আফগানিস্তান: মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য প্রবেশদ্বার
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:২০:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫
- / 243
আফগানিস্তান, দীর্ঘকাল ধরে সংঘাত ও অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষ করে রাশিয়া যখন তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তখন থেকেই আফগানিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভৌগোলিকভাবে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায়, আফগানিস্তান এখন এই অঞ্চলের বাণিজ্য ও লজিস্টিক চেইনের এক অপরিহার্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুটগুলোর বিবরণ, তাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে তাদের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ট্রান্স-আফগান করিডোর: সংযোগের নতুন দিগন্ত
ট্রান্স-আফগান করিডোর, যা প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। মধ্য এশিয়া থেকে পাকিস্তান ও ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল বাণিজ্য পথ। এই করিডোর কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলো থেকে তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ধমনী হিসেবে কাজ করছে। এটি শুধু জ্বালানি পরিবহনেই নয়, বরং কৃষি পণ্য, খনিজ সম্পদ এবং অন্যান্য উৎপাদিত পণ্য দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ বাজারগুলোতে পৌঁছে দিতেও সক্ষম। এই করিডোরের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি যেতে পারছে। যা তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। পাকিস্তানের করাচি ও গোয়াদর বন্দরের সাথে এর সংযোগ এই করিডোরের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই করিডোর অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল আফগানিস্তানের জন্য রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস হতে পারে। যা দেশটির পুনর্গঠনেও সহায়তা করবে।
দোস্তি-কুলম রেলপথ: সীমান্তের ওপারে অর্থনৈতিক বন্ধন
আফগানিস্তান ও উজবেকিস্তানের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী দোস্তি-কুলম রেলপথটির দৈর্ঘ্য ৭৫ কিলোমিটার এবং এটি ২০১৮ সালে চালু হয়েছিল। এই রেলপথটি দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। প্রাথমিক অবস্থায় এই পথে পণ্য পরিবহন ১ মিলিয়ন টন হলেও, ভবিষ্যতে তা ৩ মিলিয়ন টনে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই রেলপথটি উজবেকিস্তানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোকে আফগানিস্তানের মাধ্যমে পাকিস্তানের বন্দরগুলোতে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে। যা তাদের রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে। এই রেল সংযোগ আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন রাখছে বলে মানে করেন বিশেষজ্ঞরা। যা শুধু স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যকে উৎসাহিত করছে না হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও সহায়তা করছে।
চাবাহার বন্দর: ভারত মহাসাগরের প্রবেশপথ
ইরানের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত চাবাহার বন্দরকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের জন্য একটি মূল বন্দর হিসেবে দেখা হয়। আফগানিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে পণ্য পাঠানোর জন্য এই বন্দরটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এই বন্দরের উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। যার পরিমাণ ২০২৪ সাল থেকে ইরান ও ভারত মিলে ১২০ মিলিয়ন ডলার। ভারতের জন্য চাবাহার বন্দর পাকিস্তানের করাচি বন্দরের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে এবং আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সাথে সরাসরি বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করতে সাহায্য করবে। এই বন্দর আফগানিস্তানের জন্য সমুদ্রপথে বাণিজ্যের এক নির্ভরযোগ্য প্রবেশপথ তৈরি করেছে। যা তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুযোগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চাবাহার বন্দর শুধু ভারতের জন্য নয়, মধ্য এশিয়ার স্থলবেষ্টিত দেশগুলোর জন্যও একটি কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে।
তুর্কমেনিস্তান হয়ে পরিবহন রুট: কাস্পিয়ান থেকে দক্ষিণ এশিয়া
২০২৩ সালে তুর্কমেনিস্তান হয়ে একটি নতুন পরিবহন করিডোর চালু হয়েছে। এই করিডোর কাস্পিয়ান অঞ্চল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় পণ্য পরিবহনে সহায়ক হচ্ছে। এটি মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে তাদের পণ্য কাস্পিয়ান সাগর হয়ে ইরানে এবং সেখান থেকে চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় পাঠাতে সাহায্য করবে। এই নতুন রুটটি শুধুমাত্র আফগানিস্তানের ট্রানজিট গুরুত্ব বাড়াচ্ছে না, বরং আঞ্চলিক লজিস্টিক চেইনকে আরও বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল করছে। এটি জ্বালানি, খনিজ পদার্থ এবং কৃষি পণ্যের মতো বিভিন্ন ধরণের পণ্যের জন্য একটি কার্যকর পরিবহন মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর (INSTC):
বহুমুখী বাণিজ্য সেতু আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর (INSTC) হলো একটি মাল্টি-মোডাল বাণিজ্য রুট যা ভারত, ইরান, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশকে সংযুক্ত করে। এই করিডোরের মূল উদ্দেশ্য হলো অঞ্চলগুলোর মধ্যে পণ্য পরিবহন সহজ করা এবং সময় ও ব্যয় কমানো। এই উদ্যোগটি সড়ক, রেল এবং সমুদ্রপথকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। আফগানিস্তান এই করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ এটি ইরান ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে একটি ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করে। INSTC আফগানিস্তানকে আঞ্চলিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করবে, যা দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করবে। এই করিডোর ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য প্রবাহকে আরও গতিশীল করবে।
আফগানিস্তানের কৌশলগত অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আফগানিস্তান শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক কেন্দ্র নয়, বরং একটি কৌশলগত বাণিজ্যিক সেতুবন্ধন হিসেবেও গড়ে উঠছে। এই রুটগুলো আফগানিস্তানকে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই বাণিজ্য রুটগুলো আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটবে এবং দেশটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।
তবে, এই সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। এছাড়া, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আধুনিক লজিস্টিক অবকাঠামো গড়ে তোলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তানের এই কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব, যা মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
ইমেইল: abusayed.sdream@gmail.com




































