ঢাকা ০১:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রয়োজন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:২৮:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 17

সিজিএস আয়োজিদ ধারাবাহিক এই সংলাপে অংশ নেন দেশের বিশিষ্টজনেরা।

রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলের সংস্কার করা বেশি প্রয়োজন। তাহলেই দেশের সকল স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়া” শীর্ষক একটি নীতি সংলাপে বিশিষ্টজনেরা একথা বলেন । আজ শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সিরডাপ (সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) মিলনায়তনে বিশিষ্টজনেরা একথা বলেন ।

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মদ শওকত আলী হাওলাদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক দিদার ভুঁইয়া, সাবেক সচিব ও বিপিএটিসি-র সাবেক রেক্টর এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুন নাহার খানম, বিএনপি-র সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী প্রমুখ।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান।

ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ট্রাম্প বিশ্ব ব্যবস্থার যে জায়গায় নিয়ে গেছে, সেখানে ছোট দেশগুলিতে স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা থাকবে কি না, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। ট্রাম্প প্রশাসন কেন আমাদের দেশের একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে চায়, তা নিয়ে জানতে হবে এবং তা নিয়ে প্রতিবেদন করতে হবে। দ্বৈত নাগরিকত্বের অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, আমি তা গ্রহণ করিনি। দ্বৈত নাগরিকত্ব হলে, দুই দেশের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। যখন একজন নাগরিক অন্য দেশের নিয়ম-কানুন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকে, তখন সে অন্য দেশের কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে না। তাই, দ্বৈত নাগরিকত্ব আইনটি কঠোরভাবে মান্য করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে হলফনামা দিতে হবে।

তিনি বলেন, আমি বলব, এই সরকার বিশেষ পরিস্থিতির সরকার। এই সরকারকে নিরপেক্ষতার সরকার বলা যাবে না। আমরা গত ১৫ বছরে একটি ভুয়া সংসদীয় ব্যবস্থা ছিলাম। এরপর উত্থান হলো, অন্তর্বর্তী সরকার হলো এবং আশা করি এখন একটি সুন্দর নির্বাচন হবে। দায়বদ্ধতা সবার প্রথমে নিজের কাছে থাকতে হবে, তাহলেই তখন আমি আমার পরিবার, সমাজ এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে পারব। তাই প্রত্যেক মানুষের নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং স্বচ্ছতা থাকতে হবে। তাই, সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় থাকতে হবে।

 

জিল্লুর রহমান বলেন, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা প্রায়শই সাধারণ প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত হয়, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই বিষয়গুলো কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়। এগুলো সরাসরি রাজনৈতিক শক্তির ব্যবহার, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করে। প্রশ্ন শুধুমাত্র শাসন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নয়, বরং এই প্রক্রিয়া কাদের জন্য, কীভাবে, এবং কোন দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা উপেক্ষা করা যায় না।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি শুধু নির্বাচনী ভাষণে সীমাবদ্ধ না হয়ে, বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। শাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং প্রশাসনিক অপব্যবহার যখন সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে। এই সংকট নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনের পর শাসন প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্ব এবং দলীয় প্রভাবের মাত্রা বেড়ে যায়, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থাকে দুর্বল করে। এর ফলে জনগণের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং এক ধরনের নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা শাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবকে আরও গভীর করে তোলে। এই বাস্তবতার দায় রাজনৈতিক দলগুলোকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে শাসন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া, প্রশাসন এবং সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য দৃঢ় কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। আজকের নীতি সংলাপের মূল লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে স্পষ্টভাবে জানতে চাওয়া—শাসন প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী? সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাদের সুস্পষ্ট নীতি কী, এবং দায়বদ্ধতার কাঠামোটি কীভাবে কার্যকর হবে? জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়ার জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ?

ড. ইউনূস থ্রি জিরো নিয়ে এত কাজ করেছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি প্রচারিত হয়েছে, ২৪-এর অভ্যুত্থান এর পর কিন্তু নিজ দেশে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি নিয়ে আলোচনা করেননি। তাহলে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং যান্ত্রিক ব্যবস্থা কোথায় দাঁড়িয়ে? সরকারের দায়বদ্ধতা কি জনগণের কাছে? আমার মনে হয় না। আমার মনে হয়, সরকারের দায়বদ্ধতা দেখা যায় কিছু গোষ্ঠীর কাছে, কিছু পকেট গ্রুপের কাছে, কিছু ছাত্রের কাছে, কিছু মবের কাছে। আর শাসনের ক্ষেত্রে যদি বলি, তাহলে এটা কার শাসন? এটা কোন পদ্ধতির শাসন? এটা কি প্রফেসর ইউনূসের শাসন? নাকি কিছু উপদেষ্টা পরিষদের শাসন? নাকি কিছু ছাত্র শাসিত শাসন? নাকি কোনো দলের শাসন? নাকি মবের শাসন? তা আমার বোধগম্য নয়। আমাদের প্রত্যাশা, আজকের আলোচনা শাসন প্রক্রিয়াকে শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতার আলোকে ব্যাখ্যা করবে। একটি কার্যকর এবং বিশ্বাসযোগ্য শাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে, রাজনৈতিক দলগুলোকে এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।

