ঢাকা ০২:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মিরপুরে এক কলেজ অধ্যক্ষের নামে একগুচ্ছ দুর্নীতির অভিযোগ

এস এম আর শহিদ
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৮:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ জুলাই ২০২৫
  • / 1039

কলেজ অধ্যক্ষ মোঃ আনোয়ার হোসাইন

রাজধানীর মিরপুর ডেভেলপমেন্ট কমিটি (এম.ডি.সি) মডেল স্কুল এন্ড কলেজ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। মোঃ আনোয়ার হোসাইন নামের ওই শিক্ষক আওয়ামী লীগ সমর্থিত ‘স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ’-এর পল্লবী শাখার সভাপতি ছিলেন। সেই প্রভাবে নিজের খেয়াল-খুশি মতো চালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এই শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ভবনের নকশা পরিবর্তন করে দ্বিতীয় তলায় নিজের বাসস্থান তৈরি করেছেন। সেখানেই তিনি স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন।

বাসস্থানের জন্য আলাদা সিঁড়ি, গেইট, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ নিয়েছেন। আর এ কাজে বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এই টাকায় তিনি নিজের বাসার জন্য এসি লাগিয়েছেন; ডেকোরেশনও করেছেন।

শুধু তাই না; ওই বাসায় ওঠার দুই মাস পর্যন্ত তিনি বেতনের সাথে বাড়ি ভাড়াও ভোগ করেছেন। এ নিয়ে শিক্ষকদের মাঝে প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে তিনি বাসা ভাড়া উত্তোলন বন্ধ করে দেন।

অভিযোগ রয়েছে, একাডেমিক ভবনে বাসা হওয়ায় এখন আর আগের মতো তাকে রুমে পাওয়া যায় না। পরিবার নিয়েই বেশি সময় ব্যস্ত থাকেন তিনি।

ক্ষমতা পেয়ে এই অধ্যক্ষ আপন ভাগ্নে সজিব হাসানকে ‘কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর’ হিসেবে চাকুরি দেন। লোক দেখানো একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও দেন। কিন্তু অপর প্রার্থী কারা ছিলেন কিংবা তাদের প্রাপ্ত ফলাফল কতো ছিলো তা জানতে চাইলে কোন প্রমান দেখাতে পারেননি আনোয়ার হোসেন।

এখানেই শেষ না। ভাগ্নেকে যে পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেটি তৃতীয় শ্রেনীর অর্থাৎ ১৬ গ্রেডের একটি পদ। নিয়ম অনুযায়ি তার বেতন হওয়ার কথা নয় হাজার ৮শ’ টাকা। কিন্তু বিধি বহির্ভূতভাবে ইচ্ছেমত ইনক্রিমেন্ট যোগ করে তার বেতন ধরা হয় বার হাজার টাকা বেসিক।

কয়েক মাস না ঘুরতেই শিক্ষানবীশ এই ভাগ্নেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কলেজের ‘প্রদর্শক’ করা হয়। আর এই পদের জন্যও দেয়া হতো অতিরিক্ত সম্মানী।

স্থানীয় সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা ও আ’লী নেতাদের সাথে অধ্যক্ষ আনোয়ার
স্থানীয় সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা ও আ’লী নেতাদের সাথে অধ্যক্ষ আনোয়ার। ছবি- সংগৃহীত

অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডের নির্দেশনা ভঙ্গ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোচিং এর নামে পরীক্ষার্থী প্রতি প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পৃথক রশিদের মাধ্যমে উত্তোলন করতেন। যা জমা রাখা হতো শ্রেণি শিক্ষকের নিকট। তিনি কোচিং ফি’র পুরো টাকাই আলাদা এ্যাকাউন্ট-এ জমা রাখেন। এভাবে তিনি প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত নিয়ে থাকেন। তিনি কোন ক্লাস নেন না কিন্তু কোচিং ক্লাসের রুটিনে তার নামে থাকে সর্বোচ্চ ক্লাস।

বিদ্যালয়ের শ্রেনীকক্ষগুলো প্রায়শ: বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার ভেন্যু হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। এই ভাড়ার ৫০ শতাংশ তিনি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করেন বলেও অভিযোগ আছে।

আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে সহকর্মীদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণেরও অভিযোগ রয়েছে। সিনিয়র শিক্ষক আবুল হোসেনের কাছ থেকে উচ্চতর স্কেল আদায় করে দেয়ার কথা বলে চেক মারফত পঞ্চাশ হাজার এবং রুমানা আক্তার নামে আরেক শিক্ষকের কাছ থেকে বাহাত্তর হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ দেয়নি বলে শিক্ষক জাহিদুল ইসলামের উচ্চতর স্কেলের ফাইল এখনো আটকে আছে। এই ঘটনায় ওই শিক্ষক মামলা করেছেন।

 

গতবছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ভেঙ্গে নতুন আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। যেখানে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে।

নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর রাতারাতি নিজের ভোল্ট পাল্টে ফেলেন এই শিক্ষক। নতুন কমিটিকে সাথে নিয়ে আটজন শিক্ষককে বিধি বর্হিভূতভাবে নিয়োগ দেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি নিয়োগের জন্য দুই লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন। এর আগেও প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় শিক্ষকের মেয়ে এবং পুত্রবধুকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে চার লাখ টাকা নিয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানের সীমানা ঘেষে তৈরি দোকান বরাদ্দ নিয়েও তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্নসাৎ এর অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসাইন বাংলা অ্যাফেয়ার্স’র কাছে দাবি করেন, একটি কুচক্রী মহল তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে ষড়যন্ত্র করছে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।

চলবে …

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মিরপুরে এক কলেজ অধ্যক্ষের নামে একগুচ্ছ দুর্নীতির অভিযোগ

সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৮:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ জুলাই ২০২৫

রাজধানীর মিরপুর ডেভেলপমেন্ট কমিটি (এম.ডি.সি) মডেল স্কুল এন্ড কলেজ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। মোঃ আনোয়ার হোসাইন নামের ওই শিক্ষক আওয়ামী লীগ সমর্থিত ‘স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ’-এর পল্লবী শাখার সভাপতি ছিলেন। সেই প্রভাবে নিজের খেয়াল-খুশি মতো চালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এই শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ভবনের নকশা পরিবর্তন করে দ্বিতীয় তলায় নিজের বাসস্থান তৈরি করেছেন। সেখানেই তিনি স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন।

বাসস্থানের জন্য আলাদা সিঁড়ি, গেইট, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ নিয়েছেন। আর এ কাজে বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এই টাকায় তিনি নিজের বাসার জন্য এসি লাগিয়েছেন; ডেকোরেশনও করেছেন।

শুধু তাই না; ওই বাসায় ওঠার দুই মাস পর্যন্ত তিনি বেতনের সাথে বাড়ি ভাড়াও ভোগ করেছেন। এ নিয়ে শিক্ষকদের মাঝে প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে তিনি বাসা ভাড়া উত্তোলন বন্ধ করে দেন।

অভিযোগ রয়েছে, একাডেমিক ভবনে বাসা হওয়ায় এখন আর আগের মতো তাকে রুমে পাওয়া যায় না। পরিবার নিয়েই বেশি সময় ব্যস্ত থাকেন তিনি।

ক্ষমতা পেয়ে এই অধ্যক্ষ আপন ভাগ্নে সজিব হাসানকে ‘কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর’ হিসেবে চাকুরি দেন। লোক দেখানো একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও দেন। কিন্তু অপর প্রার্থী কারা ছিলেন কিংবা তাদের প্রাপ্ত ফলাফল কতো ছিলো তা জানতে চাইলে কোন প্রমান দেখাতে পারেননি আনোয়ার হোসেন।

এখানেই শেষ না। ভাগ্নেকে যে পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেটি তৃতীয় শ্রেনীর অর্থাৎ ১৬ গ্রেডের একটি পদ। নিয়ম অনুযায়ি তার বেতন হওয়ার কথা নয় হাজার ৮শ’ টাকা। কিন্তু বিধি বহির্ভূতভাবে ইচ্ছেমত ইনক্রিমেন্ট যোগ করে তার বেতন ধরা হয় বার হাজার টাকা বেসিক।

কয়েক মাস না ঘুরতেই শিক্ষানবীশ এই ভাগ্নেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কলেজের ‘প্রদর্শক’ করা হয়। আর এই পদের জন্যও দেয়া হতো অতিরিক্ত সম্মানী।

স্থানীয় সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা ও আ’লী নেতাদের সাথে অধ্যক্ষ আনোয়ার
স্থানীয় সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা ও আ’লী নেতাদের সাথে অধ্যক্ষ আনোয়ার। ছবি- সংগৃহীত

অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডের নির্দেশনা ভঙ্গ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোচিং এর নামে পরীক্ষার্থী প্রতি প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পৃথক রশিদের মাধ্যমে উত্তোলন করতেন। যা জমা রাখা হতো শ্রেণি শিক্ষকের নিকট। তিনি কোচিং ফি’র পুরো টাকাই আলাদা এ্যাকাউন্ট-এ জমা রাখেন। এভাবে তিনি প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত নিয়ে থাকেন। তিনি কোন ক্লাস নেন না কিন্তু কোচিং ক্লাসের রুটিনে তার নামে থাকে সর্বোচ্চ ক্লাস।

বিদ্যালয়ের শ্রেনীকক্ষগুলো প্রায়শ: বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার ভেন্যু হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। এই ভাড়ার ৫০ শতাংশ তিনি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করেন বলেও অভিযোগ আছে।

আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে সহকর্মীদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণেরও অভিযোগ রয়েছে। সিনিয়র শিক্ষক আবুল হোসেনের কাছ থেকে উচ্চতর স্কেল আদায় করে দেয়ার কথা বলে চেক মারফত পঞ্চাশ হাজার এবং রুমানা আক্তার নামে আরেক শিক্ষকের কাছ থেকে বাহাত্তর হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ দেয়নি বলে শিক্ষক জাহিদুল ইসলামের উচ্চতর স্কেলের ফাইল এখনো আটকে আছে। এই ঘটনায় ওই শিক্ষক মামলা করেছেন।

 

গতবছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ভেঙ্গে নতুন আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। যেখানে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে।

নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর রাতারাতি নিজের ভোল্ট পাল্টে ফেলেন এই শিক্ষক। নতুন কমিটিকে সাথে নিয়ে আটজন শিক্ষককে বিধি বর্হিভূতভাবে নিয়োগ দেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি নিয়োগের জন্য দুই লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন। এর আগেও প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় শিক্ষকের মেয়ে এবং পুত্রবধুকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে চার লাখ টাকা নিয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানের সীমানা ঘেষে তৈরি দোকান বরাদ্দ নিয়েও তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্নসাৎ এর অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসাইন বাংলা অ্যাফেয়ার্স’র কাছে দাবি করেন, একটি কুচক্রী মহল তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে ষড়যন্ত্র করছে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।

চলবে …