ঢাকা ০২:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাতে নিহত ১২ জন

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:৪১:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
  • / 265

থাই- কম্বোডিয়া যুদ্ধ

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার বিবাদপূর্ণ সীমান্তে সামরিক সংঘাতে কমপক্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলমান বিরোধের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলেছে এই সাম্প্রতিক সংঘর্ষ।

থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হতাহতদের বেশিরভাগই দেশটির তিনটি প্রদেশের বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে, এই সংঘর্ষে হতাহতের বিষয়ে কম্বোডিয়া এখনো কিছু জানায়নি।

দুই পক্ষের মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে গুলি বিনিময় হয়। উভয় পক্ষই দাবি করেছে যে অপর পক্ষ প্রথমে গুলি চালিয়েছে।

একদিকে থাইল্যান্ড অভিযোগ করেছে কম্বোডিয়া তাদের লক্ষ্য করে রকেট নিক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে, কম্বোডিয়া অভিযোগ করেছে ব্যাংকক তাদের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালাচ্ছে।

এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি দ্রুত আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সঙ্গে তার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। সামরিক বাহিনী “অতিরিক্ত বল প্রয়োগ” করছে—এই অভিযোগ এনে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রায় অবনমন ঘটিয়েছে কম্বোডিয়া।

দুই দেশই সীমান্তের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে নিজেদের নাগরিকদের অন্যত্র সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। থাইল্যান্ড ইতোমধ্যে ৪০ হাজার বেসামরিক নাগরিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।

কম্বোডিয়া সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের বুরিরাম প্রদেশের বান দান জেলার স্থানীয় বাসিন্দা সুতিয়ান ফিওচান বিবিসিকে বলেন, “(সংঘর্ষ) সত্যিই গুরুতর। আমরা এলাকা ফাঁকা করে দিচ্ছি।”

থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাত
থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাত

থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই পক্ষের এই সামরিক সংঘর্ষের জেরে সুরিন, উবোন রাতচাথানি ও শ্রীসাকেত প্রদেশে আট বছর বয়সী এক শিশু, ১৫ বছরের একজন কিশোরসহ মোট ১১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং এক সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে।

সাম্প্রতিকতম ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ দিয়েছে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া।

থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এনএসসি) বা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ দাবি করেছে, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার পর কম্বোডিয়ার সামরিক বাহিনী সীমান্তের কাছে থাই সেনাদের ওপর নজরদারি চালাতে ড্রোন মোতায়েন করে।

এর কিছুক্ষণ পরেই কম্বোডিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রকেটচালিত গ্রেনেড নিয়ে সীমান্তের কাছে জড়ো হয়।

এই পরিস্থিতিতে থাই সৈন্যরা চিৎকার করে আলাপ-আলোচনার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়।

এনএসসির মুখপাত্র জানিয়েছেন, কম্বোডিয়ার সৈন্যরা আটটা বেজে কুড়ি মিনিট নাগাদ তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এর পাল্টা জবাব দিতে বাধ্য হয় থাই সামরিক বাহিনী।

থাইল্যান্ডের অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে বিএম-২১ রকেট লঞ্চার এবং আর্টিলারিসহ মোতায়েন করা ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছিল কম্বোডিয়া। এর ফলে সীমান্তের থাই পক্ষে অবস্থিত একটি হাসপাতাল, একটি পেট্রোল স্টেশনসহ বাড়িঘর এবং সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার পাল্টা দাবি, সংঘর্ষের সূত্রপাত করেছে থাই সৈন্যরা। তারা জানিয়েছে, সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে সীমান্তের কাছে একটি খেমার-হিন্দু মন্দিরের দিকে অগ্রসর হয় এবং তার চারপাশে কাঁটাতার স্থাপন করে পূর্বের চুক্তি লঙ্ঘন করে থাই সেনাবাহিনী।

কম্বোডিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যালি সোচিতা জানিয়েছেন, সকাল সাতটার পর থাই সেনারা একটি ড্রোন মোতায়েন করে এবং সকাল সাড়ে আটটার দিকে “শূন্যে গুলি” ছোড়ে।

তাকে উদ্ধৃত করে নম পেন পোস্ট সংবাদপত্র লিখেছে, ৮টা ৪৬ মিনিটে থাই সৈন্যরা “প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে” কম্বোডিয়ান সৈন্যদের ওপর গুলি চালায়। তাদের কাছে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

ম্যালি সোচিতা থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন, ভারী অস্ত্র ব্যবহার এবং কম্বোডিয়ার ভূখণ্ডে বিমান হামলার পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন।

থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাত
থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাত

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সংঘর্ষের কারণ

দুই দেশের মধ্যে এই বিরোধ একশো বছরেরও বেশি পুরনো। কম্বোডিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের পর এই সীমান্ত তৈরি হয়।

