ঢাকা ১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ: নীতি সংলাপে বিশ্লেষণ

সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:৩৫:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 34

সিজিএস আয়োজিত নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা শীর্ষক সংলাপে উপস্থিত অতিথিদের একাংশ। ছবি: বাংলা অ্যাফেয়ার্স

ক্ষমতাধর দেশগুলো দুর্বল দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন কাজে লাগিয়ে সংকট তৈরি করছে। এ অবস্থায় বর্তমানের যে পলিটিক্যাল ইকোসিস্টেম, সেটি বুঝতে না পারলে সামনের দিনে রাষ্ট্র চালানো যাবে না । পাঁচ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে বিভেদ তৈরি হয়েছে তা নিরসনে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

আজ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলাঃ গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক একটি নীতি সংলাপে এসব মন্তব্য করেন দেশের বিশিষ্টজনেরা।

যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ, গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে জাতীয় নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; রাষ্ট্র এতে ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

 

তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রচলিত সংজ্ঞা আর কার্যকর নয়; বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় নিরাপত্তা বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সাবেক আইজিপি ড. এম. এনামুল হক, সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারওয়ার মিলন, গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মোশতাক হোসেন, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, নৈতিক সমাজ বাংলাদেশ-এর সংগঠক মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনিরুল ইসলাম আকন্দ, সিপিবি’র সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক মেজর (অব.) এ এস এম শামসুল আরেফিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল উ কান থেইন, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা ইবনুল সায়েদ রানা, ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন, বাসদের নেতা নিখিল দাস এবং শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর প্রমুখ।

 

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান।

ভেনেজুয়েলা, পানামা ও চিলির উদাহরণ টেনে জহির উদ্দিন স্বপন আরো বলেন, অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রভাব ও বহিরাগত ঝুঁকিও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে উদ্ভূত নিরাপত্তা হুমকির কথাও বিবেচনায় নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন জ্ঞান ও সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক দল, অংশীজন ও জনগণের ঐক্য অপরিহার্য বলে তিনি জোর দেন।

 

মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন বলেন, দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বারবার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে সেই ভুল পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যায়। যতদিন জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া না হবে, কোনো সংস্কারই কার্যকর হবে না। ক্ষমতায় যে-ই আসুক না কেন, অতীতের একই ভুল আর পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয় ।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ, নৈতিক ও দেশপ্রেমভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। যৌথ জাতীয় চেতনা না থাকলে জনগণ ভোগান্তির শিকার হতে থাকবে। জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং একটি পুলিশ কাউন্সিল গঠন প্রয়োজন, যাতে তদারকি, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।

 

অনুষ্ঠানের শুরুতে সেন্টার ফর গভর্ভ্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, গণতন্ত্র ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন একটি নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

 

তিনি উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা দুই ধরনের- সফট ও হার্ড সিকিউরিটি, যেখানে হার্ড সিকিউরিটি সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ এর পর নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংস্কার কমিশন গঠিত না হওয়াকে তিনি বড় ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতির ঘাটতি এবং নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে বলেও তিনি জানান।

 

তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিজেরাই পুরোপুরি নিরাপদ নন, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে জড়িত।

জিল্লুর রহমান বলেন, ‘ডেভিল হান্ট’ ধরনের প্রবণতা এবং সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার পরও সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা কমেনি। নিরাপত্তা কেবল সীমান্ত রক্ষা নয়; এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলা, সাইবার নিরাপত্তা এবং নির্বাচনকালীন ও পরবর্তী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও জড়িত।

 

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ–ভারত ও বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, মানব পাচার, রোহিঙ্গা সংকট, ভারত-চীন ও যুক্তরাষ্ট্র–চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সাইবার যুদ্ধ এবং বঙ্গোপাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য বড় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন এখন আর শুধু ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা নয়; এটি একটি হাইব্রিড নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, যেখানে ডিজিটাল ঝুঁকি ও অপপ্রচার বড় উদ্বেগ। ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও জনগণ কতটা প্রস্তুত—তা গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

সাবেক আইজিপি ড. এম. এনামুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য আরো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মকে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুলিশের ক্ষেত্রে এফআইআর সংক্রান্ত বিদ্যমান সমস্যাজনক চর্চা বন্ধ করা জরুরি।

 

