শেখ সেলিমের ছায়ায় বিমানে ‘অঘোষিত সর্বেসর্বা’
- সর্বশেষ আপডেট ০২:০৫:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫
- / 5087
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কেবিন ক্রু থেকে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত গড়েছেন মনিরুজ্জামান খাঁন। গোপালগঞ্জ বাড়ি; এই কর্মকর্তার এমন উত্থানের পেছনে মূল চালিকা শক্তি ছিলেন বিগত সরকারের ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম।
তার সরাসরি প্রভাবে বিমানে চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটাসহ নানা সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে অঘোষিতভাবে সর্বময় ক্ষমতা লাভ করেছিলেন মনিরুজ্জামান।
বিভিন্ন সময় বিমানের চেয়ারম্যান কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কোনো বিষয়ে আপত্তি জানালে বা বাধা সৃষ্টি করলে সরাসরি শেখ সেলিমকে দিয়ে ফোন করাতেন খান মনিরুজ্জামান। এভাবেই নিয়ম ভেঙে একের পর এক প্রশাসনিক সুবিধা আদায় করতেন তিনি।
নজিরবিহীন পদোন্নতি: কেবিন ক্রু থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা
মনিরুজ্জামান ছিলেন বিমানের ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের গ্রুপ চার শ্রেণির একজন কেবিন ক্রু। ১৯৯৪ সালে তিনি চাকরিতে যোগদান করেন। বিমানে ইতিহাসে এই প্রথম কোনো কেবিন ক্রু প্রশাসনিক পদে উন্নীত হন।
ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে। তাঁকে প্রশাসনিক দায়িত্বে বসানোর জন্য ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগে কৌশলে গ্রুপ ৫ শ্রেণির একটি পদ শূন্য দেখানো হয়। পরে একটি প্রশাসনিক আদেশ জারি করে বলা হয়, আন্ত: বিভাগের (ফ্লাইট সার্ভিস) কর্মীরা এই পদে অগ্রাধিকার পাবেন এবং গ্রুপ ৪ এর কর্মীরা গ্রুপ ৫ এ পদোন্নতির সুযোগ পাবেন।
এর আগেই মনিরুজ্জামানের পথ সুগম করতে তাকেসহ ১০১ জন ক্রেবিন ক্রুকে শর্ত সাপেক্ষে পদোন্নতি দিয়ে গ্রুপ ৪ থেকে গ্রুপ ৫ এ উন্নীত করা হয়।
এই বিশেষ আদেশের সুবিধা নিয়েই মনিরুজ্জামান ওই প্রশাসনিক পদে নিয়োগ পান। তাঁর এই পদোন্নতির পেছনে তৎকালীন এমডি ক্যাপ্টেন নাসের ও শেখ সেলিমের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি ছিলো চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ভয়ে কেউ এ বিষয়ে প্রতিবাদ করেননি।
একের পর এক পদোন্নতি
প্রশাসনিক দায়িত্ব পাওয়ার পর মনিরুজ্জামান একের পর এক পদোন্নতি পেতে থাকেন। দ্রুতই তিনি গ্রুপ ৮ গ্রেডভুক্ত ‘ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম)’ পদে উন্নীত হন। এমনকি তিনি গ্রুপ ৯ গ্রেডের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) হওয়ার দৌড়েও এগিয়ে যান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। পরিস্থিতির চাপে দেশ ত্যাগ করেন শেখ সেলিম। তার পৃষ্ঠপোষকতা হারালেও পতন হয়নি মনিরুজ্জামানের।
ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগ থেকে সরিয়ে তাঁকে বদলি করা হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ‘প্রকিউরমেন্ট’-এ। আর এ পদের সুবাদে বিমানের যাবতীয় কেনাকাটায় নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার পক্রিয়া বজায় রেখেছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে খান মনিরুজ্জামান বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, তার পদোন্নতিতে হিংসা করে অনেকেই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ায় তিনি শেখ সেলিমকে চেনেন। তবে উল্লেখ করার মতো সম্পর্ক তাদের না। তিনি নিয়ম অনুযায়িই পদোন্নতি পেয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোঃ সাফিকুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।
ক্ষমতাবান এই কর্মকর্তার রয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট, জমি, বাড়ি। গোপালগঞ্জের নিজ এলাকায়ও গড়েছেন অঢেল সম্পৃত্তি। স্বামীর ক্ষমতাকে পুঁজি করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তার কেবিন ক্রু স্ত্রী জিন্নাত আরা ফেরদৌসিও।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কুর্মিটোলা প্রধান কার্যালয়ে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। সেদিন এমডিসহ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করে বঞ্চিত কর্মীরা। আন্দোলনে যারা ক্ষোভের মুখে পড়েন, মনিরুজ্জামান খাঁন ছিলেন তাঁদের অন্যতম।
তার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে অর্থ সহায়তার অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, মনিরুজ্জামান খাঁন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী ঘরানার বিভিন্ন সংগঠন ও কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা দিয়ে এসেছেন।
গত বছর উত্তরা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনেও তিনি অর্থ সহায়তা দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। সরকার পতনের পর তাঁর বিরুদ্ধে গুলশান থানায় একটি মামলাও হয়। মামলার নম্বর: CR 4448/2024 (Ghulshan)।
আরো পড়তে পারেন





































