রাষ্ট্র ও দল গঠনে নারী নেতৃত্বের বিকল্প নেই
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:৩১:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ জুলাই ২০২৫
- / 319
‘মানুষের অধিকারে/ বঞ্চিত করেছ যারে,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান/
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’
কবিগুরুর অবিনাশী কবিতা দিয়ে শুরু করছি এই কারণে যে, প্রকৃত সময় এসেছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিএনপিকে টেকসই রাজনৈতিক বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নয়, বিপুল জনগোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত এই দলকে দেশের মানুষের স্বার্থে ও চাহিদার কথা বিবেচনা করে সৎ, মেধাবী, পরিশ্রমী, সুশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে সংসদে আনতে হবে।
বিশেষ করে দেশের প্রত্যেকটি জেলায় কমপক্ষে একজন করে সুশিক্ষিত, স্মার্ট তরুণীকে এমপি করার বিষয়টি জরুরি। কারণ, তারা জেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে মেধাবী রাজনৈতিক পরিবারের সুশিক্ষিত নারীদের সরাসরি দলে আনতে সক্ষম হবেন—যা একজন পুরুষ এমপির পক্ষে যথেষ্ট কঠিন।
নারীদের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করলে বিএনপির টেকসই রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
বিগত সময়ে যারা রাজনৈতিকভাবে লড়াই-সংগ্রাম করেও বঞ্চিত রয়েছেন, তাদের বিএনপির রাজনৈতিক মাতৃক্রোড়ে আশ্রয় না দিলে দল সুসংগঠিত হতে পারবে না।
অতীতে কিছু চরিত্রহীন ব্যক্তি, যারা বিএনপির টিকিটে এমপি-মন্ত্রী হয়ে অবৈধ অর্থবৃত্তের পাহাড় গড়ে বেগম খালেদা জিয়া ও আমাদের নেতা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিষবাষ্প ছড়িয়েছেন—তারা দলকে মহাবিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে দল ত্যাগ করে নতুন দল গঠন করেছেন বা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে গোপনে সুবিধা নিয়েছেন।
তাদের পরিবারের সদস্যরা যেন কোনোভাবেই মনোনয়ন না পান, সে বিষয়ে দলের সিনিয়রদের সতর্ক থাকতে হবে। তা না হলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ম্লান হয়ে যাবে।
ভাবনার সময় এসেছে—সামনের নির্বাচনে যদি যথোপযুক্ত ব্যক্তিদের দলীয় মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হই, তাহলে একদিন জনপ্রতিনিধির সংজ্ঞাও পাল্টে যেতে পারে।
সেজন্য সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত, সৎ ও যোগ্যদের নির্বাচনে নিয়ে এসে জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে চিরঞ্জীবী করতে হবে।
মান-সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে এক সময় যারা ত্যাগী, যোগ্য ছিলেন অথচ নির্বাচন করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন—তাদের আজ বেশি প্রয়োজন।
সংগত কারণে আগামী নির্বাচনে সৎ, যোগ্য, পরিশ্রমী, মেধাবী, ত্যাগী, বিনয়ী নেতাকর্মীরা যেন দলীয় মনোনয়ন পান, সেই ব্যবস্থা করা অতিজরুরি। অন্যথায়, পিছিয়ে পড়া বিপুল জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে তারেক জিয়া যে পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন, তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
তাতে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার যে স্বপ্ন বেগম খালেদা জিয়া দেখেছেন, তাতেও প্রধান অন্তরায় সৃষ্টি হতে পারে।
আমার স্বর্গীয় পিতা একরামুল হক প্রতিষ্ঠাকাল থেকে নওগাঁ জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।
সত্তরের দশকে জেনারেল জিয়াউর রহমান নওগাঁ জেলা বিএনপির রাজনীতি সুসংগঠিত করার পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন।
তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মেধা ও মননে সেই কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে করে গেছেন। বাবার হাত ধরেই নওগাঁতে বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছি, যা আমার জীবনের আশীর্বাদ।