ড. সেলিম জাহান বলেন, আমি তিনটি শব্দে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা, দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব তুলে ধরব। সরকারী কাজের দৃশ্যমানতা জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। কোনো সরকার তার কর্তৃত্ব জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারে না। তথ্য-উপাত্ত অনেক বেশিই অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। এটি অতিরঞ্জিত করা মানে জনগণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। নির্বাচিত সরকার কোনো দলের সরকার নয়, এটি পুরো দেশের সরকার। নির্বাচিত সরকার যদি দেশের জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কথা বলে, তাহলে তা দূর করতে হবে। দায়বদ্ধতা আসলে আমাকে নিজেই নিশ্চিত করতে হবে। এর পেছনে নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। দায়বদ্ধতা উপরের স্তর থেকে নিশ্চিত করতে হবে। দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। সরকারের প্রতিটি কাজের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে একটি কাঠামো থাকতে হবে। এই দায়িত্ব যদি ভঙ্গ করি, তার শাস্তি কি হবে, তা জানাতে হবে।

 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশাসন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসন হবে সমান এবং নিরপেক্ষ। এটি না হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকবে না। সমস্ত তথ্য যা প্রকাশিত হবে, তা সঠিক হতে হবে। মিডিয়ার স্বাধীনতা ভোগ করা যাবে না, যদি না আপনি দায়িত্বশীল হন। মিডিয়াকে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য সংগ্রহ করে জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। তাই আমাদের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়ার কাঠামোকে পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হবে।

 

ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, আমাদের আসলে মাঠে নেমে আসতে হবে, শুধু কথা বললেই হবে না। আমাদের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। আমাদের যার যে দায়িত্ব থাকুক, আমাদের তা পালন করতে হবে। আর এই সরকারকে ভেতর এবং বাইরের সকল সমস্যার প্রতি আন্তরিক হতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী যে ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তার সাথে আমাদের আগামী যে সরকার আসুক না কেন, তা যেন জনগণের সরকার হয় এবং এই সরকার জনগণের সাথে নিয়ে ভেতর এবং বাইরের সকল সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে। আমি যখন এনবিআরের চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন বিগত সরকার আসার সময় ইশতেহারে লেখা ছিল যে, প্রতিটি সংসদ সদস্যের সম্পদের বিবরণ দেওয়া হবে। আমরা ড্রাফটও প্রস্তুত করেছিলাম, কিন্তু এর পর এই উদ্যোগ বন্ধ করে দেওয়া হলো। এখন ইশতেহারে কী লেখা হয়েছিল এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে আমাদের মাঝে অনেক আস্থার সংকট রয়েছে, যেহেতু অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের আজকে এখানে নিয়ে এসেছে। এখন স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতার বিষয়ে যা দেখেছি, তা হল—যে যায় লংকায়, সে হয় রাবণ। এখন আমাদের নির্বাহী বিভাগের এই অবস্থা, আমাদের শুধু পুথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত হলে হবে না, নীতিগতভাবে শিক্ষিত হতে হবে। তবুও আমাদের এই প্রত্যাশা রাখতে হবে এবং সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, শুধু নির্বাচন নয়, নির্বাচন পরবর্তী সময়েও এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

 

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বিগত ৫৪ বছর ধরে এই বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। স্বচ্ছতা এবং শাসন প্রক্রিয়া উপরের স্তর থেকে আসতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতির কাছে দায়বদ্ধ হলেও, কোন রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, গত ১৮ মাসে উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি, যা আমাদের আস্থাহীনতার কারণ। বর্তমান সরকার বিগত সরকারের দুর্নীতির ওপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করছে কিন্তু আমি মনে করি অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি নিয়েও একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতার বিষয়ে কথা উঠলে, নন-ডিক্লোজার এগ্রিমেন্ট এবং পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান কেনার মতো বিষয়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ। সংখ্যালঘুদের ভোটের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, এবং সরকার গণভোটের প্রচারে মনোযোগ দিলেও, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। আমাদের একত্রিত হয়ে এসব বিষয় সমাধানের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে।

