ঢাকা ০২:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জুলাই ঘোষণাপত্রে ইতিহাসের বিকৃতি

ডেভিড বার্গম্যান
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:০৩:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫
  • / 280

ডেভিড বার্গম্যান

জুলাই ঘোষণাপত্রটি আরও সংক্ষিপ্ত ও পরিস্কার হওয়া উচিত ছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধসংক্রান্ত ধারা ১ ও ২ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস সংযোজন না করে, সরাসরি ধারা ১৩-এর একটি সংশোধিত সংস্করণে যাওয়া যেত; যেখানে আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী চরিত্রের কথা বলা হয়েছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে ১৫ থেকে ২৭ নম্বর ধারাগুলো সংশোধিত আকারে উপস্থাপন করলে দলিলটি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হতো।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনুস প্রদত্ত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ নিয়ে আমার প্রাথমিক কিছু মন্তব্য তুলে ধরা হলো:

১. ইতিহাস ও আওয়ামী লীগের বর্ণনা একপাক্ষিক
এই ঘোষণাপত্রে তুলে ধরা ইতিহাস এবং আওয়ামী লীগের বর্ণনা অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট ও একপাক্ষিক। এতে মনে হয়, এসব বক্তব্য এসেছে সেইসব মানুষের পক্ষ থেকে, যারা শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সরকারে থাকার সময়ের কর্মকাণ্ড নয়, বরং দলটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘৃণা করে। বলা চলে, এটি যেন আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের লেখা কোনো রাজনৈতিক দলিল।

২. ইতিহাসের রাজনৈতিক পুনর্লিখন
ঘোষণাপত্রে ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে এমন এক রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যা হয়তো আরও বেশি সমস্যা তৈরি করতে পারে, যতটা আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে তাদের নিজস্ব ইতিহাস তুলে ধরেছিল। একটি রাজনৈতিক পক্ষপাতকে সরিয়ে আরেকটি পক্ষপাত প্রতিষ্ঠা করা; এটিও ঐতিহাসিক বিকৃতি

৩. ইতিহাসে উপেক্ষা ও বিকৃতি
ঘোষণাপত্রে ১৯৭২–১৯৭৫ সময়ের আওয়ামী লীগ শাসনকে কেবল ‘বাকশাল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতি গঠনের নানা উদ্যোগ উপেক্ষিত হয়েছে (অনুচ্ছেদ ৪)।

‘সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতি ও কাঠামো’র ওপর দোষ চাপানো হয়েছে, যা আগে শোনা যায়নি। এটি সম্ভবত নতুন সংবিধান তৈরির পক্ষে থাকা গোষ্ঠীর মতবাদ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের ১৬ সদস্য হত্যাকাণ্ড এবং সামরিক শাসনের সূচনা একেবারেই উপেক্ষিত।

১৯৭৫–৮২ সময়কাল, অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের শাসনকালকে বলা হয়েছে ‘সাধারণ জনগণ ও সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান’, যা বিএনপিপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি।

‘১/১১’ ঘটনাকে বলা হয়েছে ‘ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তি’র ফল, অথচ বাস্তবে সেনা হস্তক্ষেপ জনপ্রিয় ছিল।

২০০৮ সালের নির্বাচন উপেক্ষিত, অথচ সেটিই আওয়ামী লীগের জয়ের পথ খুলে দেয়। এখানে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ “১৬ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী, অগণতান্ত্রিকভাবে দেশ শাসন করেছে”; যা সত্য নয়। বরং দলটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অগণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে।

৪. ২০০৯–২০২৪: একপাক্ষিক বর্ণনা
ঘোষণাপত্রে এ সময়কাল বর্ণনায় একতরফাভাবে বিরূপ বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছে; যেমন ‘জনবিরোধী’, ‘স্বৈরাচারী’, ‘মানবাধিকারের পরিপন্থী’, ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ ইত্যাদি।
যদিও এসবের কিছু সত্যতা রয়েছে, তবু আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারী শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবায়ু ইস্যুতে সাফল্য উপেক্ষিত হয়েছে।

এই শাসনামলের বাস্তবতা ছিল দ্বিমুখী; নেতিবাচক ও ইতিবাচক দুই দিকেই ব্যালান্স ছিল, যদিও সময়ের সঙ্গে নেতিবাচক দিকগুলো প্রাধান্য পায়।

