ঢাকা ১১:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঋতুস্রাবের বয়স নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৩:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫
  • / 1287

ঋতুস্রাবের বয়স নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা। ( প্রতিকী ছবি)

ঋতুস্রাব বা মাসিক নারীদের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় চক্র। এটি নারীর প্রজননক্ষমতা, হরমোনের ভারসাম্য এবং শারীরিক সুস্থতার অন্যতম চিহ্ন। সাধারণত ৯ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে মেয়েদের প্রথম ঋতুস্রাব (যাকে মেনার্ক বলা হয়) শুরু হয় এবং এটি প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। তবে সমাজে এখনও ঋতুস্রাব শুরুর বয়স এবং বন্ধ হওয়ার বয়স নিয়ে নানা ধরনের ভুল ধারণা, কুসংস্কার এবং সামাজিক চাপ বিরাজ করছে।

ভুল ধারণা ১: সময়ের আগে মাসিক শুরু হওয়া মানেই ‘খারাপ’ মেয়ে

আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, কোনো মেয়ের ৯ বা ১০ বছর বয়সেই ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হলে তাকে নিয়ে কানাঘুষা হয়। বলা হয়, সে ‘অস্বাভাবিক’, ‘বয়সের আগেই বড় হয়ে গেছে’, এমনকি চরিত্র নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। এই ধরনের মন্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ক্ষতিকর।

বাস্তবতা হলো, বর্তমান পুষ্টি, পরিবেশ, হরমোনের পরিবর্তন এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক মেয়ের মাসিক ৯ বা ১০ বছরেই শুরু হতে পারে, যা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। এটি শরীরের স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তনের একটি অংশ।

ভুল ধারণা ২: দেরিতে মাসিক শুরু মানেই মেয়ের ‘দোষ’

আরেকটি প্রচলিত ভুল হলো, ১৫ বা ১৬ বছরেও যদি কোনো মেয়ের মাসিক না হয়, তাহলে বলা হয় সে দুর্বল, অপুষ্ট বা তার ‘মেয়েলি’ কিছু একটা সমস্যা আছে। কেউ কেউ একে অলৌকিক কিছু বা ‘জাদু-টোনার’ ফল বলে ধরে নেন।

বৈজ্ঞানিকভাবে, মাসিক শুরু হওয়ার স্বাভাবিক বয়স ৯ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। কেউ কেউ একটু দেরিতে শুরু করতেই পারেন। এটি অনেক সময় পরিবারে মা বা বোনের ঋতুস্রাব শুরুর বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত হয় (জেনেটিক)। তবে ১৬ বছরের পরও মাসিক না হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মাসিক বন্ধ হওয়ার বয়স নিয়ে ভুল ধারণা

ভুল ধারণা ৩: ৩০ পেরোলেই নারীর প্রজননক্ষমতা শেষ

অনেক সমাজে এখনও ধারণা আছে যে, ৩০ বছর পার হলে নারীর প্রজনন ক্ষমতা একেবারে শেষ হয়ে যায় বা মাসিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ কারণে অনেক নারীকে অকারণে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার জন্য সামাজিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

বাস্তবে, নারীর প্রজনন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসলেও, মাসিক সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সে বন্ধ হয়, যাকে মেনোপজ বলা হয়। তার আগ পর্যন্ত একজন নারী সন্তান ধারণে সক্ষম থাকতে পারেন। বয়স ৩০ পেরোলেই গর্ভধারণ অসম্ভব—এ ধারণা স্রেফ অজ্ঞতা।

ভুল ধারণা ৪: মেনোপজ মানেই নারীর জীবন শেষ

ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়া বা মেনোপজ নিয়ে প্রচুর ভুল তথ্য প্রচলিত। অনেকেই মনে করেন, মেনোপজের পর নারীর গুরুত্ব বা নারীত্ব আর থাকে না। এমন ধারণা থেকে নারীদের অবহেলা করা হয়, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থাকে।

অথচ মেনোপজ নারীর জীবনের একটি নতুন অধ্যায়। এই সময় নারীদের শরীরে হরমোনজনিত কিছু পরিবর্তন ঘটে— যেমন হট ফ্ল্যাশ, ঘুমের সমস্যা, হাড় দুর্বল হওয়া ইত্যাদি। কিন্তু সঠিক খাদ্য, শরীরচর্চা এবং চিকিৎসার মাধ্যমে তারা এই সময়টিও সুস্থভাবে কাটাতে পারেন।

