রাজসাক্ষী আবজালুলকে জেরা ঘিরে ট্রাইব্যুনালে উত্তেজনা
- সর্বশেষ আপডেট ০২:২২:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
- / 96
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পোড়ানোর অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় রাজসাক্ষী এসআই শেখ আবজালুল হকের জবানবন্দি ও জেরা কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। জেরা চলাকালে একটি প্রশ্ন নিয়ে প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীদের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তর্কাতর্কি চলে।
বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) বেলা ১১টা পেরোনোর পর বিচারপতি অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বে গঠিত দুই সদস্যের বেঞ্চে এ ঘটনা ঘটে। অন্য সদস্য ছিলেন জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
জেরা চলার সময় উত্তপ্ত পরিস্থিতি
সকালে সাড়ে ১০টার পর সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ১৬ জন আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় রাজসাক্ষী আবজালুলের জেরা শুরু হয়। একপর্যায়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুর রহমান জানতে চান, “গত বছরের ৫ আগস্ট থানার কোনো পুলিশ সদস্য মারা গিয়েছিলেন কি না?” জবাবে সাক্ষী বলেন, “না, তবে অন্য ইউনিটের একজন মারা গিয়েছিলেন, যার তদন্তের দায়িত্ব আমার ওপর ছিল, কিন্তু তা শেষ করতে পারিনি।”
প্রসিকিউশন সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটির বিরোধিতা করলে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ তর্ক শুরু হয়। শেষে ট্রাইব্যুনালের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
আগের দিনের জবানবন্দি নিয়ে আলোচনার ঝড়
বুধবার ২৩তম সাক্ষী হিসেবে হাজির হয়ে আবজালুল তাঁর জানা তথ্য তুলে ধরেন। তবে অনেক বিষয় জবানবন্দিতে উল্লেখ না হওয়ায় আদালতকক্ষে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, তিনি ‘যতটুকু জানেন সবই বলেছেন’; কিন্তু আদালত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে গেছেন তিনি।
সেদিন সকাল ১১টার দিকে তিনি সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন এবং প্রায় ৫০ মিনিটে জবানবন্দি সম্পন্ন করেন। তিনি জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনাটি তিনি নিজ চোখে দেখেননি—১৫ আগস্ট থানায় অস্ত্র-গুলি জমা দিতে গেলে সহকর্মীদের মাধ্যমে ঘটনা জানতে পারেন। তাঁর মতে, ওইদিন লাশ পোড়ানোর কাজে জড়িত ছিলেন ওসি সায়েদ ও এএসআই বিশ্বজিৎ। জবানবন্দির শেষে তিনি আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
মামলার অগ্রগতি
এই মামলায় চলতি বছরের ২১ আগস্ট ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল বিচার শুরুর নির্দেশ দেয়। উপস্থিত আটজন আসামির মধ্যে সাতজন অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু এসআই আবজালুল নিজের দোষ স্বীকার করেন এবং রাজসাক্ষী হয়ে পুরো সত্য আদালতকে জানানোর আবেদন করেন। তাঁর দোষ স্বীকারের অংশ ট্রাইব্যুনাল রেকর্ড করে এবং লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে তাঁকে রাজসাক্ষী হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
নির্ধারিত দিনেও কয়েকবার সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি—১২ ও ১৮ নভেম্বর সাক্ষী হাজির করতে পারেনি প্রসিকিউশন। ৫ নভেম্বর ২২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শী সজিব আদালতে উপস্থিত হয়ে জানান, তাঁর সামনেই একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান এবং তাঁর বন্ধু সাজ্জাদ হোসেন সজলকে পুলিশ আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে।
এর আগে ৩০ অক্টোবর ভুক্তভোগী সানি মৃধা আদালতে বলেন, সেই দিন পুলিশের গুলিতে তিনিও আহত হন এবং নিজের চোখে নির্মমতা প্রত্যক্ষ করেন। আরও আগে ২৯ অক্টোবর জব্দতালিকার সাক্ষী হিসেবে এসআই আশরাফুল হাসান জানান, ১৪ এপ্রিল তিনি ছয় রাউন্ড রাইফেলের গুলি উদ্ধার করে থানায় জমা দেন।
১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম সাক্ষ্য দেন শহীদ আস সাবুরের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম এবং শহীদ সাজ্জাদের বাবা খলিলুর রহমান। মামলার শুরুতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম গত বছরের ৫ আগস্ট আশুলিয়ার নৃশংস ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন।
মামলার নথিপত্র
প্রসিকিউশন গত ২ জুলাই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয়। অভিযোগের সঙ্গে ৩১৩ পৃষ্ঠার তথ্য, ৬২ জন সাক্ষীর তালিকা, ১৬৮ পৃষ্ঠার প্রামাণ্য কাগজপত্র ও দুটি পেনড্রাইভ যুক্ত করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল এসব বিবেচনায় ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়।
































