ঢাকা ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নরসিংদীর ভূমিকম্প নিয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:৪৫:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
  • / 1997

নরসিংদীর ভূমিকম্প নিয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ

নরসিংদীর মাধবদীতে শুক্রবার যে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, তা মুহূর্তেই কাঁপিয়ে তোলে রাজধানীসহ পুরো দেশকে। ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এই কম্পনে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচশরও বেশি মানুষ।

দেশি-বিদেশি গবেষণা সংস্থা ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে মাটির প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে শক্তির সঞ্চয় ঘটায় এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, প্রায় সাত কোটি মানুষ বিভিন্ন মাত্রার ঝাঁকুনি অনুভব করেছেন। আবহাওয়া বিভাগও এই ভূমিকম্পকে সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

শুক্রবারের পর শনিবার আরও দু’বার একই এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩ ও ৪ দশমিক ৩। উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর পলাশ উপজেলা।

এর পরপরই প্রশ্ন উঠেছে, কেন নরসিংদী—যে এলাকা সাধারণত বড় ভূমিকম্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নয়—হঠাৎ এমন শক্তিশালী কম্পনের উৎস হয়ে উঠল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, নরসিংদীর ভূমিকম্প মূলত ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মিজ প্লেটের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে হয়েছে। পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত এবং এগুলো ভূগর্ভস্থ তরলের ওপর ভাসমান অবস্থায় থাকে।

তিনি বলেন, প্লেটগুলো একে অন্যকে ধাক্কা দেওয়া, সরে যাওয়া বা ফাটল সৃষ্টি করার মধ্য দিয়েই শক্তি সঞ্চিত হয়। যখন সেই শক্তি শিলার ধারণক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন ফাটল বা শিলাখণ্ডের হঠাৎ সরে যাওয়ার ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।

নরসিংদীর ভূমিকম্প নিয়ে আরও যা জানা গেল

ইউএসজিএস জানায়, যে অঞ্চলে শুক্রবারের ভূমিকম্প হয়েছে, সেখানেই ১৯৫০ সালের পর থেকে ৫ দশমিক ৫ বা তার বেশি মাত্রার ১৪টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ভূমিকম্পের প্রধান দুটি উৎস—ডাউকি ফল্ট এবং সিলেট থেকে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত দীর্ঘ একটি ফল্ট জোন। দুটিকেই বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করেন।

টেকটোনিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের পশ্চিমে রয়েছে ইন্ডিয়ান প্লেট, পূর্বে বার্মা প্লেট এবং উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বার্মা প্লেটের নিচে—অর্থাৎ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচে—তলিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, তলিয়ে যাওয়ার কারণে একটি সাবডাকশন জোন তৈরি হয়েছে, যার ব্যাপ্তি সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল এই জোনের আওতায়। এই অঞ্চলে বিভিন্ন সেগমেন্ট রয়েছে এবং আমাদের এই সেগমেন্টে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তি জমা হয়ে আছে। এই শক্তি অবশ্যই বের হবে।

তার মতে, নরসিংদীর মাধবদীতে যে ভূমিকম্পের উৎস, তা এই সেগমেন্টেরই অংশ। দুই প্লেটের সংযোগস্থলেই সেখানে শক্তি সঞ্চয় হয়েছিল।

তিনি বলেন, এখানে প্লেট লকড অবস্থায় ছিল। এর অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ খুলে যাওয়ার ফলেই শুক্রবারের ভূমিকম্প হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামনে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

হুমায়ুন আখতার আরো বলেন, বড় প্লেট বাউন্ডারির সামান্য শক্তি বেরিয়ে যাওয়ার মানেই সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। কারণ শক্তি বের হওয়ার পথ সহজ হয়ে গেছে।

৮০০ বছর ধরে শক্তি জমছে

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংযোগস্থলে ৮০০ বছরের বেশি সময় ধরে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে। সেখানে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়ার মতো শক্তি জমা আছে।

তিনি বলেন, এই শক্তি একসময় বের হবেই। নরসিংদীর ভূমিকম্পের ফলে বড় শক্তি বের হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়েছে। আর সেটি হলে ঢাকা নগরী অনেক বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। তাই এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ইতিহাসে দেখা যায়, বাংলাদেশ অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প নদীর গতিপথ পর্যন্ত বদলে দিয়েছে। ১৭৯৭ সালের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ বদলে গিয়ে মেঘনা নদীর বর্তমান অবস্থান তৈরি হয়।

১৭৬২ সালে টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উঁচু হয়ে যায়।

সিলেট-মৌলভীবাজার-কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে ১৯২২ সালের ভূমিকম্প ছিল ৭.৬ মাত্রার। এর আগে ১৮৬৮ সালে একই অঞ্চলে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।

ডাউকি ফল্ট অঞ্চলে সুনামগঞ্জ-জৈন্তাপুর এলাকায় ১৮৯৭ সালে হয়েছিল ৮ দশমিক ৭ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্প।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যে ফল্টেই বড় ভূমিকম্প হোক, সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকবে অপরিকল্পিত নগরায়ণের শহর ঢাকা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

