বিভুরঞ্জনকে নিয়ে ছোট ভাই
এমন পরিণতি যেন আর কারও না হয়
- সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৬:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৫
- / 146
নিখোঁজের পরদিন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদী থেকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখক বিভুরঞ্জন সরকারের (৭১) মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করার পর বিভুরঞ্জনের ছোট ভাই চিররঞ্জন সরকার বলেন, ‘তিনি কীভাবে মারা গেলেন, সেটি আমরা জানি না। আমি শুধু এই টুকুই বলব, এমন পরিণতি যেন আর কারও না হয়।’
বিভুরঞ্জন সরকারের পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো মনোমালিন্য ছিল না জানিয়ে চিররঞ্জন সরকার বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সঙ্গে কিছু ছিল কি না আমরা জানি না। এটি আত্মহত্যা, না খুন, না পরিকল্পিত কোনো ঘটনা, আমরা জানি না। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
চিররঞ্জন সরকার বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত হয়েছি এটা আমার দাদা বিভুরঞ্জন সরকারের লাশ। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় অফিসে যাবে বলে বাসা থেকে বের হয় সে। পরে বৌদি দাদাকে ফোন দেয়। ফোন বন্ধ পেয়ে অফিসে ফোন দেয়। পরে জানতে পারে অফিসেও যায়নি। এরপর আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও না পেয়ে ওইদিন রাতেই রমনা থানায় একটি মিসিং ডায়েরি করি।’
তিনি বলেন, দাদার মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে বাসায়ই রেখে বের হয়েছিলেন।
বিভুরঞ্জন সরকারের ছেলে ঋতু সরকার বলেন, ‘বাবা বৃহস্পতিবার সকালে মাকে বলে গিয়েছিল বিকেল ৫টায় বাড়ি ফিরবে। প্রতিদিন বিকেলের দিকেই বাড়ি ফেরে। ওইদিন ফোন বাড়িতে রেখেছিল। মাঝে মধ্যে বাড়িতে ফোন রেখেই যান।’ তিনি বলেন, ‘খোলা চিঠির ব্যাপারে আজই জানতে পারি। এ বিষয়ে আমাদের কারও জানা ছিল না।’
৭১ বছর বয়সী বিভুরঞ্জন সরকার দৈনিক আজকের পত্রিকার জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে কর্মস্থলে যাওয়ার কথা বলে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বের হন তিনি। এর পর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
শুক্রবার বিকেলে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে একজনের মরদেহ ভাসতে দেখে ৯৯৯–এ ফোন করে পুলিশকে জানান স্থানীয়রা। নৌ পুলিশের সদস্যরা গিয়ে বিকেল পৌনে চারটার দিকে লাশটি উদ্ধার করেন। লাশ দেখে নিখোঁজ সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের মনে হওয়ায় ছবি তুলে ঢাকার রমনা থানায় পাঠান তারা। সেই ছবি দেখে ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জে যান বিভুরঞ্জনের ভাই চিররঞ্জন সরকার ও ছেলে ঋতু সরকার। রাত পৌনে নয়টায় মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে গিয়ে লাশটি শনাক্ত করেন তারা।
কলাগাছিয়া নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. সালেহ আহমেদ পাঠান বলেন, উদ্ধারের সময় সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় তার শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তিনি উপুড় হয়ে মেঘনা নদীতে ভাসছিলেন। তার গলায় পরিহিত চশমাও ঝুলছিল।
গত বৃহস্পতিবার সকালে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখক বিভুরঞ্জন সরকার তার কর্মস্থল বনশ্রীর আজকের পত্রিকার কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। কোথাও তার কোনো খোঁজ মিলছিল না। এ বিষয়ে রাজধানীর রমনা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তারিকুল ইসলাম বলেন, বিভুরঞ্জন সরকারের ছেলে ঋতু সরকার বৃহস্পতিবার রাতে একটি জিডি করেছেন। মোবাইল ফোন সঙ্গে না নেওয়ায় প্রযুক্তিগতভাবে তার সর্বশেষ অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছে। এগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার গতিপথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে অন্যান্য সূত্র থেকেও এ বিষয়ে জানার চেষ্টা চলছে।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে কর্মস্থল বনশ্রীর আজকের পত্রিকা কার্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে তিনি বাসা থেকে বের হন। যদিও পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তিনি সেখানে যাননি। তিনি মোবাইল ফোনটিও বাসায় ফেলে গেছেন। পরিবার সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে খোঁজ নিয়েছে। তবে তার সন্ধান মেলেনি। গত ১৬ আগস্ট থেকে বিভুরঞ্জন সরকার ৭ দিনের ছুটিতে ছিলেন বলে আজকের পত্রিকা সূত্রে জানা গেছে।
বিভুরঞ্জন সরকারের ভাই চিররঞ্জন সরকার বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুকে লেখেন, ‘আমার দাদা সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় অন্যান্য দিনের মতো অফিস (আজকের পত্রিকা) যাবেন বলে বাসা থেকে বের হন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি অফিসে যাননি। পরিচিত পরিমণ্ডলের কোথাও যাননি। আজ কেউ তাকে দেখেননি। রাত ১টা পর্যন্ত বাসায় ফেরেননি। হাসপাতাল-পার্ক কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি মোবাইল ফোন বাসায় রেখে গেছেন। রাতে রমনা থানায় জিডি করা হয়েছে। তার জন্য আমরা পরিবারের সবাই ভীষণ উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম।’
উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া বিভুরঞ্জন সরকার ষাটের দশকের শেষদিকে স্কুলছাত্র থাকাকালেই দৈনিক আজাদে মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দৈনিক মাতৃভূমি, সাপ্তাহিক চলতিপত্র এবং সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ-এ গুরুত্বপূর্ণ পদে (সম্পাদক) কাজ করেছেন।
আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে ‘তারিখ ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী লেখা ব্যাপক সাড়া ফেলে।
































