দুর্নীতির মামলা নিয়ে বহাল এলজিইডি কর্মকর্তা!
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৪৬:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
- / 429
দুর্নীতির দুটি মামলা মাথায় নিয়েও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক কর্মকর্তা। রফিকুল হাসান নামের ওই কর্মকর্তা সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ “ঘূর্ণিঝড় আম্পান পুনর্বাসন প্রকল্প”- এর পরিচালক।
অভিযোগ রয়েছে, ফরিদপুর জেলায় বাড়ি হওয়ায় বিগত সরকারের সময়েও এই কর্মকর্তা ছিলেন বেশ প্রভাবশালী। সরকার পরিবর্তন ঘটলেও এই কর্মকর্তার দৌড়াত্ব এখনো কমেনি।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দে অনিয়ম ও বিলম্বে জড়িত এই কর্মকর্তা। অভিযোগ দেয়ার পরেও তিনি তদারকির চেয়ে ‘উপর মহল’ খুশি রাখাতেই ব্যস্ত থাকেন।
প্রশ্ন উঠছে, দুদকের মামলার আসামি হয়েও কীভাবে তিনি দেশের অন্যতম সংবেদনশীল প্রকল্পের দায়িত্বে বহাল থাকেন? প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড় আম্পান- বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ধ্বংসের এক ভয়াল স্মৃতি। সেই ক্ষত মেরামতের দায়িত্বে সরকার, প্রায় ৫,৯০৫ কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছিলো সরকার। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের দুর্ভোগ লাঘব, অবকাঠামো পুর্ণগঠন। সেটির ভাগ্যও এখন অনিশ্চিত।
১৯৯৫ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে এলজিইডিতে যোগদান করেন রফিকুল হাসান। এরপর এই কর্মকর্তা যখন যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানেই দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। শুধু তিনি একা নন; দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই মেলেনি তার স্ত্রী ও স্বজনরাও। নিজের পদমর্যাদার অপব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এই কর্মকর্তার নামে রাজধানীর জাপান গার্ডেন সিটিতে একটি বিলাশবহুল ফ্ল্যাটের তথ্য মিলেছে। এক কোটি ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয়ে এই ফ্ল্যাটটি কিনলেও সম্পদ বিবরণীতে মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৫০ টাকা। এর মাধ্যমে তিনি ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার ৬০০ টাকা গোপন করেছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে। এছাড়া জীবন বিমা প্রিমিয়ামে চার লাখ টাকার তথ্যও তিনি গোপন করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয় ২০১৯ সালে যখন তিনি এলজিইডি’র বরিশাল কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে আসে আরও চমকপ্রদ তথ্য।
দুদক সূত্রে আরও জানা গেছে, মো. রফিকুলের নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ ৯৬ হাজার ৬০ টাকা। তাঁর বৈধ আয় ৯৩ লাখ ৯৮ হাজার ৩৩৬ টাকা। পারিবারিক ও অনান্য ব্যয় ৫০ লাখ ৫ হাজার ১৪৩ টাকা। তাঁর কাছে ১ কোটি ৩৭ লাখ ২ হাজার ৮৬৭ টাকা মূল্যের অসংগতিপূর্ণ সম্পদ রয়েছে। ফ্ল্যাটের মূল্য বাবদ তিনি যে টাকা পরিশোধ করেছেন এবং আয়ের উৎস দেখিয়েছেন, তা জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
এ ছাড়া জীবন বিমা প্রিমিয়াম মাল্টিপল পেমেন্ট পলিসির স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১১টি কিস্তিতে তিনি ১৭ লাখ ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও সম্পদ বিবরণীতে ১৩ লাখ ৫ হাজার টাকা দেখিয়েছেন। এখানেও তিনি চার লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন।
দুদক এখানেই থেমে থাকেনি। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে রফিকুল হাসানের স্ত্রী কানিজ ফাতেমার বিরুদ্ধেও। তদন্তে জানা গেছে, তাঁর সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখিত তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বামী রফিকুলের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ, প্রবাসে থাকা ভাইদের পাঠানো টাকা এবং কৃষি খাতের আয়- যার অনেক অংশই অসত্য ও অসংগতিপূর্ণ।
অনুসন্ধানে দুদক নিশ্চিত হয়েছে যে, কানিজ ফাতেমার নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩৮ লাখ ৯২ হাজার ৭৫১ টাকা, যা মূলত রফিকুল হাসানের ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত। এমনকি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে জমা দেওয়া তাঁদের সম্পদ ঘোষণাতেও দুদক বিভিন্ন অসামঞ্জস্য ও ভিন্নতা খুঁজে পেয়েছে।
এসব অসঙ্গতির ঘটনায় গত বছর ৩০ জুলাই জ্ঞাত আয়ের অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রফিকুল হাসান ও তাঁর স্ত্রী কানিজ ফাতেমার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো- দুর্নীতির এমন গুরুতর অভিযোগ সত্ত্বেও, রফিকুল হাসান এখনও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে। এই প্রকল্পের আওতায় ১৪টি জেলার ৬৯টি উপজেলায় হাজার হাজার কোটি টাকার রাস্তা, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ চলছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক রফিকুল হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে জানতে এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি।




