সুব্রত চৌধুরী বলেন, ১২ তারিখের পরে আমাদের কি আরও বিপর্যয় অপেক্ষা করছে? এত বিপর্যস্ত অবস্থায় আমরা থাকতে চাই না। এই সরকার এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। কোনো সরকার-ই কথা রাখেনি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শাসন যদি রাজনৈতিক দলের মধ্যে না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এগুলো কিভাবে নিশ্চিত হবে? পুরো রাষ্ট্র অসুস্থ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলের শব্দচয়ন ঠিক রাখতে হবে।

নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক যে, আমরা কতটা স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা পাচ্ছি তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আমরা এখন আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে আছি, কিন্তু তারাই বলে একটি তরুণ দল থেকে অনেক সংসদ সদস্য আসবে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে স্বচ্ছতা কোথায়? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা কি আজও পেয়েছি? আমরা ইউজড টু হয়ে গেছি। নির্বাচন আসলে আমরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে কথা বলি, সরকার পরিবর্তন হয়, এক দল মার খায়, আর এক দল ফল খায়। চার বছর পরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না, শুধু দলের অবস্থা পরিবর্তিত হয়। নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে, যারা হলফনামা দিয়েছেন, তারা কেউই স্বচ্ছতা রাখেননি, সব কিছু গোপন রেখেছেন। অনেক ঋণখেলাপীর কথা উঠে আসছে, আসলে জায়গা মতো ক্লিয়ারেন্স নিতে পারেননি, এই কারণে এই অবস্থা। যদি আইন প্রণেতা এমন হন, তাহলে ভবিষ্যৎ কি হবে, আমি খুবই চিন্তিত।

অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রথম অন্তরায় হলো কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট। যখন ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন শেষ পর্যন্ত গুছিয়ে চলে কারণ, যখন সে ক্ষমতায় থাকবে না, তখন তার জীবন সঠিকভাবে চলবে কি না, সেই ভয় থাকে। তাই তারা ক্ষমতায় থাকার সময় ভয় দূর করার জন্য নিজেদের জন্য আলাদা উইন্ডো খুলেন। তারা টাকা লুটপাট করেন, কারণ তারা মনে করেন যে তারা ৫, ১০, ১৫, অথবা ২০ বছর কীভাবে থাকবেন, তার বন্দোবস্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে তারা দুর্নীতিতে যুক্ত হন। এজন্য তারা আইনকানুনের ফাঁকফোকর রেখে চলে যান। আমরা ছাত্রদের ভোগবিলাসীতার নীতি শিখাচ্ছি। তাহলে শিক্ষা খাতে, প্রতিটি সেক্টরে নীতি-নৈতিকতা নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষা সম্পর্কে গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা ছাত্রদেরকে শিখাই কিভাবে সম্পদ বাড়ানো যায়, এজন্য ছাত্ররা এই দুর্নীতির দিকে উৎসাহিত হচ্ছে। তারা হিরো হতে গিয়ে, একসময় তারা জিরো হয়ে যাচ্ছে।

ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো নির্বাচনী ইশতেহার লিখেছিল আওয়ামীলীগ, কিন্তু তার পর তারা কী বাস্তবায়ন করেছেন? রাজনৈতিক দলের আচরণ এখন ভালোভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। আমরা প্রায়ই শাসন ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু কীভাবে বাস্তবায়ন করব, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিল করতে হবে। নির্বাচন পরবর্তী যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা কতটা সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবে, তা আমি জানি না। আমি মিডিয়ার পক্ষপাতিত্ব দেখেছি, তাহলে সুশাসন কিভাবে আসবে? সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাগুলো কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না? এখানে দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহিতা নেই এবং চেক অ্যান্ড ব্যালান্সও নেই। তাই, শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য দায়বদ্ধতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, আইন ভাঙার চেয়ে, আইন না থাকাই ভালো। সরকারের পক্ষ থেকে ভোটারদের পক্ষে যাওয়া উচিত নয়। কারণ, যদি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভোটের পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা বলেন, তবে তখন অন্তর্বর্তী সরকারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অন্তর্বর্তী সরকার অনেক চুক্তি করলেও সাধারণ মানুষ তা জানে না। আমরা যদি স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা চাই, তবে রাষ্ট্রপ্রতি থেকে শুরু করে প্রতি পদে মেধা, দক্ষতা এবং যোগ্যতার মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোনো নিয়োগ কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী করা হয়নি। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে হবে। আগামী নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তারা যদি যোগ্য লোক নিয়োগ দিতে না পারেন, তবে আগের ১৫ বছর যেভাবে চলেছে, তার চেয়ে ভালো কিছু করা কখনোই সম্ভব হবে না। সুতরাং, সর্বোচ্চ মানদণ্ড অনুযায়ী যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে পারলে দেশের সবকিছুর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