তবে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠে ২০০৮ সালে, যখন কম্বোডিয়া বিতর্কিত এলাকায় অবস্থিত একাদশ শতাব্দীর একটি মন্দিরকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে নিবন্ধিত করার চেষ্টা করে। থাইল্যান্ড এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিরোধের জেরে উভয় দেশের সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে সময়ে সময়ে সংঘর্ষ হয়েছে এবং প্রাণহানিও ঘটেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে, গত মে মাসে সংঘর্ষে কম্বোডিয়ার এক সেনার মৃত্যুর পর থেকে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ফলে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গত দুই মাসে দুই দেশই একে অন্যের বিরুদ্ধে সীমান্তসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কম্বোডিয়া থাইল্যান্ড থেকে ফল ও সবজি আমদানি নিষিদ্ধ করেছে এবং বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পরিষেবা আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে।

সম্প্রতি উভয় দেশই সীমান্তে নিজেদের সেনা উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে।

সংঘাত কোন দিকে এগোচ্ছে?

থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই জানিয়েছেন, কম্বোডিয়ার সঙ্গে তাদের বিরোধ একটি ‘সংবেদনশীল’ বিষয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এবং সতর্কতার সঙ্গে এর সমাধান করতে হবে।

কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত জানিয়েছেন, তার দেশ শান্তিপূর্ণভাবে এই বিরোধের সমাধান করতে চায়। তবে তিনি এটাও বলেছেন যে “সশস্ত্র আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র শক্তি দিয়ে জবাব দেওয়া” ছাড়া তাদের “আর কোনো বিকল্প নেই”।

দুই দেশের মধ্যে গুরুতর গুলি বিনিময় আপাতত হ্রাস পেয়েছে।

বর্তমান সংঘর্ষ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও, উভয় দেশেই এই সংঘাত থেকে সরে আসার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্বের অভাব রয়েছে।

থাইল্যান্ডের পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা
থাইল্যান্ডের পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা

হুন মানেত এমন একজন ব্যক্তি যিনি এখনো নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তিনি একজন প্রাক্তন প্রভাবশালী শাসক হুন সেনের পুত্র, যিনি জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে পুঁজি করে এই সংঘর্ষ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, থাইল্যান্ডে একটি নড়বড়ে জোট সরকার রয়েছে, যার পেছনে রয়েছেন আরেক সাবেক প্রভাবশালী নেতা থাকসিন সিনাওয়াত্রা।

থাকসিন মনে করতেন, হুন সেন ও তার পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এক ব্যক্তিগত কথোপকথন ফাঁসের ঘটনায় হুন সেনের পক্ষ থেকে তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই কথোপকথন ফাঁস হওয়ার পরই তার মেয়ে পাইতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাতে নিহত ১২ জন

সর্বশেষ আপডেট ১০:৪১:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার বিবাদপূর্ণ সীমান্তে সামরিক সংঘাতে কমপক্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলমান বিরোধের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলেছে এই সাম্প্রতিক সংঘর্ষ।

থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হতাহতদের বেশিরভাগই দেশটির তিনটি প্রদেশের বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে, এই সংঘর্ষে হতাহতের বিষয়ে কম্বোডিয়া এখনো কিছু জানায়নি।

দুই পক্ষের মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে গুলি বিনিময় হয়। উভয় পক্ষই দাবি করেছে যে অপর পক্ষ প্রথমে গুলি চালিয়েছে।

একদিকে থাইল্যান্ড অভিযোগ করেছে কম্বোডিয়া তাদের লক্ষ্য করে রকেট নিক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে, কম্বোডিয়া অভিযোগ করেছে ব্যাংকক তাদের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালাচ্ছে।

এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি দ্রুত আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সঙ্গে তার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। সামরিক বাহিনী “অতিরিক্ত বল প্রয়োগ” করছে—এই অভিযোগ এনে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রায় অবনমন ঘটিয়েছে কম্বোডিয়া।

দুই দেশই সীমান্তের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে নিজেদের নাগরিকদের অন্যত্র সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। থাইল্যান্ড ইতোমধ্যে ৪০ হাজার বেসামরিক নাগরিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।

কম্বোডিয়া সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের বুরিরাম প্রদেশের বান দান জেলার স্থানীয় বাসিন্দা সুতিয়ান ফিওচান বিবিসিকে বলেন, “(সংঘর্ষ) সত্যিই গুরুতর। আমরা এলাকা ফাঁকা করে দিচ্ছি।”

থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাত
থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাত

থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই পক্ষের এই সামরিক সংঘর্ষের জেরে সুরিন, উবোন রাতচাথানি ও শ্রীসাকেত প্রদেশে আট বছর বয়সী এক শিশু, ১৫ বছরের একজন কিশোরসহ মোট ১১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং এক সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে।

সাম্প্রতিকতম ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ দিয়েছে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া।

থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এনএসসি) বা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ দাবি করেছে, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার পর কম্বোডিয়ার সামরিক বাহিনী সীমান্তের কাছে থাই সেনাদের ওপর নজরদারি চালাতে ড্রোন মোতায়েন করে।

এর কিছুক্ষণ পরেই কম্বোডিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রকেটচালিত গ্রেনেড নিয়ে সীমান্তের কাছে জড়ো হয়।

