ব্যক্তিগত ইউটিউব প্রকল্পের কাজ করতে কক্সবাজারে গিয়ে নির্মমভাবে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান। পাঁচ মাস আগে রায়ের সারাংশ ঘোষণা করা হলেও, আজ সুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

‘রাষ্ট্র বনাম মো. লিয়াকত আলী ও অন্যান্য’ শিরোনামে প্রকাশিত ৩৭৮ পৃষ্ঠার এই রায় লিখেছেন বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান। রায়ে হত্যাকাণ্ডের পটভূমি, ঘটনাস্থলের বিবরণ ও দোষী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকায় একের পর এক ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ভ্রমণবিষয়ক কাজ

২০১৮ সালে স্বেচ্ছায় অবসরের পর সিনহা সামাজিক ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত হন। তিনি ‘জাস্ট গো’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলেন এবং সেই চ্যানেলের ভিডিও তৈরির অংশ হিসেবে ২০২০ সালের জুলাইয়ে সহকর্মীদের নিয়ে কক্সবাজার–টেকনাফ এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন।

ভিডিও ধারণের সময় স্থানীয়দের কাছ থেকে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তার কানে আসে। পরে মেরিন ড্রাইভে তাদের সঙ্গে দেখা হলে সিনহা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করায় প্রদীপ উত্তেজিত হয়ে তাকে এলাকা ছেড়ে যেতে বলে — এখানেই শত্রুতা জন্ম নেয় বলে উল্লেখ আছে রায়ে।

ঘটনার রাত: ৩১ জুলাই ২০২০

সেদিন রাতের বেলায় মুইন্না পাহাড়ে শ্যুটিং শেষ করে সিনহা তার সহকর্মীদের নিয়ে ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ৯টার সময় শামলাপুর চেকপোস্টে পৌঁছালে তাদের গাড়ি থামানো হয়।

রায়ে বলা হয়েছে:

গাড়ি থেকে হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন সিনহা

পরিচয় দেওয়ার পরপরই পরিদর্শক লিয়াকত চিৎকার করে বলেন “শুট শুট”

মুহূর্তেই তিনি সিনহার ওপর পরপর চার রাউন্ড গুলি চালান

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উপুর হয়ে পড়ে থাকা সিনহার হাতে হাতকড়া পরানো হয়

পানি চাইলে লিয়াকত তাকে অপমান করে এবং কোমরে লাথি মারে

ওসি প্রদীপ এসে যা করেন

রাতে কিছুক্ষণ পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ওসি প্রদীপ। মরণাপন্ন সিনহাকে দেখে তিনি বলেন—
“তোকে অনেক দিন ধরে টার্গেট করেছি।”

রায়ের বিবরণে আরও উল্লেখ আছে:

প্রদীপ সিনহার শরীরে পা দিয়ে চাপ দেন

গালি দিতে দিতে তার বুকে লাথি মারেন

সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ—বাম বুকে লাথি দেওয়ার পর বুট জুতা দিয়ে সিনহার গলার বাম অংশে জোরে চেপে ধরেন

এতে সিনহার দেহ কাঁপতে কাঁপতে নিস্তেজ হয়ে যায়

আদালত বলেছে, এভাবেই প্রদীপ নিশ্চিত করেন যে সিনহা আর বাঁচবেন না

আইনগত প্রক্রিয়া ও রায়

ঘটনার পাঁচ দিন পর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার হত্যামামলা করেন। র‌্যাব তদন্ত করে ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।
২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি বিচারিক আদালত:

ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকতকে মৃত্যুদণ্ড

আরও ৬ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেন

২০২৪ সালের ২ জুন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় বহাল রাখে এবং দণ্ডিতদের আপিল খারিজ করে দেয়। একই সঙ্গে যাদের খালাসের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ ফৌজদারি আবেদন করেছিল, সেটিও বাতিল করা হয়।

এত দিন পর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত পুরো ঘটনার ভয়াবহতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে অভিযুক্তদের নৃশংস আচরণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে উঠে এল ভয়াবহ বর্ণনা

ওসি প্রদীপের চাপে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে সিনহার মৃত্যু