৫. সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে সন্দেহ
ধারা ২০-এ বলা হয়েছে, ৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের একটি মতামত অন্তর্বর্তী সরকারকে বৈধতা দেয়। কিন্তু এখনো সেই মতামতের স্বাক্ষরিত কপি কেউ দেখেননি। তাই বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

জুলাই ঘোষণাপত্র
জুলাই ঘোষণাপত্র

৬. আইনি সুরক্ষার সীমারেখা
ধারা ২৪-এ বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে যেন রাজনৈতিক মামলা না হয়; এটি যৌক্তিক।
তবে একই সঙ্গে ভাষায় এমন ইঙ্গিত রয়েছে, যেন যারা সহিংসতায় জড়িত, তারাও সুরক্ষা পাবেন;যা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

৭. ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব
ধারা ২৭-এ বলা হয়েছে, এই দলিলটি ভবিষ্যৎ সরকারের প্রণীত নতুন সংবিধানের অংশ হবে। এতটা পক্ষপাতদুষ্ট একটি দলিল সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলে, তা হবে একটি দুঃখজনক ঘটনা।

৮. কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে (ধারা ১ ও ২)।

আন্দোলন ও গণজাগরণ যথাযথভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।

জনগণের আকাঙ্ক্ষা (সুশাসন, নির্বাচন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে (ধারা ২২ ও ২৫)।

নিহতের সংখ্যা ‘প্রায় এক হাজার’ বলা হয়েছে; যা তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত।

৯. ইউনুসের ভূমিকা
মুহাম্মদ ইউনুস রাজনীতিতে সরাসরি না জড়ালেও এই দলিলে তাঁর নাম থাকা তাৎপর্যপূর্ণ।
অনেকে মনে করেন, এই ঘোষণাপত্র তাঁর একসময়ের উজ্জ্বল ভাবমূর্তির শেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

১০. আরও সংক্ষিপ্ত হওয়া উচিত ছিল
১৯৭১ সালের ইতিহাস বাদে সরাসরি ধারা ১৩ ও ১৫–২৭ উপস্থাপন করলে দলিলটি আরও গ্রহণযোগ্য হতো।

ব্রিটিশ সাংবাদিক। লেখাটি তাঁর ফেসবুক থেকে নেওয়া।

 

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

জুলাই ঘোষণাপত্রে ইতিহাসের বিকৃতি

সর্বশেষ আপডেট ০১:০৩:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫

জুলাই ঘোষণাপত্রটি আরও সংক্ষিপ্ত ও পরিস্কার হওয়া উচিত ছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধসংক্রান্ত ধারা ১ ও ২ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস সংযোজন না করে, সরাসরি ধারা ১৩-এর একটি সংশোধিত সংস্করণে যাওয়া যেত; যেখানে আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী চরিত্রের কথা বলা হয়েছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে ১৫ থেকে ২৭ নম্বর ধারাগুলো সংশোধিত আকারে উপস্থাপন করলে দলিলটি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হতো।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনুস প্রদত্ত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ নিয়ে আমার প্রাথমিক কিছু মন্তব্য তুলে ধরা হলো:

১. ইতিহাস ও আওয়ামী লীগের বর্ণনা একপাক্ষিক
এই ঘোষণাপত্রে তুলে ধরা ইতিহাস এবং আওয়ামী লীগের বর্ণনা অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট ও একপাক্ষিক। এতে মনে হয়, এসব বক্তব্য এসেছে সেইসব মানুষের পক্ষ থেকে, যারা শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সরকারে থাকার সময়ের কর্মকাণ্ড নয়, বরং দলটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘৃণা করে। বলা চলে, এটি যেন আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের লেখা কোনো রাজনৈতিক দলিল।

২. ইতিহাসের রাজনৈতিক পুনর্লিখন
ঘোষণাপত্রে ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে এমন এক রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যা হয়তো আরও বেশি সমস্যা তৈরি করতে পারে, যতটা আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে তাদের নিজস্ব ইতিহাস তুলে ধরেছিল। একটি রাজনৈতিক পক্ষপাতকে সরিয়ে আরেকটি পক্ষপাত প্রতিষ্ঠা করা; এটিও ঐতিহাসিক বিকৃতি

৩. ইতিহাসে উপেক্ষা ও বিকৃতি
ঘোষণাপত্রে ১৯৭২–১৯৭৫ সময়ের আওয়ামী লীগ শাসনকে কেবল ‘বাকশাল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতি গঠনের নানা উদ্যোগ উপেক্ষিত হয়েছে (অনুচ্ছেদ ৪)।