দিদার ভুঁইয়া বলেন, এই অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে অনেক ঘাটতি রয়েছে, আমরা এখনও তাদের সম্পদের হিসাব পাইনি। ইউনুস সাহেব নভেম্বর মাসে বলেছিলেন যে, ডিসেম্বরের মধ্যে সব উপদেষ্টার সম্পদের হিসাব দেওয়া হবে, কিন্তু তা হয়নি। গুম-খুনের বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করার কোন ব্যবস্থা নেই, এবং সরকারও এ বিষয়ে কিছুই করতে পারেনি। আমাদের বুঝতে হবে, আমরা আসলে কি চাই। এই সরকারের আমলে অনেক কিছু প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু তারা কার্যকরভাবে কিছুই করতে পারেনি। নির্বাচনের বিষয়ে আমি এখনও শঙ্কিত। আমাদের কি কফিনের মিছিল নিয়ে ভোট দিতে যেতে হবে? এই সরকার ভাগ্যবান ছিল যে গণআন্দোলনের পর কফিনের মিছিল হয়নি। তবে, আমি নির্বাচনের ব্যাপারে পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত নই। যদি নির্বাচন হয়, তবে আমি বলব এই সরকার পাশ করে গেছে।

অধ্যাপক ড. শামসুন নাহার খানম বলেন, রুল অফ ল, গুড গভর্নেন্স, ট্রান্সপারেন্সি – এই শব্দগুলো সুন্দর হলেও বাস্তবতা এবং তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণের মধ্যে অনেক ফাঁক রয়েছে। আমাদের সমস্যা গুলোর মূল কোথায়? আইন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নে সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। যদি আমাদের সদিচ্ছা থাকে, তবে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা সহজেই চলে আসবে। অনেক চুক্তি নন-ডিক্লোজার এ রেখে দেওয়া হয়েছে, তার জবাবদিহিতা কোথায়? কেন আমরা সম্মিলিতভাবে এই প্রশ্নগুলো একসাথে তুলছি না? আমরা এথিক্যাল গভর্নমেন্ট এবং মোরাল পলিটিক্সের সংকট অনুভব করছি, কিন্তু কেউ কীভাবে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে, তা নিয়ে চেষ্টা করছি না। নির্বাচনে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখছি, সেখানে ভাষার মার্জিততা নেই। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা সবার ভাষা আন্তরিক এবং মার্জিত হওয়া উচিত।

মুহাম্মদ শওকত আলী হাওলাদার বলেন, টেকসই উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যারা নেতৃত্বে আছেন, তাদের সততার উপর নির্ভর করে তারা কি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন? রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা প্রথমে যে শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় আসেন, পরে সেই শক্তি ও সততা কমে যায়, দায়বদ্ধতা থাকে না, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার জন্য সেই শক্তি অপব্যবহার হয়। বর্তমান সরকার, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনেক কথাবার্তা বলছে, অনেক উদ্দীপনা দেখিয়েছে, কিন্তু এখন তারা নিস্তেজ হয়ে গেছেন। বর্তমান সরকার একটি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে। তাই স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের রুটলেভেল পর্যন্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। প্রথমে নিজের মানসিকতা এবং আচরণ ভালো করতে হবে। আমাকে ক্ষমতায় যাওয়ার পরে নেপোটিজম দূর করতে হবে। এজন্য, আমরা যদি শুধু আল্লাহর প্রতি ভয় করি এবং সেই ভয়কে কাজে লাগাই, তবে আমরা সকল স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারব।

পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখছি, নির্বাচিত সরকার সংস্কারের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। নির্বাচিত হয়ে তারা জনগণের প্রতিশ্রুতি দ্রুত ভুলে যায়। বর্তমানে বন্দর লিজ নিয়ে তাড়াহুড়া, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্বের ঘাটতি এবং সামরিক বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো স্পষ্টতা নেই। নির্বাচন নিয়ে আমাদের আস্থা নেই, কারণ গণভোটের ক্লোজ গুলোও অনেকেই জানে না। ইনভেস্টমেন্ট সামিটের পরেও আমরা কিছু পাইনি, গ্লোবাল আইকন বানানোর আগে আমাদের স্থানীয় আইকন হওয়া উচিত ছিল। ব্যক্তি পূজা এবং দুর্নীতি বেড়ে গেছে, আর দারিদ্র্য কমেনি বরং বাড়েছে। সবশেষে, আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি তা হলো জিরো জবাবদিহিতা, জিরো স্বচ্ছতা এবং জিরো শাসন প্রক্রিয়া।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রয়োজন

