আ.লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি
- সর্বশেষ আপডেট ০১:০৮:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫
- / 377
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ১২টি সুপারিশ কার্যকর করতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি যৌথভাবে খোলা চিঠি দিয়েছে ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। সেই সঙ্গে তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে মৌলিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইন সংস্কার শুরু করা এবং গুম ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রশংসা জানিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিজস্ব ওয়েবসাইটে খোলা চিঠি প্রকাশ করা হয়। যে ১২টি সুপারিশ সরকারের জন্য তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো হলো— জবাবদিহিতা ও বিচারের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা খাতে সংস্কার, গুমের অপরাধ নির্ধারণ ও তদন্ত কমিশন শক্তিশালীকরণ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার, ব্যক্তির স্বাধীনতা রক্ষায় আইন সংস্কার, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নজরদারি সীমিতকরণ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সিভিল সোসাইটি ও এনজিওর স্বাধীনতা, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে সহযোগিতা।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সংস্থাগুলো হলো— সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, ফর্টিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট।
চিঠির শুরুতে সরকারের প্রশংসা করে বলা হয়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে অল্প সময়ের এই অন্তর্বর্তী সময়ে মানবাধিকার সুরক্ষা আরও বিস্তৃত করতে এবং বাংলাদেশে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আহ্বান জানানো হয়, যা স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করবে এবং ভবিষ্যতে পুনরায় কর্তৃত্ববাদী শাসনের ঝুঁকি প্রতিহত করবে। নিরাপত্তা খাতে এখনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য এখনো জবাবদিহিতা ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছে না।
পূর্ববর্তী সরকারের অধীনে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি চলমান নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট যেসব মামলার যথাযথ প্রমাণ নেই বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়— তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
জাতিসংঘের রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হচ্ছে স্বদেশ প্রত্যাবাসন। তবে ২০২৩ সালের শেষ থেকে আগত প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গাসহ কারও জন্য মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নেই।
এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে বসবাসরত সকল মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় ১২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে—
১. জবাবদিহিতা ও বিচারের নিশ্চয়তা: জুলাই বিপ্লব ও গত ১৫ বছরে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন— যেমন গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা। আইসিটি সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আইসিটির স্বাধীনতা ও শক্তি নিশ্চিত করতে হবে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সাময়িক স্থগিতাদেশ দেওয়া উচিত।
২. নিরাপত্তা খাতে সংস্কার: র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করা এবং ডিজিএফআই’র ক্ষমতা সীমিত করা, বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সামরিক কর্মীদের প্রত্যাহার।
৩. গুমের অপরাধ নির্ধারণ ও তদন্ত কমিশন শক্তিশালীকরণ: গুমকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী অপরাধ ঘোষণা করা, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ পাস করা এবং কমিশনকে পর্যাপ্ত সময় ও সম্পদ দেওয়া।
৪. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার: প্যারিস প্রিন্সিপলে অনুযায়ী রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন গঠন।
৫. ব্যক্তির স্বাধীনতা রক্ষায় আইন সংস্কার: ২০২৫ সালের সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ ও অন্যান্য দমনমূলক আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মান অনুযায়ী সংশোধন বা বাতিল।
৬. ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নজরদারি সীমিতকরণ: পারসোনাল ডাটা প্রোটেকশন ও ন্যাশনাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট অধ্যাদেশ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংশোধন।
৭. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক সুরক্ষা: সাংবাদিকদের হয়রানি, গ্রেপ্তার বা হামলা থেকে রক্ষা, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন।
৮. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার: আগস্ট ২০২৪-এর আগে ও পরে দায়ের হওয়া সব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা পর্যালোচনা ও বাতিল করা।
৯. আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার।
১০. সিভিল সোসাইটি ও এনজিও স্বাধীনতা: এনজিও বিষয়ক ব্যুরো সংস্কার, বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন পুনর্বিবেচনা।
১১. রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা: জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো বন্ধ, ক্যাম্পে চলাচল, জীবিকা ও শিক্ষার ওপর সীমাবদ্ধতা কমানো।
১২. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে সহযোগিতা: আইসিসির চলমান তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা ও অভিযুক্তদের হস্তান্তর নিশ্চিত করা।
