ভুল ধারণার প্রভাব

ঋতুস্রাবের বয়স নিয়ে ভুল ধারণাগুলো মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। অল্প বয়সে মাসিক শুরু হলে অনেক মেয়ে লজ্জা পায়, আত্মবিশ্বাস হারায়। দেরিতে মাসিক হলে পরিবার বা সমাজের কটূক্তিতে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। একইভাবে, বয়স বাড়লে অনেক নারী নিজেকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ভাবতে শুরু করেন।

এসব ভুল ধারণা নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মজীবনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তারা চিকিৎসা নিতে দ্বিধা বোধ করেন, নিজেদের শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ে লজ্জিত হন।

সমাধান ও করণীয়

১. সঠিক স্বাস্থ্য শিক্ষা: বিদ্যালয়গুলোতে স্বাস্থ্য ও যৌন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যেখানে বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন সম্পর্কে ছেলেমেয়েরা খোলামেলা ও বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান পাবে।

২. অভিভাবকদের সচেতনতা: বাবা-মাকে সচেতন করতে হবে যাতে তারা সন্তানের শারীরিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন এবং ভুল ধারণা ছড়াতে না দেন।

৩. মিডিয়ার ভূমিকা: টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যম এবং পত্রপত্রিকায় সচেতনতামূলক প্রচার চালানো যেতে পারে, যেখানে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন।

৪. চিকিৎসা সহায়তা সহজলভ্য করা: মাসিকের বয়সজনিত যেকোনো সমস্যা নিয়ে যেন সহজে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যায়, সেজন্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলিকে সক্রিয় হতে হবে।

ঋতুস্রাবের বয়স নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো নারীকে সংকুচিত করে রাখে, কুসংস্কারকে উৎসাহিত করে এবং নারীর শরীর নিয়ে এক ধরনের অজ্ঞতা তৈরি করে। এ ধরনের ভুল ধারণা দূর করতে হলে দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, পারিবারিক সহানুভূতি এবং সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন। ঋতুস্রাব কোনো লজ্জার নয়, বরং এটি নারীর শক্তি ও সক্ষমতার প্রতীক—এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিতে হবে সর্বত্র।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ঋতুস্রাবের বয়স নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৩:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫

ঋতুস্রাব বা মাসিক নারীদের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় চক্র। এটি নারীর প্রজননক্ষমতা, হরমোনের ভারসাম্য এবং শারীরিক সুস্থতার অন্যতম চিহ্ন। সাধারণত ৯ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে মেয়েদের প্রথম ঋতুস্রাব (যাকে মেনার্ক বলা হয়) শুরু হয় এবং এটি প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। তবে সমাজে এখনও ঋতুস্রাব শুরুর বয়স এবং বন্ধ হওয়ার বয়স নিয়ে নানা ধরনের ভুল ধারণা, কুসংস্কার এবং সামাজিক চাপ বিরাজ করছে।

ভুল ধারণা ১: সময়ের আগে মাসিক শুরু হওয়া মানেই ‘খারাপ’ মেয়ে

আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, কোনো মেয়ের ৯ বা ১০ বছর বয়সেই ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হলে তাকে নিয়ে কানাঘুষা হয়। বলা হয়, সে ‘অস্বাভাবিক’, ‘বয়সের আগেই বড় হয়ে গেছে’, এমনকি চরিত্র নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। এই ধরনের মন্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ক্ষতিকর।

বাস্তবতা হলো, বর্তমান পুষ্টি, পরিবেশ, হরমোনের পরিবর্তন এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক মেয়ের মাসিক ৯ বা ১০ বছরেই শুরু হতে পারে, যা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। এটি শরীরের স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তনের একটি অংশ।

ভুল ধারণা ২: দেরিতে মাসিক শুরু মানেই মেয়ের ‘দোষ’

আরেকটি প্রচলিত ভুল হলো, ১৫ বা ১৬ বছরেও যদি কোনো মেয়ের মাসিক না হয়, তাহলে বলা হয় সে দুর্বল, অপুষ্ট বা তার ‘মেয়েলি’ কিছু একটা সমস্যা আছে। কেউ কেউ একে অলৌকিক কিছু বা ‘জাদু-টোনার’ ফল বলে ধরে নেন।