সর্বশেষ আপডেট ০৬:২৮:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলের সংস্কার করা বেশি প্রয়োজন। তাহলেই দেশের সকল স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়া” শীর্ষক একটি নীতি সংলাপে বিশিষ্টজনেরা একথা বলেন । আজ শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সিরডাপ (সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) মিলনায়তনে বিশিষ্টজনেরা একথা বলেন ।

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মদ শওকত আলী হাওলাদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক দিদার ভুঁইয়া, সাবেক সচিব ও বিপিএটিসি-র সাবেক রেক্টর এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুন নাহার খানম, বিএনপি-র সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী প্রমুখ।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান।

ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ট্রাম্প বিশ্ব ব্যবস্থার যে জায়গায় নিয়ে গেছে, সেখানে ছোট দেশগুলিতে স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা থাকবে কি না, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। ট্রাম্প প্রশাসন কেন আমাদের দেশের একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে চায়, তা নিয়ে জানতে হবে এবং তা নিয়ে প্রতিবেদন করতে হবে। দ্বৈত নাগরিকত্বের অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, আমি তা গ্রহণ করিনি। দ্বৈত নাগরিকত্ব হলে, দুই দেশের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। যখন একজন নাগরিক অন্য দেশের নিয়ম-কানুন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকে, তখন সে অন্য দেশের কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে না। তাই, দ্বৈত নাগরিকত্ব আইনটি কঠোরভাবে মান্য করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে হলফনামা দিতে হবে।

তিনি বলেন, আমি বলব, এই সরকার বিশেষ পরিস্থিতির সরকার। এই সরকারকে নিরপেক্ষতার সরকার বলা যাবে না। আমরা গত ১৫ বছরে একটি ভুয়া সংসদীয় ব্যবস্থা ছিলাম। এরপর উত্থান হলো, অন্তর্বর্তী সরকার হলো এবং আশা করি এখন একটি সুন্দর নির্বাচন হবে। দায়বদ্ধতা সবার প্রথমে নিজের কাছে থাকতে হবে, তাহলেই তখন আমি আমার পরিবার, সমাজ এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে পারব। তাই প্রত্যেক মানুষের নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং স্বচ্ছতা থাকতে হবে। তাই, সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় থাকতে হবে।

 

জিল্লুর রহমান বলেন, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা প্রায়শই সাধারণ প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত হয়, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই বিষয়গুলো কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়। এগুলো সরাসরি রাজনৈতিক শক্তির ব্যবহার, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করে। প্রশ্ন শুধুমাত্র শাসন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নয়, বরং এই প্রক্রিয়া কাদের জন্য, কীভাবে, এবং কোন দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা উপেক্ষা করা যায় না।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি শুধু নির্বাচনী ভাষণে সীমাবদ্ধ না হয়ে, বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। শাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং প্রশাসনিক অপব্যবহার যখন সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে। এই সংকট নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনের পর শাসন প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্ব এবং দলীয় প্রভাবের মাত্রা বেড়ে যায়, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থাকে দুর্বল করে। এর ফলে জনগণের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং এক ধরনের নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা শাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবকে আরও গভীর করে তোলে। এই বাস্তবতার দায় রাজনৈতিক দলগুলোকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে শাসন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া, প্রশাসন এবং সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য দৃঢ় কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। আজকের নীতি সংলাপের মূল লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে স্পষ্টভাবে জানতে চাওয়া—শাসন প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী? সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাদের সুস্পষ্ট নীতি কী, এবং দায়বদ্ধতার কাঠামোটি কীভাবে কার্যকর হবে? জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়ার জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ?

ড. ইউনূস থ্রি জিরো নিয়ে এত কাজ করেছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি প্রচারিত হয়েছে, ২৪-এর অভ্যুত্থান এর পর কিন্তু নিজ দেশে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি নিয়ে আলোচনা করেননি। তাহলে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং যান্ত্রিক ব্যবস্থা কোথায় দাঁড়িয়ে? সরকারের দায়বদ্ধতা কি জনগণের কাছে? আমার মনে হয় না। আমার মনে হয়, সরকারের দায়বদ্ধতা দেখা যায় কিছু গোষ্ঠীর কাছে, কিছু পকেট গ্রুপের কাছে, কিছু ছাত্রের কাছে, কিছু মবের কাছে। আর শাসনের ক্ষেত্রে যদি বলি, তাহলে এটা কার শাসন? এটা কোন পদ্ধতির শাসন? এটা কি প্রফেসর ইউনূসের শাসন? নাকি কিছু উপদেষ্টা পরিষদের শাসন? নাকি কিছু ছাত্র শাসিত শাসন? নাকি কোনো দলের শাসন? নাকি মবের শাসন? তা আমার বোধগম্য নয়। আমাদের প্রত্যাশা, আজকের আলোচনা শাসন প্রক্রিয়াকে শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতার আলোকে ব্যাখ্যা করবে। একটি কার্যকর এবং বিশ্বাসযোগ্য শাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে, রাজনৈতিক দলগুলোকে এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।

