ঢাকা ০৭:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে নারীরা ইতিহাসের সবচেয়ে অনিরাপদ সময়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:২২:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 118

সিজিএস আয়োজিত সংলাপে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ। ছবি: বাংলা অ্যাফেয়ার্স

বাংলাদেশে নারীরা বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে অনিরাপদ সময় পার করছেন বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। তারা বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া নারী নেতৃত্ব ও লৈঙ্গিক সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না।

 

আজ বুধবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর আয়োজনে “নারী নেতৃত্ব, লৈঙ্গিক সমতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার” শীর্ষক এক নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন আলোচকরা।

 

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে নারীর নেতৃত্ব ও লৈঙ্গিক সমতা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়।

 

অনুষ্ঠানের শুরুতে সিজিএস-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও নেতৃত্বের জায়গায় নারীরা এখনও পিছিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোয়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের প্রতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। এসডিজির প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ঐতিহাসিক, কিন্তু পরবর্তীতে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কার্যকর না হলে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ বলেন, গত ৩০ বছরে নারীরা আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে, যা নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। নারীরা রাজনৈতিক আন্দোলনে সামনে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের উপেক্ষা করা হয়। শিক্ষা ও রাজনীতির প্রতিটি স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। পূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে এই সংকট কাটবে না।

 

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বৈষম্য সমাজেও প্রতিফলিত হচ্ছে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক কোটা প্রয়োজন। নারী কমিশন অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং নারী প্রার্থীরা সামাজিক মাধ্যম ও এআই-নির্ভর অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন, যা নির্বাচন কমিশনের কঠোরভাবে মোকাবিলা করা উচিত।

 

বাংলাদেশ নারী উদ্যোক্তা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল বলেন, নারীদের প্রতিবন্ধকতা পরিবার থেকেই শুরু হয়। অর্থায়ন, ঋণ ও তথ্যের অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তা এগোতে পারেন না। সংসদে নারীর অংশগ্রহণ ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা, স্বল্প সুদে ঋণ, ডে-কেয়ার সুবিধা, সমান বেতন ও জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেট নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।

 

বাংলাদেশ নারী নেতৃত্ব জোটের সভাপতি নাসিম ফেরদৌস বলেন, সংবিধানে নারীর অধিকার থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করা হয় না। যোগ্য নারীদের নেতৃত্বে আসার পথ পরিকল্পিতভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, নারীদের বাদ দিয়ে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।

 

অন্যান্য আলোচকরা বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রান্তিক নারীদের অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং শিক্ষাব্যবস্থা থেকেই নেতৃত্ব বিকাশের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

 

সংলাপে বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, নারীর নিরাপত্তা, সমান সুযোগ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আসন্ন নির্বাচনে নারীরা যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে ও নেতৃত্বে অংশ নিতে পারেন- এটাই ছিল আলোচনার মূল প্রত্যাশা।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

বাংলাদেশে নারীরা ইতিহাসের সবচেয়ে অনিরাপদ সময়ে

সর্বশেষ আপডেট ০৫:২২:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে নারীরা বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে অনিরাপদ সময় পার করছেন বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। তারা বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া নারী নেতৃত্ব ও লৈঙ্গিক সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না।

 

আজ বুধবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর আয়োজনে “নারী নেতৃত্ব, লৈঙ্গিক সমতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার” শীর্ষক এক নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন আলোচকরা।

 

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে নারীর নেতৃত্ব ও লৈঙ্গিক সমতা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়।

 

অনুষ্ঠানের শুরুতে সিজিএস-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও নেতৃত্বের জায়গায় নারীরা এখনও পিছিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোয়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের প্রতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। এসডিজির প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ঐতিহাসিক, কিন্তু পরবর্তীতে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কার্যকর না হলে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ বলেন, গত ৩০ বছরে নারীরা আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে, যা নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। নারীরা রাজনৈতিক আন্দোলনে সামনে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের উপেক্ষা করা হয়। শিক্ষা ও রাজনীতির প্রতিটি স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। পূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে এই সংকট কাটবে না।

 

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বৈষম্য সমাজেও প্রতিফলিত হচ্ছে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক কোটা প্রয়োজন। নারী কমিশন অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং নারী প্রার্থীরা সামাজিক মাধ্যম ও এআই-নির্ভর অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন, যা নির্বাচন কমিশনের কঠোরভাবে মোকাবিলা করা উচিত।

 

বাংলাদেশ নারী উদ্যোক্তা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল বলেন, নারীদের প্রতিবন্ধকতা পরিবার থেকেই শুরু হয়। অর্থায়ন, ঋণ ও তথ্যের অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তা এগোতে পারেন না। সংসদে নারীর অংশগ্রহণ ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা, স্বল্প সুদে ঋণ, ডে-কেয়ার সুবিধা, সমান বেতন ও জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেট নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।

 

বাংলাদেশ নারী নেতৃত্ব জোটের সভাপতি নাসিম ফেরদৌস বলেন, সংবিধানে নারীর অধিকার থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করা হয় না। যোগ্য নারীদের নেতৃত্বে আসার পথ পরিকল্পিতভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, নারীদের বাদ দিয়ে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।

 

অন্যান্য আলোচকরা বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রান্তিক নারীদের অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং শিক্ষাব্যবস্থা থেকেই নেতৃত্ব বিকাশের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

 

সংলাপে বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, নারীর নিরাপত্তা, সমান সুযোগ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আসন্ন নির্বাচনে নারীরা যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে ও নেতৃত্বে অংশ নিতে পারেন- এটাই ছিল আলোচনার মূল প্রত্যাশা।