দেড় যুগ পরও অরক্ষিত উপকূল
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৩৯:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫
- / 78
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের বিধ্বংসী আঘাতে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছিল। ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে মুহূর্তেই ডুবে যায় অসংখ্য গ্রাম, প্রাণ হারান শত শত মানুষ। দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও সেদিনের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় উপকূলবাসীকে। বরং নতুন ভাঙন, দুর্বল বেড়িবাঁধ আর নদীশাসনের অভাবে মানুষকে প্রতিদিনই আশঙ্কায় থাকতে হয়।
শরণখোলার চালতাবুনিয়া গ্রামের মোহাম্মদ মোশারফ হাওলাদার সেই রাতের কথা ভুলতে পারেননি আজও। সিডরেই তিনি একসঙ্গে হারান বাবা আব্দুল করিম, মা কুলসুম, বোন আকলিমা, স্ত্রী এবং মাত্র দুই মাস বয়সী মেয়ে। তিনি জানান, “সেদিন সন্ধ্যার পর পানি ঘরে ঢুকতে থাকে। সবাই মাচায় উঠে আশ্রয় নেয়। ঝড়ের সময় বড় গাছ এসে ঘরের ওপর আছড়ে পড়লে তারা আটকা পড়ে মারা যায়। আমি তখন কাজের জন্য ভান্ডারিয়ায় ছিলাম, তাই কারও মুখটাও শেষবার দেখতে পারিনি।”
মোশারফ জানান, ঝড়ে ও নদীভাঙনে তাদের অনেক জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন দিনমজুরির কাজ করে চলে সংসার।
মোরেলগঞ্জের আমতলা গ্রামের বাসিন্দা জাহানারা বেগমও ক্ষতিগ্রস্তদের একজন। তার শাশুড়িকে হারিয়েছেন সিডরে। তিনি ক্ষোভ ঝাড়েন, “সিডরের পর থেকে আজ পর্যন্ত আমরা ভাসমান জীবন কাটাচ্ছি। সরকার বা জনপ্রতিনিধিরা কেউই টেকসই কাজ করছে না। যে বেড়িবাঁধটা ছিল, সেটাও নদীতে মিশে গেছে। শুনছি কোটি কোটি টাকার কাজ হয়, কিন্তু তার কোনো ফল পাই না। এবার বড় বন্যা এলে আমরা বাঁচব কিনা তা নিয়েই শঙ্কায় আছি।”
একই গ্রামের রমজান শেখ বলেন, “সিডরের কথা মনে পড়লেই চোখ ভিজে যায়। নতুন করে যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে, তাও অনেক জায়গা দিয়ে ভেঙে গেছে। নদীশাসন না করলে কোনো বাঁধই টিকবে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সিডরের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে।”
তিনি আরও জানান, সিডরের পানিতে বহু ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যায়। পরে নদীভাঙনে বাকি জমিও নদীতে তলিয়ে গেছে। এখন জীবিকা চালাতে নদীতে মাছ ধরা ও অন্যের জমিতে কাজই ভরসা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড–বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, টানা বৃষ্টিতে বেড়িবাঁধ ও ব্লকের মাটি নরম হয়ে ভেঙে পড়েছে। বেশ কয়েকটি স্থানে ফাটল ও ভাঙন দেখা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতের কাজ পরিকল্পনায় রয়েছে। একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, বাকিগুলোও শিগগিরই শুরু হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সিডরে বাগেরহাট জেলায় ৯০৮ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন ১১ হাজার ৪২৮ জন। ৬৩ হাজার ৬০০টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং ১ লাখ ৬ হাজার ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং প্রায় ৫০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক নষ্ট হয়। মারা যায় ১৭ হাজার ৪২৩টি গবাদিপশু। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১২ হাজার হেক্টর কৃষিজমির ফসল এবং ৮ হাজার ৮৮৯ হেক্টর চিংড়িঘের।




