ড. এম. এনামুল হক বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। এর মধ্যে বিচার ব্যবস্থা ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব বোর্ড এবং পরিবহন খাতসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, সংবাদ প্রকাশের আগে যাচাইকৃত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, নতুন নতুন কমিশন গঠনের পরিবর্তে একটি মাত্র কমিশনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কমিশনগুলোর কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, যা কার্যকর করতে জনগণের সচেতনতা জরুরি।

 

তিনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষা জবাবদিহি শক্তিশালী করে এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মূল ভিত্তি হলো একটি স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার মবের কাছে নতজানু অবস্থানে রয়েছে এবং জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ ও আমলাতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করার বদলে তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হচ্ছে। এসব বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সীমান্ত নিরাপত্তা সংকটের পেছনে পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত দুর্বলতার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে।

 

অধ্যাপক আবু সাঈদ বলেন, এই নির্বাচনকে সঠিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায় না, কারণ এটি নির্বাচিত ও পক্ষপাতদুষ্টভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি জনগণের ইচ্ছা বা কল্যাণকে প্রতিফলিত করে না। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে দেশ গভীর সংকটে পড়বে।

 

তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা—উভয়ই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত না হলে জনআস্থা আরও দুর্বল হবে এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গোলাম সারওয়ার মিলন বলেন, কেবল নির্বাচনে জয়লাভ করলেই কোনো দলকে বৈধ শাসক হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, যদি সেই জয় বিশ্বাসযোগ্য ও ন্যায্য না হয়। তাই একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর আচরণবিধি থাকা অপরিহার্য।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় নিরাপত্তাকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। নীল অর্থনীতি এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নাগরিকদের ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে।

 

গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, সামরিক শাসন, অন্তর্বর্তী সরকার বা নির্বাচিত সরকার—কোনোটির অধীনেই দেশের চরিত্রগত মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের সময়েও হত্যা, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘন বেশি ঘটেছে এবং জুলাই বিপ্লবের পরও রাষ্ট্রীয় আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। শেষদিকে পুলিশ বাহিনীর কিছু তৎপরতা থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিজিবির উপস্থিতির মধ্যেই অপরাধীরা কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছে—সে প্রশ্ন তুলে তিনি আত্মসমালোচনার অভাবের কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করতে হবে; রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বাহিনীগুলোর ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

 

ড. মোশতাক হোসেন বলেন, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আসলে কাদের জন্য—সাধারণ মানুষের নাকি কেবল উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের জন্য—এই মৌলিক প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা জোরদার হলেও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়, যা মূল সংকটকে তুলে ধরে।

 

ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা বাড়াতে হবে এবং অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রিকরণ থেকে সরে আসতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা একটি বিস্তৃত ধারণা এবং নন-ট্র্যাডিশনাল নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে জাতীয় নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ওপর থেকে নিচের পদ্ধতির পাশাপাশি নিচ থেকে ওপরে যাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, অর্থের বিনিময়ে এনআইডি পাওয়া রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি, যার পেছনে সততার অভাব বড় কারণ।

 

তিনি বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতা জরুরি। ভিন্নমত গ্রহণের মানসিকতা ছাড়া অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে এখনো কোনো কমিশন গঠিত না হওয়া একটি বড় ঘাটতি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ভিত্তি হলো জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে সরকার, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য।

 

তিনি আরও বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো বহুমাত্রিক, যা মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা মূলত দেশের শাসকদের ওপর নির্ভর করে এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় এটি একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। ক্ষমতাসীনদের আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের কারণে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রকৃত গণতন্ত্র কেবল নামেই ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলেছে এবং জনস্বার্থের বদলে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। মব সহিংসতার সংস্কৃতি তারই ফল। বিপ্লবের পরও এ সংস্কৃতির পরিবর্তন না হওয়া প্রমাণ করে যে সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, এককালীন উদ্যোগ নয়।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল উ কান থেইন বলেন, দেশের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে সততা অপরিহার্য; সততা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যকর হয় না। তিনি বলেন, আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংস্কারই মূল ভিত্তি, কারণ সততা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতা না থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করেন, তবে দেশের আমূল পরিবর্তন সম্ভব। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনীতিমুক্ত ও পেশাদার করার ওপর জোর দেন এবং নির্বাচনের সময় তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের কথা বলেন।

জাহেদ উর রহমান বলেন, নির্বাচিত সরকারের হাত ধরেই অনেক সময় শাসনব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী রূপ নেয়। তিনি বলেন, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে ২০২২ সাল থেকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভাঙন স্পষ্ট হয়েছে, যার ফলে বিশ্ব আজ অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। চীন–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

