ঢাকা ১০:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হাজারিখিল অভয়ারণ্যে মহাবিপন্ন বনরুই

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ নভেম্বর ২০২৫
  • / 105

হাজারিখিল অভয়ারণ্যে মহাবিপন্ন বনরুই

সত্তরের দশকে বাংলাদেশে তিন ধরনের বনরুইয়ের অস্তিত্ব ছিল। এর মধ্যে এশীয় বৃহৎ বনরুই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, চায়না বনরুইও বিলুপ্তপ্রায়। একমাত্র ভারতীয় বনরুই বেঁচে আছে; তবে হরহামেশা দেখা মেলে না। বর্তমানে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে দুটি পয়েন্টে অবাধে বিচরণ করছে এই মহাবিপন্ন প্রাণী। নিশাচর হওয়ায় দিনে বনরুই নিজের খোঁড়া ৮–১০ ফুট গভীর মাটির গর্তে থাকে। সন্ধ্যা নামতেই গর্ত থেকে বের হয়ে খাবারের খোঁজে বনে বিচরণ করে।

বনরুইয়ের ইংরেজি নাম ‘Pangolin’। দাঁত না থাকার কারণে আগে এদের দন্তহীন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দলে রাখা হতো। তবে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্তমানে আলাদা একটি দল ফোলিডাটা (Pholidata)-র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত বনরুইয়ের শরীরের দৈর্ঘ্য ৬০–৭৫ সেন্টিমিটার, লেজ ৪৫ সেন্টিমিটার। বুক ও পেটে সামান্য লোম থাকে। নাক সরু ও চোখা, জিহ্বা লম্বা ও আঠালো। চোখ-কান সরু। সামনের নখরগুলো পেছনের তুলনায় দ্বিগুণ লম্বা। পিঠ, পাশ, হাত-পায়ের উপরদিক ও লেজ বড় বড় ত্রিকোণ শক্ত আঁশে ঢাকা থাকে। নিচের চামড়া থেকে আঁশ গজায় এবং বুকের দিক ছাড়া গোটা শরীর রক্ষা পায়। আঁশ একে একে ঝরে পড়ে ও নতুন করে গজায়।

২০১৫–২০১৮ সালের মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন বনাঞ্চলে ক্যামেরা ট্র্যাপিং করে ‘প্যাঙ্গলিন ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড কনজারভেশন ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ১৯ ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান পেয়েছে। তাদের গবেষণায় পার্বত্যাঞ্চলে বনরুই দেখা মেলেনি। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) বনরুইকে লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ’-এ চায়না বনরুই ও ভারতীয় বনরুইকে মহাবিপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইনে বনরুইকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।

হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি-খাগড়াছড়ির রামগড়ের ১,১৭৭.৫৩ হেক্টর জমিতে অবস্থিত। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে ফটিকছড়ি দিয়ে এখানে যাওয়া যায়। ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

হাজারিখিল অভয়ারণ্যের রেঞ্জ অফিসার সিকদার আতিকুর রহমান জানান, অভয়ারণ্যটি দেশের বন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এখন এক বিরল পাহাড়ি অঞ্চল। অভয়ারণ্যের কালাপানি ছড়া পয়েন্ট ও পাশের পাহাড়—এই দুটি পয়েন্টে সন্ধ্যার পর বনরুই অবাধে বিচরণ করে।

পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বলেন, “হাজারিখিল অভয়ারণ্য বন্য জীব সংরক্ষণে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখানে ১৫০ প্রজাতির পাখি, ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর নিরাপদে বাস করছে। উদ্ভিদ রয়েছে ২৫০ প্রজাতির। জীব ও বৈচিত্র্য সংরক্ষণে হাজারিখিল এখন আমাদের অন্যতম জাতীয় সম্পদ।”

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

হাজারিখিল অভয়ারণ্যে মহাবিপন্ন বনরুই

সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ নভেম্বর ২০২৫

সত্তরের দশকে বাংলাদেশে তিন ধরনের বনরুইয়ের অস্তিত্ব ছিল। এর মধ্যে এশীয় বৃহৎ বনরুই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, চায়না বনরুইও বিলুপ্তপ্রায়। একমাত্র ভারতীয় বনরুই বেঁচে আছে; তবে হরহামেশা দেখা মেলে না। বর্তমানে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে দুটি পয়েন্টে অবাধে বিচরণ করছে এই মহাবিপন্ন প্রাণী। নিশাচর হওয়ায় দিনে বনরুই নিজের খোঁড়া ৮–১০ ফুট গভীর মাটির গর্তে থাকে। সন্ধ্যা নামতেই গর্ত থেকে বের হয়ে খাবারের খোঁজে বনে বিচরণ করে।

বনরুইয়ের ইংরেজি নাম ‘Pangolin’। দাঁত না থাকার কারণে আগে এদের দন্তহীন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দলে রাখা হতো। তবে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্তমানে আলাদা একটি দল ফোলিডাটা (Pholidata)-র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত বনরুইয়ের শরীরের দৈর্ঘ্য ৬০–৭৫ সেন্টিমিটার, লেজ ৪৫ সেন্টিমিটার। বুক ও পেটে সামান্য লোম থাকে। নাক সরু ও চোখা, জিহ্বা লম্বা ও আঠালো। চোখ-কান সরু। সামনের নখরগুলো পেছনের তুলনায় দ্বিগুণ লম্বা। পিঠ, পাশ, হাত-পায়ের উপরদিক ও লেজ বড় বড় ত্রিকোণ শক্ত আঁশে ঢাকা থাকে। নিচের চামড়া থেকে আঁশ গজায় এবং বুকের দিক ছাড়া গোটা শরীর রক্ষা পায়। আঁশ একে একে ঝরে পড়ে ও নতুন করে গজায়।

২০১৫–২০১৮ সালের মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন বনাঞ্চলে ক্যামেরা ট্র্যাপিং করে ‘প্যাঙ্গলিন ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড কনজারভেশন ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ১৯ ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান পেয়েছে। তাদের গবেষণায় পার্বত্যাঞ্চলে বনরুই দেখা মেলেনি। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) বনরুইকে লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ’-এ চায়না বনরুই ও ভারতীয় বনরুইকে মহাবিপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইনে বনরুইকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।

হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি-খাগড়াছড়ির রামগড়ের ১,১৭৭.৫৩ হেক্টর জমিতে অবস্থিত। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে ফটিকছড়ি দিয়ে এখানে যাওয়া যায়। ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

হাজারিখিল অভয়ারণ্যের রেঞ্জ অফিসার সিকদার আতিকুর রহমান জানান, অভয়ারণ্যটি দেশের বন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এখন এক বিরল পাহাড়ি অঞ্চল। অভয়ারণ্যের কালাপানি ছড়া পয়েন্ট ও পাশের পাহাড়—এই দুটি পয়েন্টে সন্ধ্যার পর বনরুই অবাধে বিচরণ করে।

পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বলেন, “হাজারিখিল অভয়ারণ্য বন্য জীব সংরক্ষণে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখানে ১৫০ প্রজাতির পাখি, ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর নিরাপদে বাস করছে। উদ্ভিদ রয়েছে ২৫০ প্রজাতির। জীব ও বৈচিত্র্য সংরক্ষণে হাজারিখিল এখন আমাদের অন্যতম জাতীয় সম্পদ।”