অবৈধ নির্মাণে ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি
লামায় অনুমোদনহীন ৮৯ রিসোর্ট
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:০২:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
- / 145
প্রকৃতির আঁচলে লুকিয়ে থাকা ব্যাঙের ছাতা এলাকা একসময় ছিল পর্যটকদের স্বর্গ-আর স্থানীয়দের গর্ব। কিন্তু এখন সেই স্বর্গরাজ্য পরিণত হয়েছে লুটপাটে মত্ত বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর অঘোষিত দখলদারিতে। বান্দরবানের লামা উপজেলার মিরিঞ্জা পাহাড়জুড়ে চলছে পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস ও জলাধার ভরাটের ভয়াবহতা। উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংসের এই বেপরোয়া দৌরাত্ম্য স্থানীয়দের আতঙ্কে ফেলেছে।
মিরিঞ্জা পাহাড়ে পাহাড় কেটে, বনভূমি উজাড় করে এবং প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৮৯টি অনুমোদনহীন রিসোর্ট ও কটেজ। এসব নির্মাণ হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে-কিন্তু প্রশাসন থাকছে নীরব। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ কার্যক্রম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পরিবেশবিদদের মতে, ব্যাঙের ছাতায় যা ঘটছে তা পরিকল্পিত পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড। পাহাড় কেটে দুর্বল কাঠামোর কটেজ বানানো হচ্ছে-যেখানে সামান্য ভূমিধস বা অতিবৃষ্টিতেই বড় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এতে শুধু পরিবেশই নয়, পর্যটক ও স্থানীয়দের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ছে।
নিরাপত্তাহীন রিসোর্ট, বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা
রিসোর্টগুলোর অধিকাংশেই নেই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা এবং ন্যূনতম নিরাপত্তা অবকাঠামো।
তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে দলে দলে পর্যটক আকর্ষণ করছে এসব প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের অভিযোগ-অবৈধ ব্যবসার আড়ালে চলছে বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড, মাদক সেবন, সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং রাতের আঁধারে নানা ধরনের লেনদেন। এর ফলে এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে অস্বস্তিকর তথ্য। অনেক অনুমোদিত রিসোর্টেই ম্যানেজমেন্টের নামে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিককে মাসিক চাঁদা দেওয়া হতো। আবার কিছু কটেজে তারা শেয়ারহোল্ডার বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমনই একটি উদাহরণ-‘মেঘবেলা’ নামের সাংবাদিক কটেজ, যার মালিকানা দাবি করেন একজন স্থানীয় সাংবাদিক। কটেজটিরও কোনো সরকারি অনুমোদন নেই।
মিরিঞ্জা পাহাড়ের ধার ঘেঁষে লামা-চকরিয়া সড়ক সংলগ্ন এলাকায় দূর যতদূর চোখ যায়-শুধু কটেজের সারি। অধিকাংশই গড়ে উঠেছে কাঠ, টিন ও ছন দিয়ে। কোথাও পাহাড় কেটে, কোথাও বন উজাড় করে তৈরি হয়েছে এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো।
মিরিঞ্জা ভ্যালীর স্বত্বাধিকারী মালিক জিয়াউর রহমান জানান-এলাকায় ৮৯টির মতো রিসোর্ট আছে, তার বেশিরভাগই অনুমোদনহীন। বহুবার অনুমোদন নেওয়ার কথা বলা হলেও মালিকরা অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, আগে অভিযান চালানো হলেও বর্তমানে ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত তদারকি করা যাচ্ছে না।
লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন জানান, মিরিঞ্জা পাহাড়ের অধিকাংশ কটেজই অবৈধ। নতুন করে অনুমোদনের আবেদন বাছাই চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরিবেশগত অভিযান প্রয়োজন।
স্থানীয়রা বলছেন-যদি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, ব্যাঙের ছাতা এলাকার পরিবেশগত ক্ষতি আর কখনও পূরণ করা যাবে না। অবৈধ রিসোর্ট উচ্ছেদ, পাহাড়-বন পুনরুদ্ধার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
ব্যাঙের ছাতার এই অবৈধ দখলদারি শুধু পরিবেশ নয়-একটি পুরো অঞ্চলের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
