 

তিনি বলেন, এসব বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা এখন একটি প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত না হলে দেশ গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর বলেন, সিআইডি ও এনএসআইসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অতীতে তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ রিমান্ড অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ আয়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে এবং এতে জবাবদিহির অভাব রয়েছে। একইভাবে, ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচার বিভাগে অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। জুলাই আন্দোলনের পর সংসদ ও আইন প্রণয়ন পর্যায়ে অর্থবহ আলোচনা না হওয়াকে তিনি বড় ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

 

তার মতে, সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, নতুন সংস্কারের আগে বিদ্যমান আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অন্তত অর্ধেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

মেজর (অব.) এ এস এম শামসুল আরেফিন বলেন, একসময় সমাজই রাষ্ট্রকে পথ দেখাত বলে ধারণা ছিল। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র কি সমাজ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, নাকি রাষ্ট্রই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র নাগরিকদের এমন সব সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে দিচ্ছে, যা নাগরিকদের নিজস্ব হওয়া উচিত—কাকে ভোট দেবেন বা কীভাবে নাগরিক জীবন পরিচালনা করবেন। ফলে সাধারণ মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, জনগণের স্বার্থে কাজ করার কথা বলা হলেও প্রকৃত প্রশ্ন থেকে যায়—জনগণ কি যথাযথভাবে শিক্ষিত হয়েছে? তারা কি নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন? ব্রিটিশ শাসনামল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অনেক দমনমূলক আইন এখনো বহাল রয়েছে, যেগুলো সংস্কার বা বাতিলের উদ্যোগ খুবই সীমিত।

 

ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার ঘাটতি এখন একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তথ্য ফাঁস কীভাবে অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলতে পারে, তার উদাহরণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে। দেশ বর্তমানে কেবল জাতীয় নিরাপত্তাহীনতাই নয়, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তাহীনতারও মুখোমুখি। জাতীয় ও রাজনৈতিক পুনর্মিলন এখন সময়ের দাবি। তিনি আরও বলেন, সমাজে মব সংস্কৃতি ও ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় উগ্রতার প্রবণতা দেশকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

মেজর জেনারেল (অব) মনিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, নাগরিকরা চাইলে অনেক কিছুই করতে পারেন। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আইনের আওতায় থেকে নাগরিকদের হস্তক্ষেপ করা উচিত এবং যুক্তিসংগত ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়তারও আইনি পরিণতি থাকা দরকার। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে আইন সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠী আইন প্রয়োগের প্রধান শিকার হলেও অর্থ ও প্রভাবশালীরা প্রায়ই দায়মুক্তি পেয়ে যান। উন্নত দেশগুলোতে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়, যেখানে রাষ্ট্রপ্রধানরাও অপরাধ করলে আইনের আওতায় আসেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি বলেন, এখনই সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন। দেশজুড়ে তাদের ছড়িয়ে পড়া গুরুতর নিরাপত্তা ও সামাজিক সমস্যা তৈরি করছে, যার মধ্যে অপরাধে জড়ানোর ঘটনাও রয়েছে। হয় তাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিতে হবে, নয়তো প্রশিক্ষণ ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সমাজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

নিখিল দাস বলেন, নির্বাচন সামনে আসলেও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বড় অংশ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে এবং দীর্ঘ আলোচনার পরও বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও বিচার ব্যবস্থার বিষয়ে জনমত বদলাচ্ছে। বিশেষ করে পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে।

 

ইবনুল সাইয়েদ রানা বলেন, বিপ্লবের পর বহু সংস্কারের প্রত্যাশা থাকলেও তার অনেকগুলোই বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়ে জনমনোযোগও ছিল সীমিত। সংস্কার নিশ্চিত না করে দ্রুত নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, প্রতিশ্রুত সংস্কার ছাড়া নির্বাচন এগোলে বিপ্লবের যৌক্তিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

 

ব্যারিস্টার এম. সারওয়ার হোসেন বলেন, জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ও অভিন্ন ধারণা গড়ে তোলা এখন জরুরি। ক্ষমতাবানদের মধ্যে স্বজনপ্রীতি ও বিশ্বাসঘাতকতা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক নিরাপত্তা দুর্বল থাকায় অর্থপাচার ও সম্পদ বিদেশে স্থানান্তরের প্রবণতা বেড়েছে।

