বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাত হারানো ৫ ব্যক্তি ও কৃত্রিম হাত
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:২৩:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
- / 51
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাত হারিয়েছেন আতিকুল ইসলাম নামে রাজধানী উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সের একটি দোকানের সেলসম্যান। ঢাকার ডেমরার একজন হাফেজ মোহাম্মদ হোসেন, আরিফ হোসেন সাগর নামে একজন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে একটু ব্যতিক্রম ইলেকট্রিশিয়ান মোহাম্মদ নাঈম আর ট্রাক চালক মোহাম্মদ মামুন । তারা দুজনে কর্তব্যরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন।
আতিকুল পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। পরিবারকে একটু আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য দিতে চাকরি নিয়েছিলেন সেলসম্যানের। ফেসবুকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভিডিও ফুটেজ দেখে ওর তারুণ্যও টগবগিয়ে ওঠে। পুলিশ ছাত্রদের দাবি পূরণে বাধা দিতে তাদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে। এটা ও মন থেকে মানতে পারে না। নিয়মিত লেখাপড়া করলে ওতো ছাত্রই হতো। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
গত বছরের ২০২৪ এর ১৬ জুলাইতে তিনিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন। এর দুদিন পরেই আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ক্লান্ত হয়ে ব্রিজের থামের আড়ালে বসে তিনি পানি পান করছিলেন। তাকে পানির বোতল দিয়েছিল একজন ছেলে। তাকে পানি দিয়েই ছেলেটি একটু সামনে এগিয়ে গিয়েছিল। তখনি পুলিশের ছররা গুলি ছেলেটির মাথায় বিদ্ধ হয়। সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অন্যদিকে পুলিশের ছররা ছিটা গুলি আতিকুলের শরীরে বিদ্ধ হয়। শিক্ষার্থীরা তাকে ফার্মেসীতে নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। পরের দিন আবার আন্দোলনে যোগ দেন আতিকুল। ২০ জুলাই মার্কেট খোলে। কাজে যোগ দেন তিনি। কিন্তু দোকানে তার মন টিকে না। মালিককে চা পান করার কথা বলে ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিতে ছুটে যেতেন তিনি । মালিক তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন রাস্তায় গোলাগুলির মধ্যে বের না হতে! মালিকের ফোন পেলে আবার দোকানে ফিরে আসতেন। এভাবেই পরিবার, দোকান মালিককে আড়াল করে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন তিনি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণরত অসংখ্য আহতদের মধ্যে পাঁচ হাতহীন ব্যক্তির গল্প আজো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাদেরই একজন আতিকুল। রাজধানী উত্তরার আজমপুরে বাবা-মায়ের সাথে বসবাস করেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। পৈত্রিক বাড়ি ময়মনসিংহে। বাবা ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী। বাবা-মা, ভাইবোনের সবার আদরের পরিবারের ছোট সদস্য আতিকুলের ডান হাতে গুলিবিদ্ধ হয় গতবছরের ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ১১টার দিকে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথা বলতে গিয়ে আতিকুল ইসলাম (২০) বলেন, আব্বা একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘তুই যদি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে না যাস তাহলে তোকে লাইভে দেখি কিভাবে! আমরা বুঝি আমাদের সন্তানকে চিনি না।’ বাবাকে বলেছিলাম, আমার বন্ধু আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, ওকে আনতে গিয়েছিলাম। এভাবে আব্বাকে ম্যানেজ করেছি। আরেকদিন আরেকটা ভিডিও ফুটেজ দেখে ফেলেছিলেন আব্বা । এরপরও আব্বা-আম্মার কাছে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করিনি। রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স ২২ জুলাই বন্ধ হয়ে যায়। আব্বা-আম্মাকে লুকিয়ে আন্দোলনে ঠিকই যোগ দিতাম। ২৩ জুলাই, ২৭ জুলাই ছিটা গুলিতে আহত হই। গুলিবিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে গুলিবিদ্ধ স্থানে ব্যথা শুরু হতো। ছাত্র ভাইয়েরা দুই আঙ্গুলের টিপ দিয়ে গুলি বের করে দিতেন। এরপর আমার ডান হাতে গুলি লাগে।
তিনি বলেন, প্রথম যখন জানতে পারলাম আমার ডান হাতটা কেটে ফেলতে হবে, নইলে আমি মারা যাবো। আব্বা-আম্মা আমাকে বোঝালেন, ‘আমরা চাইবো না , আমরা বাঁচা থাকা অবস্থায় আমাদের সন্তান মারা যাক। মানুষকি হাত ছাড়া বাঁচে না। অনেক মানুষের তো দুই হাত নেই। হাতটা না ফেলে দিলে ইনফেকশন হয়ে মারা যেতে পারিস।’ আব্বা-আম্মাকে একটা কথাই শুধু বলেছিলাম, আপনারা যা মনে করবেন তাই হবে। নিটোলে আমার অপারেশন হয়।
আতিকুল আরো বলেন, ১৭ ঘণ্টা পরে চিকিৎসা হওয়ায় হাতটা হারিয়েছি। সময় মতো চিকিৎসা হলে হয়তো হাতটা হারাতাম না। আমি যেহেতু জব করি, ডান হাত দিয়ে কাজ করতাম। সেই ডান হাতটাই চলে গেছে। এই জীবনটা কিভাবে কাটাবো! এসব ভেবে ভেঙ্গে পড়ছিলাম, এরপর নিজের মনকে শক্ত করি। মনোবল বাড়াই। একটা হাতই চলে গেছে। আবার ঘুরে দাঁড়াবো। মানুষ আমাদের নিয়ে গর্ব বোধ করছে। দেশের মানুষ হয়তো আমাদেরকে মনে রাখবে। হাত হারানোর যন্ত্রণা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি। যতই ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি। সব তো ভুলে যাওয়া সম্ভব না। পরবর্তী জীবন নিয়ে কি করা যায় সেটা নিয়ে ভাবছি। যেটা গেছে সেটা আর ফিরে পাবো না।
আতিকুল লোক মারফত জানতে পারেন, বাংলাদেশে রোবোলাইফ টেকনোলজি নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। এই প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম হাত বানায়। তিনি তাদের সাথে যোগাযোগ করেন।
অন্যদিকে ব্যাবিলন গ্রুপ থেকে রুমানা আক্তার আতিকুলকে ফোন করে জানায়, তারা তাকে একটি কৃত্রিম হাত উপহার দিতে চায়।
আতিকুল তাকে রোবোলাইফ টেকনোলজির কৃত্রিম হাত তৈরির কথা অবগত করেন। ব্যাবিলন গ্রুপের আর্থিক সহযোগিতায় রোবোলাইফ টেকনোলজি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত আতিকুল সহ পাঁচজনকে কৃত্রিম হাত লাগিয়ে দেয়।
আতিকুলের মতে, এই কৃত্রিম হাত কিছুটা হলেও আমাকে সহযোগিতা করছে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন ঢাকার ডেমরার হাফেজ মোহাম্মদ হোসেন। গত বছরের ৫ আগস্ট তার ডান হাত গুলিবিদ্ধ হয় । চিকিৎসক গুলি বের করতে পারলেও তার ডান হাতটি বাঁচাতে পারেননি।
হাফেজ মোহাম্মদ হোসেন (২০) বলেন, কৃত্রিম হাত দিয়ে আমি দৈনন্দিন কাজগুলো করতে পারছি। পিপাসা পেলে গ্লাসে পানি ঢেলে পান করতে পারি। বাম হাত দিয়ে আমি লেখার চেষ্টা করছি।
ইলেকট্রিশিয়ান মোহাম্মদ নাঈম হাসান বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একজন আহত ব্যক্তিকে রক্ত দিয়ে ফিরে আসার পথে গুলিবিদ্ধ হন ।
মোহাম্মদ নাঈম হাসানের (২৫) মতে, আমার পরিচিত আহত এক ব্যক্তিকে ব্লাড দিতে গিয়ে পথে পুলিশের টিয়ারশেল, গোলাগুলির মধ্যে পড়ে যাই। আমি দুই বছরের এক কন্যা সন্তানের বাবা। এই কৃত্রিম হাত দিয়ে আর ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে না পারলেও দৈনন্দিন কাজগুলো করতে পারবো। স্ত্রী সন্তান নিয়ে কিছু করে খেতে পারবো।