এই পরিস্থিতিতে থাই সৈন্যরা চিৎকার করে আলাপ-আলোচনার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়।

এনএসসির মুখপাত্র জানিয়েছেন, কম্বোডিয়ার সৈন্যরা আটটা বেজে কুড়ি মিনিট নাগাদ তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এর পাল্টা জবাব দিতে বাধ্য হয় থাই সামরিক বাহিনী।

থাইল্যান্ডের অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে বিএম-২১ রকেট লঞ্চার এবং আর্টিলারিসহ মোতায়েন করা ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছিল কম্বোডিয়া। এর ফলে সীমান্তের থাই পক্ষে অবস্থিত একটি হাসপাতাল, একটি পেট্রোল স্টেশনসহ বাড়িঘর এবং সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার পাল্টা দাবি, সংঘর্ষের সূত্রপাত করেছে থাই সৈন্যরা। তারা জানিয়েছে, সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে সীমান্তের কাছে একটি খেমার-হিন্দু মন্দিরের দিকে অগ্রসর হয় এবং তার চারপাশে কাঁটাতার স্থাপন করে পূর্বের চুক্তি লঙ্ঘন করে থাই সেনাবাহিনী।

কম্বোডিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যালি সোচিতা জানিয়েছেন, সকাল সাতটার পর থাই সেনারা একটি ড্রোন মোতায়েন করে এবং সকাল সাড়ে আটটার দিকে “শূন্যে গুলি” ছোড়ে।

তাকে উদ্ধৃত করে নম পেন পোস্ট সংবাদপত্র লিখেছে, ৮টা ৪৬ মিনিটে থাই সৈন্যরা “প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে” কম্বোডিয়ান সৈন্যদের ওপর গুলি চালায়। তাদের কাছে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

ম্যালি সোচিতা থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন, ভারী অস্ত্র ব্যবহার এবং কম্বোডিয়ার ভূখণ্ডে বিমান হামলার পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন।

থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাত
থাই- কম্বোডিয়া সীমান্তে সামরিক সংঘাত

থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সংঘর্ষের কারণ

দুই দেশের মধ্যে এই বিরোধ একশো বছরেরও বেশি পুরনো। কম্বোডিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের পর এই সীমান্ত তৈরি হয়।

তবে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠে ২০০৮ সালে, যখন কম্বোডিয়া বিতর্কিত এলাকায় অবস্থিত একাদশ শতাব্দীর একটি মন্দিরকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে নিবন্ধিত করার চেষ্টা করে। থাইল্যান্ড এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিরোধের জেরে উভয় দেশের সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে সময়ে সময়ে সংঘর্ষ হয়েছে এবং প্রাণহানিও ঘটেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে, গত মে মাসে সংঘর্ষে কম্বোডিয়ার এক সেনার মৃত্যুর পর থেকে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ফলে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গত দুই মাসে দুই দেশই একে অন্যের বিরুদ্ধে সীমান্তসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কম্বোডিয়া থাইল্যান্ড থেকে ফল ও সবজি আমদানি নিষিদ্ধ করেছে এবং বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পরিষেবা আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে।

সম্প্রতি উভয় দেশই সীমান্তে নিজেদের সেনা উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে।

সংঘাত কোন দিকে এগোচ্ছে?

থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই জানিয়েছেন, কম্বোডিয়ার সঙ্গে তাদের বিরোধ একটি ‘সংবেদনশীল’ বিষয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এবং সতর্কতার সঙ্গে এর সমাধান করতে হবে।

কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত জানিয়েছেন, তার দেশ শান্তিপূর্ণভাবে এই বিরোধের সমাধান করতে চায়। তবে তিনি এটাও বলেছেন যে “সশস্ত্র আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র শক্তি দিয়ে জবাব দেওয়া” ছাড়া তাদের “আর কোনো বিকল্প নেই”।

দুই দেশের মধ্যে গুরুতর গুলি বিনিময় আপাতত হ্রাস পেয়েছে।

বর্তমান সংঘর্ষ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও, উভয় দেশেই এই সংঘাত থেকে সরে আসার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্বের অভাব রয়েছে।

থাইল্যান্ডের পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা
থাইল্যান্ডের পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা

হুন মানেত এমন একজন ব্যক্তি যিনি এখনো নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তিনি একজন প্রাক্তন প্রভাবশালী শাসক হুন সেনের পুত্র, যিনি জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে পুঁজি করে এই সংঘর্ষ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, থাইল্যান্ডে একটি নড়বড়ে জোট সরকার রয়েছে, যার পেছনে রয়েছেন আরেক সাবেক প্রভাবশালী নেতা থাকসিন সিনাওয়াত্রা।

থাকসিন মনে করতেন, হুন সেন ও তার পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এক ব্যক্তিগত কথোপকথন ফাঁসের ঘটনায় হুন সেনের পক্ষ থেকে তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই কথোপকথন ফাঁস হওয়ার পরই তার মেয়ে পাইতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

সূত্র: বিবিসি বাংলা