সর্বশেষ আপডেট ০৯:০৩:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

করোনাকালীন ২০২০ সালে ব্যক্তিগত ইউটিউব প্রকল্পের কাজ করতে কক্সবাজারে গিয়ে নির্মমভাবে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান। পাঁচ মাস আগে রায়ের সারাংশ ঘোষণা করা হলেও, আজ সুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

‘রাষ্ট্র বনাম মো. লিয়াকত আলী ও অন্যান্য’ শিরোনামে প্রকাশিত ৩৭৮ পৃষ্ঠার এই রায় লিখেছেন বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান। রায়ে হত্যাকাণ্ডের পটভূমি, ঘটনাস্থলের বিবরণ ও দোষী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকায় একের পর এক ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ভ্রমণবিষয়ক কাজ

২০১৮ সালে স্বেচ্ছায় অবসরের পর সিনহা সামাজিক ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত হন। তিনি ‘জাস্ট গো’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলেন এবং সেই চ্যানেলের ভিডিও তৈরির অংশ হিসেবে ২০২০ সালের জুলাইয়ে সহকর্মীদের নিয়ে কক্সবাজার–টেকনাফ এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন।

ভিডিও ধারণের সময় স্থানীয়দের কাছ থেকে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তার কানে আসে। পরে মেরিন ড্রাইভে তাদের সঙ্গে দেখা হলে সিনহা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করায় প্রদীপ উত্তেজিত হয়ে তাকে এলাকা ছেড়ে যেতে বলে — এখানেই শত্রুতা জন্ম নেয় বলে উল্লেখ আছে রায়ে।

ঘটনার রাত: ৩১ জুলাই ২০২০

সেদিন রাতের বেলায় মুইন্না পাহাড়ে শ্যুটিং শেষ করে সিনহা তার সহকর্মীদের নিয়ে ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ৯টার সময় শামলাপুর চেকপোস্টে পৌঁছালে তাদের গাড়ি থামানো হয়।

রায়ে বলা হয়েছে:

গাড়ি থেকে হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন সিনহা

পরিচয় দেওয়ার পরপরই পরিদর্শক লিয়াকত চিৎকার করে বলেন “শুট শুট”

মুহূর্তেই তিনি সিনহার ওপর পরপর চার রাউন্ড গুলি চালান

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উপুর হয়ে পড়ে থাকা সিনহার হাতে হাতকড়া পরানো হয়

পানি চাইলে লিয়াকত তাকে অপমান করে এবং কোমরে লাথি মারে

ওসি প্রদীপ এসে যা করেন

রাতে কিছুক্ষণ পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ওসি প্রদীপ। মরণাপন্ন সিনহাকে দেখে তিনি বলেন—
“তোকে অনেক দিন ধরে টার্গেট করেছি।”

রায়ের বিবরণে আরও উল্লেখ আছে:

প্রদীপ সিনহার শরীরে পা দিয়ে চাপ দেন

গালি দিতে দিতে তার বুকে লাথি মারেন

সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ—বাম বুকে লাথি দেওয়ার পর বুট জুতা দিয়ে সিনহার গলার বাম অংশে জোরে চেপে ধরেন

এতে সিনহার দেহ কাঁপতে কাঁপতে নিস্তেজ হয়ে যায়

আদালত বলেছে, এভাবেই প্রদীপ নিশ্চিত করেন যে সিনহা আর বাঁচবেন না

আইনগত প্রক্রিয়া ও রায়

ঘটনার পাঁচ দিন পর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার হত্যামামলা করেন। র‌্যাব তদন্ত করে ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।
২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি বিচারিক আদালত:

ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকতকে মৃত্যুদণ্ড

আরও ৬ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেন

২০২৪ সালের ২ জুন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় বহাল রাখে এবং দণ্ডিতদের আপিল খারিজ করে দেয়। একই সঙ্গে যাদের খালাসের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ ফৌজদারি আবেদন করেছিল, সেটিও বাতিল করা হয়।

এত দিন পর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত পুরো ঘটনার ভয়াবহতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে অভিযুক্তদের নৃশংস আচরণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।