৫৪ বছরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি ১৪ শহীদের
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৪৫:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 109
মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পার হলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় ঋষি সম্প্রদায়ের ১৪ জন শহীদের নাম আজও কোনো রাষ্ট্রীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। নেই কোনো স্মৃতিফলক, নামফলক বা সরকারি স্বীকৃতির দৃশ্যমান চিহ্ন। ফলে তাদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের আড়ালেই থেকে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কসবা উপজেলার বিনাউটি ইউনিয়নের রাউৎহাট ঋষিপাড়ায় ১৯৭১ সালে সংঘটিত এই গণহত্যার ঘটনা এলাকায় পরিচিত হলেও তা কখনোই সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ার কারণেই শহীদ পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে।
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন হলেও ওই ১৪ শহীদের নাম কোনো তালিকায় স্থান পায়নি। এতে করে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মত্যাগ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী স্থানীয় রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার অভিযোগে রাউৎহাট ঋষিপাড়ায় হামলা চালায়। ওই দিন ঋষি সম্প্রদায়ের ১৪ জন নিরীহ মানুষকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। পরে বেয়নেট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে তাদের মরদেহ সড়কে ফেলে রেখে যায় হানাদাররা।
পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় শহীদদের মরদেহ একটি গণকবরে দাফন করা হয়। তবে সেই গণকবরও আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের আওতায় আসেনি।
শহীদ জৌগেন্দ্র ঋষির ছেলে রাজকুমার ঋষি বলেন, ঘটনার সময় তিনি খুব ছোট ছিলেন। তার বাবা ভাত খেতে বসেছিলেন, এমন সময় রাজাকাররা এসে তাকে আরও ১৩ জনের সঙ্গে ধরে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারেন, সবাইকে ব্রাশফায়ার করে বেয়নেট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দেওয়া ও সহযোগিতা করাই ছিল তাদের একমাত্র অপরাধ।
একই গ্রামের যুবক কনক কান্ত ঋষি বলেন, তাদের পূর্বপুরুষরা জীবন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সহায়তা করেছিলেন। অথচ আজ তাদের নাম কোনো রাষ্ট্রীয় তালিকায় নেই। তিনি বলেন, তারা ভিক্ষা চান না, তারা চান ন্যায্য স্বীকৃতি।
আরেক যুবক জীবন ঋষি বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও শহীদদের নাম তালিকাভুক্ত না হওয়া চরম অপমানের বিষয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শুধু ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ার কারণেই কি তাদের আত্মত্যাগ অস্বীকৃত থাকবে?
স্থানীয় বাসিন্দা মোদক ঋষি বলেন, এটি শুধু কয়েকটি পরিবারের নয়, পুরো একটি পাড়ার ইতিহাস। এই ইতিহাস অস্বীকার করা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে অবিচার।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম বলেন, রাউৎহাট ঋষিপাড়ার মানুষরা মুক্তিযুদ্ধের সময় কখনো পিছিয়ে ছিল না। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, খাবার ও তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে। দ্রুত তাদের নাম রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে তিনি মত দেন।
এ বিষয়ে কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছামিউল ইসলাম বলেন, রাউৎহাট ঋষিপাড়ার শহীদদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। তিনি জানান, তিনি সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবেন। যাচাই-বাছাই শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও স্মৃতিফলক নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




