আরিফ হোসেন সাগর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বন্ধুদের সাথে অংশ নিয়েছিলেন। আন্দোলনরত অবস্থায় তার হাতে গুলিবিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে হাতে গ্যাংগরিন হয়।
আরিফ হোসেন সাগর (১৯) জানান, গ্যাংগরিন যাতে আমার পুরো শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে এজন্য চিকিৎসক আমার হাতটি কেটে বাদ দেন। কৃত্রিম হাত লাগানোয় আমি স্বাভাবিক কাজগুলো করতে পারছি। এই হাত দিয়ে এখন ভাত খেতে পারি।
অন্যদিকে মোহাম্মদ মামুন একজন ট্রাক চালক। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি ট্রাক নিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পথে তার বাম হাত গুলিবিদ্ধ হয়।
মোহাম্মদ মামুন (৩৩) বলেন, গুলিবিদ্ধ হাতটি বাহু থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এই কৃত্রিম হাত দিয়ে হয়তো আর কোনোদিন ট্রাক চালাতে পারবো না। কিন্তু আমি আশাবাদী এই হাতকে কাজে লাগিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা করে খেতে পারবো।
রোবোলাইফ টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা জয় বড়ুয়া বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাতহীন ব্যক্তির মধ্যে পাঁচ জনকে রোবোটিক হাত সংযোগ করেছি । এক্ষেত্রে আহতদের আর্থিক সহায়তা করেছে ব্যাবিলন গ্রুপ।
তিনি বলেন, আহতদের পাঁচ স্তরের হাত লাগানো হয়েছে। কব্জি না থাকলে লেভেল ওয়ান, কব্জির একটু উপর থেকে না থাকলে লেভেল টু, কনুইয়ের উপর থেকে না থাকলে লেভেল থ্রি, মধ্য অংশ থাকলে লেভেল ফোর এবং পুরো হাত না থাকলে লেভেল ফাইভ।
তিনি বলেন, প্রত্যেককে কৃত্রিম যে হাতটি লাগানো হয়েছে সেই হাতে তারা এক কেজি ওজন পর্যন্ত জিনিস তুলতে বা বহন করতে পারবেন। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে পান করতে পারবেন। খাবার খেতে পারবেন।
কৃত্রিম হাতটি প্লাস্টিকের ম্যাটারিয়াল দিয়ে তৈরি হওয়ায় এর বেশি ওজনের জিনিস দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ বেশি ওজনের জিনিস নিলে তা ভেঙ্গে যেতে পারে।
তিনি আরো বলেন, মানুষের চাহিদা অনুযায়ী ত্বকের সাথে মিলিয়ে সিলিকন গ্লাস দিয়ে এই কৃত্রিম হাত তৈরি করা হয়েছে । কাউকে শট হাত, কাউকে পুরো হাত লাগানো হয়েছে। এই কৃত্রিম হাত ৩০ হাজার দিয়ে শুরু হয়ে সবোর্চ্চ ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম রাখা যায়। দেশের বাইরের এই কৃত্রিম হাত ৪ থেকে ৫ লাখ থেকে শুরু হয়ে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা দাম পড়ে । বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত
পাঁচ ব্যক্তি ছাড়াও ৯৫ এর বেশি হাতহীন ব্যক্তিকে আমরা কৃত্রিম হাত লাগাতে সক্ষম হয়েছি।
ব্যাবিলন গ্রুপের কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটিস (সিএসআর) রুমানা আক্তার জানালেন, জাতীয় পর্যায়ের যে কোনো সমস্যায় সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠান এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে থাকে। এরিই ধারাবাহিকতায় আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা সহায়তাস্বরূপ তাদের ব্লাড, খাবারের ব্যবস্থা করেছি।
তিনি আরো বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারণে হাত হারানো পাঁচ ব্যক্তিকে কৃত্রিম হাত লাগানোর জন্য আর্থিক সহায়তা করা হয়েছে। যাতে তারা কৃত্রিম হাত লাগিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।






