তিনি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের আগে ভয়মুক্ত ও সমান সুযোগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের আনতে হবে, যাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার জাতীয় স্বার্থ।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ: নীতি সংলাপে বিশ্লেষণ

সর্বশেষ আপডেট ০৫:৩৫:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ক্ষমতাধর দেশগুলো দুর্বল দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন কাজে লাগিয়ে সংকট তৈরি করছে। এ অবস্থায় বর্তমানের যে পলিটিক্যাল ইকোসিস্টেম, সেটি বুঝতে না পারলে সামনের দিনে রাষ্ট্র চালানো যাবে না । পাঁচ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে বিভেদ তৈরি হয়েছে তা নিরসনে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

আজ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলাঃ গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক একটি নীতি সংলাপে এসব মন্তব্য করেন দেশের বিশিষ্টজনেরা।

যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ, গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে জাতীয় নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; রাষ্ট্র এতে ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

 

তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রচলিত সংজ্ঞা আর কার্যকর নয়; বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় নিরাপত্তা বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সাবেক আইজিপি ড. এম. এনামুল হক, সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারওয়ার মিলন, গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মোশতাক হোসেন, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, নৈতিক সমাজ বাংলাদেশ-এর সংগঠক মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনিরুল ইসলাম আকন্দ, সিপিবি’র সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক মেজর (অব.) এ এস এম শামসুল আরেফিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল উ কান থেইন, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা ইবনুল সায়েদ রানা, ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন, বাসদের নেতা নিখিল দাস এবং শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর প্রমুখ।

 

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান।

ভেনেজুয়েলা, পানামা ও চিলির উদাহরণ টেনে জহির উদ্দিন স্বপন আরো বলেন, অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রভাব ও বহিরাগত ঝুঁকিও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে উদ্ভূত নিরাপত্তা হুমকির কথাও বিবেচনায় নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন জ্ঞান ও সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক দল, অংশীজন ও জনগণের ঐক্য অপরিহার্য বলে তিনি জোর দেন।

 

মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন বলেন, দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বারবার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে সেই ভুল পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যায়। যতদিন জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া না হবে, কোনো সংস্কারই কার্যকর হবে না। ক্ষমতায় যে-ই আসুক না কেন, অতীতের একই ভুল আর পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয় ।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ, নৈতিক ও দেশপ্রেমভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। যৌথ জাতীয় চেতনা না থাকলে জনগণ ভোগান্তির শিকার হতে থাকবে। জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং একটি পুলিশ কাউন্সিল গঠন প্রয়োজন, যাতে তদারকি, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।

 

অনুষ্ঠানের শুরুতে সেন্টার ফর গভর্ভ্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, গণতন্ত্র ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন একটি নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

 

তিনি উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা দুই ধরনের- সফট ও হার্ড সিকিউরিটি, যেখানে হার্ড সিকিউরিটি সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ এর পর নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংস্কার কমিশন গঠিত না হওয়াকে তিনি বড় ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতির ঘাটতি এবং নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে বলেও তিনি জানান।

 

তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিজেরাই পুরোপুরি নিরাপদ নন, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে জড়িত।

জিল্লুর রহমান বলেন, ‘ডেভিল হান্ট’ ধরনের প্রবণতা এবং সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার পরও সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা কমেনি। নিরাপত্তা কেবল সীমান্ত রক্ষা নয়; এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলা, সাইবার নিরাপত্তা এবং নির্বাচনকালীন ও পরবর্তী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও জড়িত।

 

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ–ভারত ও বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, মানব পাচার, রোহিঙ্গা সংকট, ভারত-চীন ও যুক্তরাষ্ট্র–চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সাইবার যুদ্ধ এবং বঙ্গোপাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য বড় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন এখন আর শুধু ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা নয়; এটি একটি হাইব্রিড নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, যেখানে ডিজিটাল ঝুঁকি ও অপপ্রচার বড় উদ্বেগ। ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও জনগণ কতটা প্রস্তুত—তা গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

সাবেক আইজিপি ড. এম. এনামুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য আরো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মকে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুলিশের ক্ষেত্রে এফআইআর সংক্রান্ত বিদ্যমান সমস্যাজনক চর্চা বন্ধ করা জরুরি।

 

ড. এম. এনামুল হক বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। এর মধ্যে বিচার ব্যবস্থা ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব বোর্ড এবং পরিবহন খাতসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, সংবাদ প্রকাশের আগে যাচাইকৃত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, নতুন নতুন কমিশন গঠনের পরিবর্তে একটি মাত্র কমিশনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কমিশনগুলোর কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, যা কার্যকর করতে জনগণের সচেতনতা জরুরি।

