আওয়ামী প্রভাবশালীদের টাকায় প্রতারণার রাজ্য: ‘সাফা গ্রীন সিটি’
- সর্বশেষ আপডেট ০১:৪৬:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
- / 296
কেরানীগঞ্জের আলোচিত শাহিন চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা প্রকল্পের উদ্বোধন করছেন। ছবি: সংগৃহীত
রাজউকের অনুমতি ছাড়াই রাজধানীর বসিলায় ‘সাফা গ্রীন সিটি’ নামে একটি হাউজিং প্রকল্প প্রতারনার নতুন ফাঁদ খুলে বসেছে। গ্রাহকদের চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েও প্লট বুঝিয়ে দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতারক এই চক্রের খপ্পরে পড়ে ঢাকা শহরে একখণ্ড জমির আশায় হাজার হাজার ভুক্তভোগী পরিবার আজ সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রকল্পটির আড়ালে চলছে জমি দখল, এক প্লট একাধিক ক্রেতার কাছে বিক্রি, নারী কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর মতো ভয়ঙ্কর কার্যক্রম।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বেশ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিকের এই প্রকল্পে বিনিয়োগ রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কেরানীগঞ্জের আলোচিত ও বিতর্কিত শাহীন চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ মদদে প্রকল্পটির দখল কার্যক্রম চালানো হয়। যা সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন প্রকল্পটির বর্তমান চেয়ারম্যান কামাল হোসেন ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (বিপনন) জাহাঙ্গীর আলম। পেশায় কেমিক্যাল ব্যবসায়ি কামাল হোসেন এলাকাবাসীর কাছে “রহস্য মানব” হিসেবে পরিচিত।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি- কামাল হোসেন আসলে আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী, একইসঙ্গে একজন ভূমিদস্যু। কেরানীগঞ্জের শাহীন চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই উঠে আসেন তার নাম।
অভিযোগ রয়েছে, শাহীন চেয়ারম্যানকে নিয়মিত কোটি টাকার ভাগ ও নারী সরবরাহ করতেন কামাল।
সাফা গ্রীন সিটির চেয়ারম্যান কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে খাস জমি দখল, নদী ভরাট, অস্ত্র ঠেকিয়ে জমি রেজিস্ট্রি, নারী কেলেঙ্কারি, এমনকি স্বর্ণ চোরাচালানের মতো অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির লালমাটিয়া অফিসে ভুক্তভোগীরা প্লট বুঝে পেতে গেলে প্রায়ই তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে; এ সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ রয়েছে বাংলা অ্যাফেয়ার্সের হাতে। অভিযোগ উঠেছে, একেকটি প্লট তিনজন পর্যন্ত ক্রেতার কাছে বিক্রি করে প্রতারণা করেছেন কামাল।
তার অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (বিপনন) জাহাঙ্গীর আলম। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য- জাহাঙ্গীর শুধু প্লট বিক্রিতেই নয়, সুন্দরী নারীদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবশালীদের তুষ্ট করার কাজও করেছেন। জমি দখল ও অস্ত্রসজ্জিত মহড়ায়ও নেতৃত্ব দেন তিনি। প্রকল্প এলাকার বহু সাধারণ মানুষের জমি জবরদখলের ঘটনাতেও তার নাম এসেছে।
অন্যদিকে কামাল হোসেন রাজধানীর বারিধারার একটি চার হাজার বর্গফুটের অভিজাত ফ্ল্যাটে বসে অবৈধ অর্থ ও নারী ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর পরিচালনা পর্ষদে কিছু বিএনপি নেতাকে সঙ্গে নিয়ে অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগীদের একজন নারী ক্রেতা জানান, পরিবারের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে প্লট কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু প্লট বুঝে না পাওয়ার পাশাপাশি অফিসে গেলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
বাংলা অ্যাফেয়ার্সের হাতে আসা সরকারি নথি ও অভিযোগপত্রে দেখা গেছে, খাস জমি দখল, একাধিক ক্রেতার কাছে একই প্লট বিক্রি এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার মতো অসংগতি সাফা গ্রীন সিটির বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
প্রথম দিকে প্রকল্পটি সাফা বহুমুখী সমিতি লিমিটেডের নামে আটি এলাকায় টুকরো টুকরো জমি কেনা শুরু করে। সমিতির ১২০ জন সদস্যের জন্য ৮ শতাংশ করে জমি কেনার কথা। কিন্তু এরই মাঝে নগদ কড় কড়া টাকার গন্ধ খুঁজে পায় কামাল-জাহাঙ্গীর সিন্ডিকেট। তারা পুরো হাউজিং কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নেয়। সঙ্গে নেন কেরানীগঞ্জের তৎকালিন আলোচিত শাহীন চেয়ারম্যানকে।

পুরনো ছবি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই এলাকায় অধিকাংশ ছিলো জলাভূমি ও কৃষি জমি। সেখানে ড্রেজার বসিয়ে আশেপাশের কয়েকটি মৌজার জমি তারা শাহিন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ভরাট করেন। এই ভরাট করতে গিয়ে স্থানীয় কয়েকটি ছোট ছোট খালের জমিও ভরাট করে সাফা কর্তৃপক্ষ।
সমিতির সদস্যদের অভিযোগ, তাদের জমা দেওয়া টাকায় ব্যবসা করছে সাফা গ্রীণ সিটি লিমিটেড ও বায়োকন বাংলাদেশ লিমিটেড। যেহেতু সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ ওই কোম্পানির পরিচালক; তাই তারা ইচ্ছেমতো তাদের সঞ্চয় ব্যবহারের সুযোগ নিচ্ছেন।
শুধু তাই না; কামাল ও জাহাঙ্গীর সিন্ডিকেট ওই এলাকায় কম দামে জমি কিনে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে তা আবার বিক্রি করছে। এর মাধ্যমে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
দৃশ্যমান আর কোন ব্যবসা না থাকার পরেও জাহাঙ্গীরের আলিশান জীবনযান নিয়ে বেশ কানাঘুষা রয়েছে। প্রতিনিয়ত সে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ান।
জাহাঙ্গীরের দাবি, ইতোমধ্যে সে ৬-৭টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমন নাকি তার নেশা।
প্রকল্পটির পরিচালক (বিপনন) জাহাঙ্গীর আলম বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, তাদের এই প্রকল্পে বেলায়েত নামে এক সচিব, দুদকের এক কর্মকর্তা, সমবায় অধিদপ্তরের একজন সহকারি নিবন্ধক তাদের স্ত্রীদের নামে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছেন। এসব নাম ব্যবহার করে তারা গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর সংশ্লিষ্ট জোনের দায়িত্বশীল হামিদুল ইসলাম বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে নিশ্চিত করেন, সাফা গ্রীণ সিটির জমি কেনা ও বিক্রির কোন অনুমোদন রাজউক দেয়নি। প্রকল্পটির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজউকের অনুমতি ছাড়া এই ধরনের প্রকল্প ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। ক্রেতারা বৈধ দলিল বা অবকাঠামোগত নিরাপত্তা পাবেন না, এমনকি প্রকল্পটি পরবর্তীতে অবৈধ ঘোষণা করা হলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির আশঙ্কাও থেকে যায়।
এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (বিপনন) জাহাঙ্গীর আলম বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, রাজউকের কাছে আবেদন করা হয়েছে; তারা যদি অনুমতি না দেয় তাহলে কি তাদের সাথে ‘মারামারি’ করবো।
চলবে …
আগের খবর দেখতে





