বৈজ্ঞানিকভাবে, মাসিক শুরু হওয়ার স্বাভাবিক বয়স ৯ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। কেউ কেউ একটু দেরিতে শুরু করতেই পারেন। এটি অনেক সময় পরিবারে মা বা বোনের ঋতুস্রাব শুরুর বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত হয় (জেনেটিক)। তবে ১৬ বছরের পরও মাসিক না হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মাসিক বন্ধ হওয়ার বয়স নিয়ে ভুল ধারণা

ভুল ধারণা ৩: ৩০ পেরোলেই নারীর প্রজননক্ষমতা শেষ

অনেক সমাজে এখনও ধারণা আছে যে, ৩০ বছর পার হলে নারীর প্রজনন ক্ষমতা একেবারে শেষ হয়ে যায় বা মাসিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ কারণে অনেক নারীকে অকারণে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার জন্য সামাজিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

বাস্তবে, নারীর প্রজনন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসলেও, মাসিক সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সে বন্ধ হয়, যাকে মেনোপজ বলা হয়। তার আগ পর্যন্ত একজন নারী সন্তান ধারণে সক্ষম থাকতে পারেন। বয়স ৩০ পেরোলেই গর্ভধারণ অসম্ভব—এ ধারণা স্রেফ অজ্ঞতা।

ভুল ধারণা ৪: মেনোপজ মানেই নারীর জীবন শেষ

ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়া বা মেনোপজ নিয়ে প্রচুর ভুল তথ্য প্রচলিত। অনেকেই মনে করেন, মেনোপজের পর নারীর গুরুত্ব বা নারীত্ব আর থাকে না। এমন ধারণা থেকে নারীদের অবহেলা করা হয়, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থাকে।

অথচ মেনোপজ নারীর জীবনের একটি নতুন অধ্যায়। এই সময় নারীদের শরীরে হরমোনজনিত কিছু পরিবর্তন ঘটে— যেমন হট ফ্ল্যাশ, ঘুমের সমস্যা, হাড় দুর্বল হওয়া ইত্যাদি। কিন্তু সঠিক খাদ্য, শরীরচর্চা এবং চিকিৎসার মাধ্যমে তারা এই সময়টিও সুস্থভাবে কাটাতে পারেন।

ভুল ধারণার প্রভাব

ঋতুস্রাবের বয়স নিয়ে ভুল ধারণাগুলো মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। অল্প বয়সে মাসিক শুরু হলে অনেক মেয়ে লজ্জা পায়, আত্মবিশ্বাস হারায়। দেরিতে মাসিক হলে পরিবার বা সমাজের কটূক্তিতে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। একইভাবে, বয়স বাড়লে অনেক নারী নিজেকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ভাবতে শুরু করেন।

এসব ভুল ধারণা নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মজীবনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তারা চিকিৎসা নিতে দ্বিধা বোধ করেন, নিজেদের শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ে লজ্জিত হন।

সমাধান ও করণীয়

১. সঠিক স্বাস্থ্য শিক্ষা: বিদ্যালয়গুলোতে স্বাস্থ্য ও যৌন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যেখানে বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন সম্পর্কে ছেলেমেয়েরা খোলামেলা ও বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান পাবে।

২. অভিভাবকদের সচেতনতা: বাবা-মাকে সচেতন করতে হবে যাতে তারা সন্তানের শারীরিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন এবং ভুল ধারণা ছড়াতে না দেন।

৩. মিডিয়ার ভূমিকা: টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যম এবং পত্রপত্রিকায় সচেতনতামূলক প্রচার চালানো যেতে পারে, যেখানে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন।

৪. চিকিৎসা সহায়তা সহজলভ্য করা: মাসিকের বয়সজনিত যেকোনো সমস্যা নিয়ে যেন সহজে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যায়, সেজন্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলিকে সক্রিয় হতে হবে।

ঋতুস্রাবের বয়স নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো নারীকে সংকুচিত করে রাখে, কুসংস্কারকে উৎসাহিত করে এবং নারীর শরীর নিয়ে এক ধরনের অজ্ঞতা তৈরি করে। এ ধরনের ভুল ধারণা দূর করতে হলে দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, পারিবারিক সহানুভূতি এবং সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন। ঋতুস্রাব কোনো লজ্জার নয়, বরং এটি নারীর শক্তি ও সক্ষমতার প্রতীক—এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিতে হবে সর্বত্র।