ইবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় ঈদুল আজহা
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:০৫:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ জুন ২০২৫
- / 1033
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম জাতির অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসব মানুষের মানবিক মূল্যবোধকে সমৃদ্ধ করে এবং একটি সুখী, শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে সহায়তা করে। সারা বছর ক্লাস, পরীক্ষা, লাইব্রেরি আর পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা শিক্ষার্থীদের ঈদুল আজহাকে ঘিরে রয়েছে বিচিত্র ধরনের ভাবনা। ঈদুল আজহার প্রকৃত মাহাত্ম্য ও যথার্থতা উপলব্ধি নিয়েই মনের ভাব প্রকাশ করেছে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বাংলা অ্যাফেয়ার্সের ইবির নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল্লাহ আল রাহাত
“ঈদুল আজহা একটি আত্মিক জাগরণ”
ঈদুল আজহার মর্মবাণী কেবল পশু জবাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক আত্মিক জাগরণ—নিজস্ব লোভ, অহংকার, হিংসা ও স্বার্থপরতাকে বিসর্জন দেওয়ার এক প্রতীকী অনুশীলন। ঈদুল আজহা মানুষকে শেখায় কীভাবে আত্মত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় এবং মানবজাতির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা যায়। অপরদিকে, কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করার বিধান সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সহানুভূতির সেতুবন্ধন গড়ে তোলে। এই দিনে ধনী-গরিব সবাই একই বন্ধনে আবদ্ধ হয়—একই ত্যাগ, একই বিশ্বাস আর একই ভালোবাসায়।
আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এই উৎসব আমাদের ব্যক্তিজীবনকে করে তোলে উন্নত, সমাজকে করে তোলে মানবিক এবং বিশ্বকে করে তোলে শান্তিময়। আসুন, ঈদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা আমরা অন্তরে ধারণ করি, ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হই, এবং আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে দেই আলোর বার্তা।
(মাকসুদা আক্তার সেতু, শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফি)
“বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা জরুরী”
ঈদুল আজহার ধর্মীয় আচার পালন করার পাশাপাশি সমাজ ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা একজন সচেতন নাগরিকের পরিচয়। কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশগত দিক অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে শহর এলাকায় কুরবানির পরবর্তী ৮/১০ দিন দেখা যায় পশুর খাদ্য – উচ্ছিষ্ট ও মল-মুত্রের দুর্গন্ধে অতিষ্ট ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠে জনজীবন ও পরিবেশ। রক্ত, চামড়া ও পশুর অন্যান্য বর্জ্য যেন খোলা জায়গায় না ফেলে নির্দিষ্ট গর্তে মাটি চাপা দেওয়া হয় , সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জীবাণুনাশক ছিটানো ও যথাযথ পরিচ্ছন্নতা আমাদের বজায় রাখা উচিত। বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরি করে পরিবেশবান্ধব চাষেও ব্যবহার করা যেতে পারে। আর পরিবেশ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বর্জ্য বলে কিছু নেই সবই রিসোর্স। সুতরাং সময়ের সাথে এগুলোর সর্বোচ্চ ব্যাবহার আমাদের নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জলাধার ও ড্রেনেজে বর্জ্য ফেলা একদমই গ্রহণযোগ্য নয়। পশু জবাইয়ের সময় পানি অপচয় যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
(আব্দুল্লাহ আল নোমান, শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফি বিভাগ)
“সর্বোচ্চ ত্যাগ ও দাসত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের শিক্ষা”