নরসিংদীর ভূমিকম্প নিয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ

সর্বশেষ আপডেট ০৮:৪৫:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫

নরসিংদীর মাধবদীতে শুক্রবার যে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, তা মুহূর্তেই কাঁপিয়ে তোলে রাজধানীসহ পুরো দেশকে। ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এই কম্পনে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচশরও বেশি মানুষ।

দেশি-বিদেশি গবেষণা সংস্থা ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে মাটির প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে শক্তির সঞ্চয় ঘটায় এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, প্রায় সাত কোটি মানুষ বিভিন্ন মাত্রার ঝাঁকুনি অনুভব করেছেন। আবহাওয়া বিভাগও এই ভূমিকম্পকে সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

শুক্রবারের পর শনিবার আরও দু’বার একই এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩ ও ৪ দশমিক ৩। উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর পলাশ উপজেলা।

এর পরপরই প্রশ্ন উঠেছে, কেন নরসিংদী—যে এলাকা সাধারণত বড় ভূমিকম্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নয়—হঠাৎ এমন শক্তিশালী কম্পনের উৎস হয়ে উঠল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, নরসিংদীর ভূমিকম্প মূলত ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মিজ প্লেটের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে হয়েছে। পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত এবং এগুলো ভূগর্ভস্থ তরলের ওপর ভাসমান অবস্থায় থাকে।

তিনি বলেন, প্লেটগুলো একে অন্যকে ধাক্কা দেওয়া, সরে যাওয়া বা ফাটল সৃষ্টি করার মধ্য দিয়েই শক্তি সঞ্চিত হয়। যখন সেই শক্তি শিলার ধারণক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন ফাটল বা শিলাখণ্ডের হঠাৎ সরে যাওয়ার ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।

নরসিংদীর ভূমিকম্প নিয়ে আরও যা জানা গেল

ইউএসজিএস জানায়, যে অঞ্চলে শুক্রবারের ভূমিকম্প হয়েছে, সেখানেই ১৯৫০ সালের পর থেকে ৫ দশমিক ৫ বা তার বেশি মাত্রার ১৪টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ভূমিকম্পের প্রধান দুটি উৎস—ডাউকি ফল্ট এবং সিলেট থেকে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত দীর্ঘ একটি ফল্ট জোন। দুটিকেই বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করেন।

টেকটোনিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের পশ্চিমে রয়েছে ইন্ডিয়ান প্লেট, পূর্বে বার্মা প্লেট এবং উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বার্মা প্লেটের নিচে—অর্থাৎ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচে—তলিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, তলিয়ে যাওয়ার কারণে একটি সাবডাকশন জোন তৈরি হয়েছে, যার ব্যাপ্তি সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল এই জোনের আওতায়। এই অঞ্চলে বিভিন্ন সেগমেন্ট রয়েছে এবং আমাদের এই সেগমেন্টে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তি জমা হয়ে আছে। এই শক্তি অবশ্যই বের হবে।

তার মতে, নরসিংদীর মাধবদীতে যে ভূমিকম্পের উৎস, তা এই সেগমেন্টেরই অংশ। দুই প্লেটের সংযোগস্থলেই সেখানে শক্তি সঞ্চয় হয়েছিল।

তিনি বলেন, এখানে প্লেট লকড অবস্থায় ছিল। এর অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ খুলে যাওয়ার ফলেই শুক্রবারের ভূমিকম্প হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামনে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

হুমায়ুন আখতার আরো বলেন, বড় প্লেট বাউন্ডারির সামান্য শক্তি বেরিয়ে যাওয়ার মানেই সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। কারণ শক্তি বের হওয়ার পথ সহজ হয়ে গেছে।

৮০০ বছর ধরে শক্তি জমছে

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংযোগস্থলে ৮০০ বছরের বেশি সময় ধরে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে। সেখানে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়ার মতো শক্তি জমা আছে।

তিনি বলেন, এই শক্তি একসময় বের হবেই। নরসিংদীর ভূমিকম্পের ফলে বড় শক্তি বের হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়েছে। আর সেটি হলে ঢাকা নগরী অনেক বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। তাই এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ইতিহাসে দেখা যায়, বাংলাদেশ অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প নদীর গতিপথ পর্যন্ত বদলে দিয়েছে। ১৭৯৭ সালের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ বদলে গিয়ে মেঘনা নদীর বর্তমান অবস্থান তৈরি হয়।

১৭৬২ সালে টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উঁচু হয়ে যায়।

সিলেট-মৌলভীবাজার-কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে ১৯২২ সালের ভূমিকম্প ছিল ৭.৬ মাত্রার। এর আগে ১৮৬৮ সালে একই অঞ্চলে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।

ডাউকি ফল্ট অঞ্চলে সুনামগঞ্জ-জৈন্তাপুর এলাকায় ১৮৯৭ সালে হয়েছিল ৮ দশমিক ৭ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্প।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যে ফল্টেই বড় ভূমিকম্প হোক, সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকবে অপরিকল্পিত নগরায়ণের শহর ঢাকা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা