জমি অধিগ্রহণে জট: বান্দরবানে পলিটেকনিক অনিশ্চিত
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৪৯:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ জুলাই ২০২৫
- / 287
দীর্ঘ আট বছরেও বান্দরবানে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজ এগোয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উপযুক্ত জমি পেলেও কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ও বিরোধিতায় অধিগ্রহণ সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি রাজনৈতিক দলের কিছু ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া থমকে আছে। এ প্রকল্পের মেয়াদ এবছরের ৩০ জুন শেষ হওয়ায় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের সুয়ালক মাঝেরপাড়া এলাকায় একটি জমি পাওয়া যায়। সবদিক বিবেচনা করে জমিটি উপযোগী হওয়ায় জেলা প্রশাসনকে অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় একটি রাজনৈতিক পক্ষ থেকে আপত্তি আসে। সেখানে পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা বাধানোর আশঙ্কাও রাজনৈতিক দলের স্বার্থান্বেষী কিছু মহল উত্থাপন করেছে।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বান্দরবানসহ ২৩টি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য শহরে নাগালে যোগাযোগ সুবিধা সম্পন্ন এবং উপযুক্ত প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশে ৫ একর জমি চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু সেখানে ষড়যন্ত্রের নামে রাজনৈতিক দলের স্বার্থান্বেষী মহল নানা বাধা সৃষ্টি করে। প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হয়ে গেছে। এ পর্যায়ে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু না হওয়ায় বান্দরবানে পলিটেকনিক স্থাপনে প্রকল্প বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
জানা গেছে, প্রকল্পটির ঘোষণার পর ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আওয়ামী লীগের নেতারা আত্মীয়দের জমি অধিগ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করছিলেন। কিন্তু ওই জমি ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য উপযোগী ছিল না। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলাতান্ত্রিক নেতারা পলাতক অথবা মামলায় কারাগারে রয়েছে। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নির্মাণের অধিগ্রহণ ঠিকঠাক থাকলে, এখন আবার অন্য একটি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছেন।
সরেজমিনে প্রস্তাবিত জায়গায় গিয়ে দেখা গেছে, ইনস্টিটিউট স্থাপনের আশপাশে কোন পাড়া-সংলগ্ন এলাকা নেই। চারপাশে পাহাড় রয়েছে এবং আশপাশে বসতি কিংবা ব্যক্তিগত জমিজমা নেই। পূর্বের পলিটেকনিক স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত জায়গা ছিল সুলতানপুর। সেখানে মূল সড়ক থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে নির্মাণে ব্যয় বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়াত কঠিন হবে এবং তিন ফসলী জমির শস্য উৎপাদন ব্যাহত হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, পলিটেকনিক স্থাপনের জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী নেতাদের ষড়যন্ত্রের কারণে জমি অধিগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পলিটেকনিক স্থাপনের জায়গার আশপাশে কোন বসতি নেই। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
স্থানীয় উশৈসিং মারমা ও নাসির উদ্দিন বলেন, শুরুতে ইনস্টিটিউট নিয়ে কারোর আপত্তি ছিল না। কিন্তু গত মার্চে একটি রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে বহিরাগত কিছু নেতাকর্মী জায়গাটি অধিগ্রহণে আপত্তি জানিয়েছে। তারা স্থানীয় লোকজনকে প্রলোভন দেখিয়ে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছেন। যারা আপত্তি জানিয়েছেন তারা কেউই এলাকার বাসিন্দা নয়, সবাই বহিরাগত। মিথ্যে অভিযোগ ও ষড়যন্ত্রের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বাতিল হলে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করা হবে।
প্রস্তাবিত জায়গার মালিক ইদ্রিছ চৌধুরী, শহীদুল আলম, তানজিনা আফরিন বলেন, জমির মালিকরা সবাই শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারী। এলাকার স্বার্থে জায়গাটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের জন্য দিতে রাজি হয়েছেন। এখানে ইনস্টিটিউট হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ হবে।
সুয়ালক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উক্যনু মারমা জানান, প্রস্তাবিত জায়গাটি আশপাশে কোন জনবসতি নেই। পাহাড়িদের পাড়া বা গ্রামও সেখান থেকে অনেক দূরে। জমির মালিকদের একজন আওয়ামী লীগের নেতার বড়ভাই প্রাইমারি শিক্ষক। অন্যান্য অভিযোগের মূল কারণও এটাই। আপত্তি তুলতে উদ্ভুদ্ধকারীরা চান ইনস্টিটিউট সুলতানপুরে তাদের জমিতে স্থাপন হোক।

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কবির হোসাইন বলেন, উপযুক্ত জায়গা না পাওয়া গেলে বান্দরবানে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন সম্ভব হবে না। মাঝেরপাড়া এলাকার জায়গাটি ইনস্টিটিউটের জন্য উপযোগী। সুলতানপুরে প্রস্তাবিত জায়গাটি প্রধান সড়ক থেকে দূরে হওয়ায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়াতে অসুবিধা হবে।
বান্দরবান জেলা শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট হলে এই এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জমি অধিগ্রহণ চূড়ান্ত হলে অবকাঠামো নির্মাণের টেন্ডার আহবান করা হবে। দ্রুত কাজ না হলে প্রকল্প বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফা সুলতানা খান হীরা জানান, তদন্তকালে প্রস্তাবিত জায়গায় উপস্থিত অধিকাংশ লোক কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত জায়গায় পলিটেকনিক স্থাপনের বিরুদ্ধে মত দিয়েছেন। তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন। আমি স্পটে যাদের পেয়েছি তাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দিয়েছি।
বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসএম মনজুরুল হক বলেন, মাঝেরপাড়া প্রস্তাবিত জায়গাটি দেখে সবার পছন্দ হয়েছে। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের জন্য উপযুক্ত জমি। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জমিটি পরিদর্শন করে চূড়ান্ত করলে অধিগ্রহণের কাজ শুরু করা হবে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে জায়গাটি পরিদর্শনের জন্য লিখিত আবেদন করা হয়েছে।


