ড. সেলিম জাহান বলেন, আমি তিনটি শব্দে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা, দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব তুলে ধরব। সরকারী কাজের দৃশ্যমানতা জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। কোনো সরকার তার কর্তৃত্ব জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারে না। তথ্য-উপাত্ত অনেক বেশিই অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। এটি অতিরঞ্জিত করা মানে জনগণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। নির্বাচিত সরকার কোনো দলের সরকার নয়, এটি পুরো দেশের সরকার। নির্বাচিত সরকার যদি দেশের জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কথা বলে, তাহলে তা দূর করতে হবে। দায়বদ্ধতা আসলে আমাকে নিজেই নিশ্চিত করতে হবে। এর পেছনে নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। দায়বদ্ধতা উপরের স্তর থেকে নিশ্চিত করতে হবে। দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। সরকারের প্রতিটি কাজের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে একটি কাঠামো থাকতে হবে। এই দায়িত্ব যদি ভঙ্গ করি, তার শাস্তি কি হবে, তা জানাতে হবে।

 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশাসন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসন হবে সমান এবং নিরপেক্ষ। এটি না হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকবে না। সমস্ত তথ্য যা প্রকাশিত হবে, তা সঠিক হতে হবে। মিডিয়ার স্বাধীনতা ভোগ করা যাবে না, যদি না আপনি দায়িত্বশীল হন। মিডিয়াকে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য সংগ্রহ করে জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। তাই আমাদের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়ার কাঠামোকে পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হবে।

 

ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, আমাদের আসলে মাঠে নেমে আসতে হবে, শুধু কথা বললেই হবে না। আমাদের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। আমাদের যার যে দায়িত্ব থাকুক, আমাদের তা পালন করতে হবে। আর এই সরকারকে ভেতর এবং বাইরের সকল সমস্যার প্রতি আন্তরিক হতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী যে ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তার সাথে আমাদের আগামী যে সরকার আসুক না কেন, তা যেন জনগণের সরকার হয় এবং এই সরকার জনগণের সাথে নিয়ে ভেতর এবং বাইরের সকল সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে। আমি যখন এনবিআরের চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন বিগত সরকার আসার সময় ইশতেহারে লেখা ছিল যে, প্রতিটি সংসদ সদস্যের সম্পদের বিবরণ দেওয়া হবে। আমরা ড্রাফটও প্রস্তুত করেছিলাম, কিন্তু এর পর এই উদ্যোগ বন্ধ করে দেওয়া হলো। এখন ইশতেহারে কী লেখা হয়েছিল এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে আমাদের মাঝে অনেক আস্থার সংকট রয়েছে, যেহেতু অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের আজকে এখানে নিয়ে এসেছে। এখন স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতার বিষয়ে যা দেখেছি, তা হল—যে যায় লংকায়, সে হয় রাবণ। এখন আমাদের নির্বাহী বিভাগের এই অবস্থা, আমাদের শুধু পুথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত হলে হবে না, নীতিগতভাবে শিক্ষিত হতে হবে। তবুও আমাদের এই প্রত্যাশা রাখতে হবে এবং সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, শুধু নির্বাচন নয়, নির্বাচন পরবর্তী সময়েও এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

 

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বিগত ৫৪ বছর ধরে এই বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। স্বচ্ছতা এবং শাসন প্রক্রিয়া উপরের স্তর থেকে আসতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতির কাছে দায়বদ্ধ হলেও, কোন রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, গত ১৮ মাসে উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি, যা আমাদের আস্থাহীনতার কারণ। বর্তমান সরকার বিগত সরকারের দুর্নীতির ওপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করছে কিন্তু আমি মনে করি অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি নিয়েও একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতার বিষয়ে কথা উঠলে, নন-ডিক্লোজার এগ্রিমেন্ট এবং পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান কেনার মতো বিষয়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ। সংখ্যালঘুদের ভোটের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, এবং সরকার গণভোটের প্রচারে মনোযোগ দিলেও, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। আমাদের একত্রিত হয়ে এসব বিষয় সমাধানের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে।