আমার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল শিল্পব্যবসার মাধ্যমে, তবে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। সেই সুবাদে জন্মস্থান নওগাঁ, নিজ জেলা বগুড়া ও দেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। ঢাকার অলিগলিতেও ছুটে বেড়িয়েছি।
বিএনপির গ্রামীণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছে। তাদের অভিযোগ-অনুযোগের অন্ত নেই।
মূল অভিযোগ—নেতৃত্বের কোন্দল ও দলের প্রসারের জন্য গ্রাম ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি।
মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে যতটা জেনেছি, তাদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। কারণ হিসেবে তারা বলেছে—ইউনিয়ন, উপজেলা পর্যায়ে কোনো কার্যকর কমিটি নেই; জেলা পর্যায়ে দু–একজনের নাম জানা গেলেও বছরে একবারও তাদের দেখা মেলে না।
তাদের অনুযোগ—আমাদের নেতা দেশে ফিরে যেন প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সুশিক্ষিত, মেধাবী, সৎ, যোগ্য নারীদের রাজনীতি করার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।
বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নেতৃত্বে নারীদের অন্তর্ভুক্তি আজকের সময়ে অপরিহার্য।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, নারী নেতৃত্ব শুধু মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই নয়, বরং টেকসই সমাধানের ভিত্তিও স্থাপন করে। তবুও রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নেতৃত্বে নারীদের উপস্থিতি এখনো খুবই সীমিত।
উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নারী নেতৃত্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, রাষ্ট্র ও দল গঠনে নারী নেতৃত্বের বিকল্প নেই।
বিশিষ্ট নারী নেতৃত্ব শার্লি স্যান্ডবার্গ ২০১৩ সালে টাইম ম্যাগাজিনে বলেছিলেন, ‘বিশ্বের সংসদ সদস্যদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ নারী। করপোরেট খাতে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। এ হার ২০০২ সালের পর খুব একটা বাড়েনি, বরং কিছুটা কমেছে।’
সিএফআর’র উইমেন্স পাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী: জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে আজ মাত্র তিনটি দেশ—রুয়ান্ডা, কিউবা ও নিকারাগুয়া—যেখানে সংসদে নারীরা ৫০ শতাংশের বেশি আসন দখল করে আছেন।
আরও তিনটি দেশ—মেক্সিকো, আন্দোরা ও ইউএই—তাদের আইনসভায় ৫০/৫০ লিঙ্গ সমতা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশে (২০২০) নারী নেতৃত্বের পরিসংখ্যান:
জাতীয় সংসদে ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৬৮ জন নারী। এর মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত আসন এবং ১৮টি সাধারণ আসন।
৭৬ জন সচিবের মধ্যে ৭ জন নারী।
৬৪টি জেলা প্রশাসকের মধ্যে ৭ জন নারী।
৬৪ জন পুলিশ সুপারের মধ্যে ৪ জন নারী।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, নেতৃত্ব তথা সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও অত্যন্ত সীমিত।
নারীদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেই অধিকার আদায়ের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, যখন নারী আন্দোলন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন দাবি করছিল, তখন ২০১৮ সালে এই আসনে মনোনয়নভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি আরও ২৫ বছরের জন্য বহাল রাখা হয়।
এই সিদ্ধান্ত নারীরা সঠিক বলে মনে করেননি। তারা চেয়েছিলেন সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে যেতে।
নারী নেতৃত্ব ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন এখন কেবল সময়ের দাবি নয়, এটি একটি সভ্য জাতির নৈতিক দায়িত্বও বটে।
নারী নেতৃত্ব কেবল সংকট নিরসনে কার্যকর নয়, এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।
আমরা আশাবাদী, তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে নতুন বিএনপি জন্ম নেবে, তাতে নারী নেতৃত্বের যথাযথ প্রসার ঘটবে।
লেখক: শিল্পব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক কর্মী।






