 

তিনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষা জবাবদিহি শক্তিশালী করে এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মূল ভিত্তি হলো একটি স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার মবের কাছে নতজানু অবস্থানে রয়েছে এবং জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ ও আমলাতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করার বদলে তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হচ্ছে। এসব বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সীমান্ত নিরাপত্তা সংকটের পেছনে পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত দুর্বলতার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে।

 

অধ্যাপক আবু সাঈদ বলেন, এই নির্বাচনকে সঠিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায় না, কারণ এটি নির্বাচিত ও পক্ষপাতদুষ্টভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি জনগণের ইচ্ছা বা কল্যাণকে প্রতিফলিত করে না। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে দেশ গভীর সংকটে পড়বে।

 

তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা—উভয়ই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত না হলে জনআস্থা আরও দুর্বল হবে এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গোলাম সারওয়ার মিলন বলেন, কেবল নির্বাচনে জয়লাভ করলেই কোনো দলকে বৈধ শাসক হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, যদি সেই জয় বিশ্বাসযোগ্য ও ন্যায্য না হয়। তাই একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর আচরণবিধি থাকা অপরিহার্য।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় নিরাপত্তাকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। নীল অর্থনীতি এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নাগরিকদের ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে।

 

গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, সামরিক শাসন, অন্তর্বর্তী সরকার বা নির্বাচিত সরকার—কোনোটির অধীনেই দেশের চরিত্রগত মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের সময়েও হত্যা, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘন বেশি ঘটেছে এবং জুলাই বিপ্লবের পরও রাষ্ট্রীয় আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। শেষদিকে পুলিশ বাহিনীর কিছু তৎপরতা থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিজিবির উপস্থিতির মধ্যেই অপরাধীরা কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছে—সে প্রশ্ন তুলে তিনি আত্মসমালোচনার অভাবের কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করতে হবে; রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বাহিনীগুলোর ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

 

ড. মোশতাক হোসেন বলেন, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আসলে কাদের জন্য—সাধারণ মানুষের নাকি কেবল উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের জন্য—এই মৌলিক প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা জোরদার হলেও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়, যা মূল সংকটকে তুলে ধরে।

 

ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা বাড়াতে হবে এবং অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রিকরণ থেকে সরে আসতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা একটি বিস্তৃত ধারণা এবং নন-ট্র্যাডিশনাল নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে জাতীয় নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ওপর থেকে নিচের পদ্ধতির পাশাপাশি নিচ থেকে ওপরে যাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, অর্থের বিনিময়ে এনআইডি পাওয়া রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি, যার পেছনে সততার অভাব বড় কারণ।

 

তিনি বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতা জরুরি। ভিন্নমত গ্রহণের মানসিকতা ছাড়া অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে এখনো কোনো কমিশন গঠিত না হওয়া একটি বড় ঘাটতি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ভিত্তি হলো জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে সরকার, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য।

 

তিনি আরও বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো বহুমাত্রিক, যা মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা মূলত দেশের শাসকদের ওপর নির্ভর করে এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় এটি একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। ক্ষমতাসীনদের আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের কারণে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রকৃত গণতন্ত্র কেবল নামেই ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলেছে এবং জনস্বার্থের বদলে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। মব সহিংসতার সংস্কৃতি তারই ফল। বিপ্লবের পরও এ সংস্কৃতির পরিবর্তন না হওয়া প্রমাণ করে যে সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, এককালীন উদ্যোগ নয়।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল উ কান থেইন বলেন, দেশের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে সততা অপরিহার্য; সততা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যকর হয় না। তিনি বলেন, আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংস্কারই মূল ভিত্তি, কারণ সততা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতা না থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করেন, তবে দেশের আমূল পরিবর্তন সম্ভব। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনীতিমুক্ত ও পেশাদার করার ওপর জোর দেন এবং নির্বাচনের সময় তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের কথা বলেন।

জাহেদ উর রহমান বলেন, নির্বাচিত সরকারের হাত ধরেই অনেক সময় শাসনব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী রূপ নেয়। তিনি বলেন, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে ২০২২ সাল থেকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভাঙন স্পষ্ট হয়েছে, যার ফলে বিশ্ব আজ অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। চীন–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