সুব্রত চৌধুরী বলেন, ১২ তারিখের পরে আমাদের কি আরও বিপর্যয় অপেক্ষা করছে? এত বিপর্যস্ত অবস্থায় আমরা থাকতে চাই না। এই সরকার এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। কোনো সরকার-ই কথা রাখেনি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শাসন যদি রাজনৈতিক দলের মধ্যে না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এগুলো কিভাবে নিশ্চিত হবে? পুরো রাষ্ট্র অসুস্থ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলের শব্দচয়ন ঠিক রাখতে হবে।

নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক যে, আমরা কতটা স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা পাচ্ছি তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আমরা এখন আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে আছি, কিন্তু তারাই বলে একটি তরুণ দল থেকে অনেক সংসদ সদস্য আসবে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে স্বচ্ছতা কোথায়? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা কি আজও পেয়েছি? আমরা ইউজড টু হয়ে গেছি। নির্বাচন আসলে আমরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে কথা বলি, সরকার পরিবর্তন হয়, এক দল মার খায়, আর এক দল ফল খায়। চার বছর পরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না, শুধু দলের অবস্থা পরিবর্তিত হয়। নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে, যারা হলফনামা দিয়েছেন, তারা কেউই স্বচ্ছতা রাখেননি, সব কিছু গোপন রেখেছেন। অনেক ঋণখেলাপীর কথা উঠে আসছে, আসলে জায়গা মতো ক্লিয়ারেন্স নিতে পারেননি, এই কারণে এই অবস্থা। যদি আইন প্রণেতা এমন হন, তাহলে ভবিষ্যৎ কি হবে, আমি খুবই চিন্তিত।

অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রথম অন্তরায় হলো কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট। যখন ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন শেষ পর্যন্ত গুছিয়ে চলে কারণ, যখন সে ক্ষমতায় থাকবে না, তখন তার জীবন সঠিকভাবে চলবে কি না, সেই ভয় থাকে। তাই তারা ক্ষমতায় থাকার সময় ভয় দূর করার জন্য নিজেদের জন্য আলাদা উইন্ডো খুলেন। তারা টাকা লুটপাট করেন, কারণ তারা মনে করেন যে তারা ৫, ১০, ১৫, অথবা ২০ বছর কীভাবে থাকবেন, তার বন্দোবস্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে তারা দুর্নীতিতে যুক্ত হন। এজন্য তারা আইনকানুনের ফাঁকফোকর রেখে চলে যান। আমরা ছাত্রদের ভোগবিলাসীতার নীতি শিখাচ্ছি। তাহলে শিক্ষা খাতে, প্রতিটি সেক্টরে নীতি-নৈতিকতা নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষা সম্পর্কে গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা ছাত্রদেরকে শিখাই কিভাবে সম্পদ বাড়ানো যায়, এজন্য ছাত্ররা এই দুর্নীতির দিকে উৎসাহিত হচ্ছে। তারা হিরো হতে গিয়ে, একসময় তারা জিরো হয়ে যাচ্ছে।

ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো নির্বাচনী ইশতেহার লিখেছিল আওয়ামীলীগ, কিন্তু তার পর তারা কী বাস্তবায়ন করেছেন? রাজনৈতিক দলের আচরণ এখন ভালোভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। আমরা প্রায়ই শাসন ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু কীভাবে বাস্তবায়ন করব, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিল করতে হবে। নির্বাচন পরবর্তী যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা কতটা সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবে, তা আমি জানি না। আমি মিডিয়ার পক্ষপাতিত্ব দেখেছি, তাহলে সুশাসন কিভাবে আসবে? সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাগুলো কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না? এখানে দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহিতা নেই এবং চেক অ্যান্ড ব্যালান্সও নেই। তাই, শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য দায়বদ্ধতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, আইন ভাঙার চেয়ে, আইন না থাকাই ভালো। সরকারের পক্ষ থেকে ভোটারদের পক্ষে যাওয়া উচিত নয়। কারণ, যদি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভোটের পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা বলেন, তবে তখন অন্তর্বর্তী সরকারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অন্তর্বর্তী সরকার অনেক চুক্তি করলেও সাধারণ মানুষ তা জানে না। আমরা যদি স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা চাই, তবে রাষ্ট্রপ্রতি থেকে শুরু করে প্রতি পদে মেধা, দক্ষতা এবং যোগ্যতার মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোনো নিয়োগ কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী করা হয়নি। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে হবে। আগামী নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তারা যদি যোগ্য লোক নিয়োগ দিতে না পারেন, তবে আগের ১৫ বছর যেভাবে চলেছে, তার চেয়ে ভালো কিছু করা কখনোই সম্ভব হবে না। সুতরাং, সর্বোচ্চ মানদণ্ড অনুযায়ী যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে পারলে দেশের সবকিছুর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