‘সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতি ও কাঠামো’র ওপর দোষ চাপানো হয়েছে, যা আগে শোনা যায়নি। এটি সম্ভবত নতুন সংবিধান তৈরির পক্ষে থাকা গোষ্ঠীর মতবাদ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের ১৬ সদস্য হত্যাকাণ্ড এবং সামরিক শাসনের সূচনা একেবারেই উপেক্ষিত।

১৯৭৫–৮২ সময়কাল, অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের শাসনকালকে বলা হয়েছে ‘সাধারণ জনগণ ও সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান’, যা বিএনপিপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি।

‘১/১১’ ঘটনাকে বলা হয়েছে ‘ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তি’র ফল, অথচ বাস্তবে সেনা হস্তক্ষেপ জনপ্রিয় ছিল।

২০০৮ সালের নির্বাচন উপেক্ষিত, অথচ সেটিই আওয়ামী লীগের জয়ের পথ খুলে দেয়। এখানে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ “১৬ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী, অগণতান্ত্রিকভাবে দেশ শাসন করেছে”; যা সত্য নয়। বরং দলটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অগণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে।

৪. ২০০৯–২০২৪: একপাক্ষিক বর্ণনা
ঘোষণাপত্রে এ সময়কাল বর্ণনায় একতরফাভাবে বিরূপ বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছে; যেমন ‘জনবিরোধী’, ‘স্বৈরাচারী’, ‘মানবাধিকারের পরিপন্থী’, ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ ইত্যাদি।
যদিও এসবের কিছু সত্যতা রয়েছে, তবু আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারী শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবায়ু ইস্যুতে সাফল্য উপেক্ষিত হয়েছে।

এই শাসনামলের বাস্তবতা ছিল দ্বিমুখী; নেতিবাচক ও ইতিবাচক দুই দিকেই ব্যালান্স ছিল, যদিও সময়ের সঙ্গে নেতিবাচক দিকগুলো প্রাধান্য পায়।

৫. সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে সন্দেহ
ধারা ২০-এ বলা হয়েছে, ৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের একটি মতামত অন্তর্বর্তী সরকারকে বৈধতা দেয়। কিন্তু এখনো সেই মতামতের স্বাক্ষরিত কপি কেউ দেখেননি। তাই বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

জুলাই ঘোষণাপত্র
জুলাই ঘোষণাপত্র

৬. আইনি সুরক্ষার সীমারেখা
ধারা ২৪-এ বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে যেন রাজনৈতিক মামলা না হয়; এটি যৌক্তিক।
তবে একই সঙ্গে ভাষায় এমন ইঙ্গিত রয়েছে, যেন যারা সহিংসতায় জড়িত, তারাও সুরক্ষা পাবেন;যা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

৭. ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব
ধারা ২৭-এ বলা হয়েছে, এই দলিলটি ভবিষ্যৎ সরকারের প্রণীত নতুন সংবিধানের অংশ হবে। এতটা পক্ষপাতদুষ্ট একটি দলিল সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলে, তা হবে একটি দুঃখজনক ঘটনা।

৮. কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে (ধারা ১ ও ২)।

আন্দোলন ও গণজাগরণ যথাযথভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।

জনগণের আকাঙ্ক্ষা (সুশাসন, নির্বাচন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে (ধারা ২২ ও ২৫)।

নিহতের সংখ্যা ‘প্রায় এক হাজার’ বলা হয়েছে; যা তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত।

৯. ইউনুসের ভূমিকা
মুহাম্মদ ইউনুস রাজনীতিতে সরাসরি না জড়ালেও এই দলিলে তাঁর নাম থাকা তাৎপর্যপূর্ণ।
অনেকে মনে করেন, এই ঘোষণাপত্র তাঁর একসময়ের উজ্জ্বল ভাবমূর্তির শেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

১০. আরও সংক্ষিপ্ত হওয়া উচিত ছিল
১৯৭১ সালের ইতিহাস বাদে সরাসরি ধারা ১৩ ও ১৫–২৭ উপস্থাপন করলে দলিলটি আরও গ্রহণযোগ্য হতো।

ব্রিটিশ সাংবাদিক। লেখাটি তাঁর ফেসবুক থেকে নেওয়া।