 

তিনি বলেন, এসব বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা এখন একটি প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত না হলে দেশ গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর বলেন, সিআইডি ও এনএসআইসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অতীতে তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ রিমান্ড অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ আয়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে এবং এতে জবাবদিহির অভাব রয়েছে। একইভাবে, ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচার বিভাগে অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। জুলাই আন্দোলনের পর সংসদ ও আইন প্রণয়ন পর্যায়ে অর্থবহ আলোচনা না হওয়াকে তিনি বড় ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

 

তার মতে, সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, নতুন সংস্কারের আগে বিদ্যমান আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অন্তত অর্ধেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

মেজর (অব.) এ এস এম শামসুল আরেফিন বলেন, একসময় সমাজই রাষ্ট্রকে পথ দেখাত বলে ধারণা ছিল। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র কি সমাজ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, নাকি রাষ্ট্রই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র নাগরিকদের এমন সব সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে দিচ্ছে, যা নাগরিকদের নিজস্ব হওয়া উচিত—কাকে ভোট দেবেন বা কীভাবে নাগরিক জীবন পরিচালনা করবেন। ফলে সাধারণ মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, জনগণের স্বার্থে কাজ করার কথা বলা হলেও প্রকৃত প্রশ্ন থেকে যায়—জনগণ কি যথাযথভাবে শিক্ষিত হয়েছে? তারা কি নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন? ব্রিটিশ শাসনামল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অনেক দমনমূলক আইন এখনো বহাল রয়েছে, যেগুলো সংস্কার বা বাতিলের উদ্যোগ খুবই সীমিত।

 

ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার ঘাটতি এখন একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তথ্য ফাঁস কীভাবে অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলতে পারে, তার উদাহরণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে। দেশ বর্তমানে কেবল জাতীয় নিরাপত্তাহীনতাই নয়, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তাহীনতারও মুখোমুখি। জাতীয় ও রাজনৈতিক পুনর্মিলন এখন সময়ের দাবি। তিনি আরও বলেন, সমাজে মব সংস্কৃতি ও ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় উগ্রতার প্রবণতা দেশকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

মেজর জেনারেল (অব) মনিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, নাগরিকরা চাইলে অনেক কিছুই করতে পারেন। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আইনের আওতায় থেকে নাগরিকদের হস্তক্ষেপ করা উচিত এবং যুক্তিসংগত ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়তারও আইনি পরিণতি থাকা দরকার। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে আইন সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠী আইন প্রয়োগের প্রধান শিকার হলেও অর্থ ও প্রভাবশালীরা প্রায়ই দায়মুক্তি পেয়ে যান। উন্নত দেশগুলোতে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়, যেখানে রাষ্ট্রপ্রধানরাও অপরাধ করলে আইনের আওতায় আসেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি বলেন, এখনই সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন। দেশজুড়ে তাদের ছড়িয়ে পড়া গুরুতর নিরাপত্তা ও সামাজিক সমস্যা তৈরি করছে, যার মধ্যে অপরাধে জড়ানোর ঘটনাও রয়েছে। হয় তাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিতে হবে, নয়তো প্রশিক্ষণ ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সমাজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

নিখিল দাস বলেন, নির্বাচন সামনে আসলেও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বড় অংশ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে এবং দীর্ঘ আলোচনার পরও বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও বিচার ব্যবস্থার বিষয়ে জনমত বদলাচ্ছে। বিশেষ করে পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে।

 

ইবনুল সাইয়েদ রানা বলেন, বিপ্লবের পর বহু সংস্কারের প্রত্যাশা থাকলেও তার অনেকগুলোই বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়ে জনমনোযোগও ছিল সীমিত। সংস্কার নিশ্চিত না করে দ্রুত নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, প্রতিশ্রুত সংস্কার ছাড়া নির্বাচন এগোলে বিপ্লবের যৌক্তিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

 

ব্যারিস্টার এম. সারওয়ার হোসেন বলেন, জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ও অভিন্ন ধারণা গড়ে তোলা এখন জরুরি। ক্ষমতাবানদের মধ্যে স্বজনপ্রীতি ও বিশ্বাসঘাতকতা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক নিরাপত্তা দুর্বল থাকায় অর্থপাচার ও সম্পদ বিদেশে স্থানান্তরের প্রবণতা বেড়েছে।

তিনি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের আগে ভয়মুক্ত ও সমান সুযোগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের আনতে হবে, যাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার জাতীয় স্বার্থ।