ঈদ মানে মহান রবের দাসত্বের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। ঈদুল আজহা হচ্ছে মহান রাব্বুল আলামিনের নির্দেশনায় চূড়ান্ত ত্যাগ ও দাসত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের শিক্ষা। জাতির পিতা ইবরাহীম (আ:) ও তার শিশুপুত্র ইসমাইল (আ:) এর কঠিনতম পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার ইতিহাস। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হযরত ইবরাহীম (আ:) তার জীবনের কঠিনতম কাজ, নিজ পুত্রকে কোরবানি করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঈদুল আজহার অন্যতম বিশেষত্ত্ব হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য পশু কোরবানি করা। সমাজের গরীব-দুঃখী ও অসহায় মানুষদের মাঝে আনন্দ ভাগাভাগি করার প্রথা আদম (আ:) থেকে শুরু করে অদ্যাবধি চলমান। আমাদের প্রিয়নবী (স.) ঈদের দিনগুলোতে পরিবার-পরিজন ও সমাজের সকলকে নিয়ে আনন্দ উৎযাপন করার উপদেশ দিয়েছেন। তাই এ ঈদে ২৪’এর ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ প্রদর্শনকারী শহীদগণ ও আহত পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগা-ভাগি করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সকলের কামনা হওয়া উচিত।
(শাহজাদা ইয়ামিন, শিক্ষার্থী, আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ)
“আত্মত্যাগের গভীর শিক্ষার প্রতীক”
ঈদ মানেই শুধু আনন্দ, নতুন জামা বা মাংসের স্বাদ নয় -আত্মত্যাগের গভীর শিক্ষার প্রতীক। আমাদের শিক্ষা দেয় কোরবানী মানে তাকওয়া অর্জন করা, নিজের অন্তরের আত্মশুদ্ধি অর্জন করা। এ ঈদে কেবল পশু কোরবানি নয়, আমাদের অহংকার, হিংসা, সংকীর্ণতা – এসব কু-স্বভাবের কোরবানি দেওয়াও সবচেয়ে বড় ইবাদত। প্রকৃত কোরবানি তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন ভেতরে থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খাঁটি নিয়ত। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর নিঃস্বার্থ আত্মোৎসর্গের দৃষ্টান্ত আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়; সত্যিকারের ঈমান মানে শুধু মুখে বিশ্বাস নয়, বরং প্রয়োজনে প্রিয় জিনিসও আল্লাহর কাছে কোরবানি করা। এবারের ঈদে প্রার্থনা করি – আমাদের অন্তরগুলো যেন হয় উদার, আমাদের সমাজ যেন হয় সহানুভূতিশীল। সমাজের মানুষ যেন হয় আরো চিন্তাশীল। আমাদের ত্যাগ যেন হোক সত্যিকারের কোরবানির প্রতিচ্ছবি।
(রাসেল আহমেদ, শিক্ষার্থী, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগ)
“ঈদুল আজহা হোক সকল মানুষের সমবেত আনন্দ”
ঈদুল আজহা একটি পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু এই উৎসব কেবল পশু জবাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা হলো নিজের ভেতরের ‘নফস’ বা ‘আত্মা’কে জয় করা। ইসলাম ধর্ম কোরবানির গোস্ত সুষ্ঠুভাবে বন্টন করার নির্দেশনা দিয়েছে। আর সত্যিকার ত্যাগ তো তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন পাশে থাকা দরিদ্র মানুষটির মুখেও হাসি ফোটে। শহরে ঈদের আলোর ঝলকানি যত, গ্রামে এবং পাহাড়ে ঈদের ছায়া ততটাই ম্লান। এই বৈষম্য কমাতে আমাদের আরও বিস্তৃত সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ত্যাগের অনুশীলন শুধু শহরবাসীর উল্লাস না হয়ে, সকল মানুষের সমবেত আনন্দ হয়ে উঠুক। এতসব ভাবনার ভিড়ে সবচেয়ে অব্যক্ত রয়ে যায় নারীদের কথা। ঈদের অধিকাংশ প্রস্তুতি আর রান্নার দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে। কিন্তু ঈদের সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বে তাঁদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র খুবই সীমাবদ্ধ। আমার প্রত্যাশা আমাদের ঈদুল আজহা হোক আরও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এবং মানবিক। এই ঈদ হোক নিজেকে ছাপিয়ে অন্যের হয়ে ওঠার একটি দিন।
(মুমতাহিনা রিনি, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ)
“ঈদুল আজহার মধ্যে নিহিত নিজেকে পরিবর্তনের মূলমন্ত্র”
ঈদুল আজহা—একটি ত্যাগ ও সহমর্মিতার অনন্য নিদর্শন। মুসলিম সমাজে এটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং মানবিক গুণাবলির এক জীবন্ত চর্চা। এই ঈদ আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, জীবনে বড় কিছু অর্জনের জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু আমি ভাবি— আমরা কি কেবল পশু কোরবানিতে সীমাবদ্ধ থাকছি? নাকি নিজের ভেতরের খারাপ গুণ—হিংসা, লোভ, অহংকার—এইসবকেও কোরবানি দেওয়ার চেষ্টা করছি? ঈদুল আযহার প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এই দিনে আমি প্রায়শঃই দেখতে পাই সমাজে ধনী-গরিব একসাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেয়। কোরবানির মাংস বিতরণ করার সময় যে হাসিমুখ দেখি দরিদ্র মানুষের চোখে, তা আমাকে সত্যিকারের ঈদের অর্থ শেখায়। তাই আমার ভাবনা—ঈদুল আজহা শুধু উৎসব না হয়ে, নিজের ভেতরটা বদলে ফেলার মূলমন্ত্র হোক।
(আনিকা ইসলাম, শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ)
