দিদার ভুঁইয়া বলেন, এই অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে অনেক ঘাটতি রয়েছে, আমরা এখনও তাদের সম্পদের হিসাব পাইনি। ইউনুস সাহেব নভেম্বর মাসে বলেছিলেন যে, ডিসেম্বরের মধ্যে সব উপদেষ্টার সম্পদের হিসাব দেওয়া হবে, কিন্তু তা হয়নি। গুম-খুনের বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করার কোন ব্যবস্থা নেই, এবং সরকারও এ বিষয়ে কিছুই করতে পারেনি। আমাদের বুঝতে হবে, আমরা আসলে কি চাই। এই সরকারের আমলে অনেক কিছু প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু তারা কার্যকরভাবে কিছুই করতে পারেনি। নির্বাচনের বিষয়ে আমি এখনও শঙ্কিত। আমাদের কি কফিনের মিছিল নিয়ে ভোট দিতে যেতে হবে? এই সরকার ভাগ্যবান ছিল যে গণআন্দোলনের পর কফিনের মিছিল হয়নি। তবে, আমি নির্বাচনের ব্যাপারে পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত নই। যদি নির্বাচন হয়, তবে আমি বলব এই সরকার পাশ করে গেছে।

অধ্যাপক ড. শামসুন নাহার খানম বলেন, রুল অফ ল, গুড গভর্নেন্স, ট্রান্সপারেন্সি – এই শব্দগুলো সুন্দর হলেও বাস্তবতা এবং তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণের মধ্যে অনেক ফাঁক রয়েছে। আমাদের সমস্যা গুলোর মূল কোথায়? আইন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নে সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। যদি আমাদের সদিচ্ছা থাকে, তবে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা সহজেই চলে আসবে। অনেক চুক্তি নন-ডিক্লোজার এ রেখে দেওয়া হয়েছে, তার জবাবদিহিতা কোথায়? কেন আমরা সম্মিলিতভাবে এই প্রশ্নগুলো একসাথে তুলছি না? আমরা এথিক্যাল গভর্নমেন্ট এবং মোরাল পলিটিক্সের সংকট অনুভব করছি, কিন্তু কেউ কীভাবে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে, তা নিয়ে চেষ্টা করছি না। নির্বাচনে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখছি, সেখানে ভাষার মার্জিততা নেই। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা সবার ভাষা আন্তরিক এবং মার্জিত হওয়া উচিত।

মুহাম্মদ শওকত আলী হাওলাদার বলেন, টেকসই উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যারা নেতৃত্বে আছেন, তাদের সততার উপর নির্ভর করে তারা কি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন? রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা প্রথমে যে শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় আসেন, পরে সেই শক্তি ও সততা কমে যায়, দায়বদ্ধতা থাকে না, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার জন্য সেই শক্তি অপব্যবহার হয়। বর্তমান সরকার, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনেক কথাবার্তা বলছে, অনেক উদ্দীপনা দেখিয়েছে, কিন্তু এখন তারা নিস্তেজ হয়ে গেছেন। বর্তমান সরকার একটি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে। তাই স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের রুটলেভেল পর্যন্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। প্রথমে নিজের মানসিকতা এবং আচরণ ভালো করতে হবে। আমাকে ক্ষমতায় যাওয়ার পরে নেপোটিজম দূর করতে হবে। এজন্য, আমরা যদি শুধু আল্লাহর প্রতি ভয় করি এবং সেই ভয়কে কাজে লাগাই, তবে আমরা সকল স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারব।

পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখছি, নির্বাচিত সরকার সংস্কারের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। নির্বাচিত হয়ে তারা জনগণের প্রতিশ্রুতি দ্রুত ভুলে যায়। বর্তমানে বন্দর লিজ নিয়ে তাড়াহুড়া, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্বের ঘাটতি এবং সামরিক বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো স্পষ্টতা নেই। নির্বাচন নিয়ে আমাদের আস্থা নেই, কারণ গণভোটের ক্লোজ গুলোও অনেকেই জানে না। ইনভেস্টমেন্ট সামিটের পরেও আমরা কিছু পাইনি, গ্লোবাল আইকন বানানোর আগে আমাদের স্থানীয় আইকন হওয়া উচিত ছিল। ব্যক্তি পূজা এবং দুর্নীতি বেড়ে গেছে, আর দারিদ্র্য কমেনি বরং বাড়েছে। সবশেষে, আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি তা হলো জিরো জবাবদিহিতা, জিরো স্বচ্ছতা এবং জিরো শাসন প্রক্রিয়া।