গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন
যুদ্ধই এক ধরনের ব্যবসা
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:১৪:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ অক্টোবর ২০২৫
- / 111
জঙ্গলে দীর্ঘদিন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকা কলম্বিয়ান ভাড়াটে সৈন্যদের কাছে সুদানের সংঘাত শুরুতে অনেক ধীর মনে হয়েছিল। আফ্রিকার এই দেশে যুদ্ধ করার জন্য নিয়োগ পাওয়া শত শত কলম্বিয়ানদের একজন কার্লোস। তিনি জানান, ‘সুদানে তারা রাতে ঘুমায়- এমনকি পাহারাও দেয় না, কারণ সবাই বিছানায় চলে যায়।’
সুতরাং, যখন কার্লোস ও তার সহযোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছালেন, তারা অন্ধকার ভেদ করে শত্রুপক্ষের এলাকার আরো গভীরে অগ্রসর হলেন।
তিনি বলেন, ‘তারপর থেকেই লড়াই বাড়তে শুরু করল- আর সঙ্গে মৃতের সংখ্যাও।’
কার্লোস এই বছরের শুরুতে সুদানে পৌঁছান। সেখানে প্রায় দুই বছর ধরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে; যেখানে সরকারি সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (আরএসএফ)-এর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, এই সংঘাত সুদানকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে নিমজ্জিত করেছে; যেখানে দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, নারী ও শিশুদের অপহরণ ও ধর্ষণ করা হয়েছে এবং প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনা।
প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এখনো এল ফাশের শহরে আটকা পড়ে আছে, যা উত্তর দারফুরের রাজধানী এবং দারফুর অঞ্চলে সেনাবাহিনীর শেষ প্রধান ঘাঁটি। শহরটি ৫০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ। সেখানে প্রায় দেড় বছর ধরে কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি এবং শিশুরা পশুখাদ্য খেয়ে বেঁচে আছে।
সেখানেই এখন পাঠানো হয়েছে কলম্বিয়ানদের, যারা আরএসএফ-এর হয়ে লড়ছে। কার্লোসের ভাষায়, ‘যুদ্ধই এক ধরনের ব্যবসা।’
ভাড়াটে সৈন্যদের এই অংশগ্রহণের খবর প্রথম প্রকাশ পায় গত বছর, যখন বোগোটাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম লা সিলা ভাসিয়া জানায় যে ৩০০-রও বেশি সাবেক কলম্বিয়ান সেনা সুদানে যুদ্ধ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন—এর পর কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নজিরবিহীনভাবে ক্ষমা চায়।
তবে কলম্বিয়ানদের ভূমিকা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমিত ছিল না, তারা সুদানি শিশু সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং দেশটির সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুত শিবির জামজামে তাদের দেখা গেছে। এপ্রিল মাসে আরএসএফ ওই শিবিরে হামলা চালিয়ে ৩০০ থেকে ১,৫০০ জনকে হত্যা করে।
জাতিসংঘ একে যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা বলে বর্ণনা করে।
দারফুরের জামজাম শিবিরের মুখপাত্র মোহাম্মদ খামিস দৌদা সুদান ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নিজের চোখে এক দ্বৈত অপরাধ দেখেছি: প্রথমে আরএসএফ আমাদের জনগণকে বাস্তুচ্যুত করেছে, এখন তাদের স্থানে বিদেশি ভাড়াটে সৈন্যরা শিবির দখল করেছে।’
কিছু কলম্বিয়ান প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, তাদের বলা হয়েছিল তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতে তেল স্থাপনায় নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করবেন, কিন্তু কার্লোস জানতেন যে তিনি যুদ্ধে যাচ্ছেন—তবে আফ্রিকার কোন দেশে, সেটা জানতেন না।
তার যাত্রা শুরু হয় বোগোটায় চিকিৎসা পরীক্ষা দিয়ে, যেখানে তিনি মাসে ২,৬০০ ডলারের চুক্তিতে সই করেন। এরপর তাকে ইউরোপ হয়ে ইথিওপিয়ায়, সেখান থেকে সোমালিয়ার বসাসো শহরে অবস্থিত এক আমিরাতি সামরিক ঘাঁটিতে নেওয়া হয়। পরে তাকে পাঠানো হয় সুদানের নিয়ালা শহরে—যা এখন কলম্বিয়ান ভাড়াটে সৈন্যদের কেন্দ্র হিসেবে কুখ্যাত।
কার্লোস স্বীকার করেছেন যে, তার প্রথম কাজ ছিল সুদানি সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া—যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার প্রশিক্ষণার্থী ছিল, কিছু প্রাপ্তবয়স্ক, কিন্তু বেশিরভাগই শিশু—অনেক অনেক শিশু। এই শিশুরা আগে কখনও অস্ত্র ধরেনি। আমরা তাদের রাইফেল, মেশিনগান, আরপিজি ব্যবহার শেখাতাম। তারপর তাদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হতো। আমরা তাদের যুদ্ধ করতে নয়, মরতে পাঠাচ্ছিলাম।’
তিনি বলেন, শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ছিল ‘ভয়ঙ্কর ও পাগলাটে’ অভিজ্ঞতা, কিন্তু ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুদ্ধ এমনই।’
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর কলম্বিয়া বিষয়ক সিনিয়র বিশ্লেষক এলিজাবেথ ডিকিনসন বলেন, কলম্বিয়ার আধা-শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সশস্ত্র সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে। তাদের সৈন্যরা শুধু ভালোভাবে প্রশিক্ষিতই নয়, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে কঠিন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তাই তারা সবসময় প্রস্তুত থাকে।
কলম্বিয়ান সাবেক সামরিক সদস্যরা ইরাক, আফগানিস্তান এবং বর্তমানে ইউক্রেনেও যুদ্ধ করেছেন। গত বছর নভেম্বরে কলম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রায় ৫০০ নাগরিক রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ইউক্রেনে গেছেন।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো ভাড়াটে যুদ্ধকে বর্ণনা করেছেন ‘মানুষকে পণ্য বানিয়ে হত্যার ব্যবসা’ হিসেবে। তিনি এই ব্যবসা নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকার করেছেন। তবে প্রাক্তন যোদ্ধাদের অনেকেই সমাজে পুনঃএকীভূত হতে ব্যর্থ হন, আর উচ্চ আর্থিক প্রলোভনের কারণে এই ব্যবসা শিগগিরই বন্ধ হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ডিকিনসনের মতে, যদি কেউ ১৮ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় এবং ২০ বছর কাজ করে, তবে অবসর নেওয়ার সময় তার বয়স ৪০ বছরও হয় না। তখনও তার ১৫–২০ বছর যুদ্ধ করার মতো বয়স থাকে। কিন্তু কলম্বিয়ার অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের জন্য সহায়তা কাঠামো খুবই দুর্বল, বিশেষ করে যখন অন্য সংগঠনগুলো এত বড় আর্থিক প্রস্তাব দেয়।
বিশেষজ্ঞ শন ম্যাকফেইট বলেন, বিংশ শতাব্দীর বেশিরভাগ সময় বিশ্বের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভাড়াটে সৈন্যরা প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এই ব্যবসা আবার দ্রুত বাড়ছে।
তিনি বলেন, ‘এটি বিশ্বের প্রাচীনতম পেশাগুলোর একটি। আমরা এক প্রকার মধ্যযুগীয় যুগে ফিরে যাচ্ছি, যেখানে অতিধনীরা নিজেরাই সুপারপাওয়ারে পরিণত হতে পারে।’





































