সহযোগিতায় বিএনপি নেতারা
আ.লীগ নেতার লাইসেন্সে ভারতে যাচ্ছে ইলিশ
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৩২:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 90
এক-দুটি নয়, ৪টি লাইসেন্সে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি পেয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা নিরব হোসেন টুটুল। ইতোমধ্যে তার লাইসেন্সে কলকাতায় গেছে প্রায় ২ হাজার কেজি ইলিশ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কলকাতায় পালিয়ে যান টুটুল। সেখান বসেই নিয়ন্ত্রণ করছেন বরিশালের পোর্ট রোডের ইলিশ মোকামের ব্যবসা। এ কাজে তাকে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন নানা সুযোগ-সুবিধা। যদিও এসব অভিযোগ স্বীকার করেননি ওই বিএনপি নেতা। আড়ত মালিক হিসেবে টুটুলের ব্যবসা চলছে এবং এটি মোকামের নিয়ম বলে দাবি করেছেন মৎস্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের বরিশাল মহানগর কমিটির সদস্য সচিব কামাল সিকদার।
সাদিক আব্দুল্লাহর সময়ে বরিশালের দ্বিতীয় মেয়র হিসেবে পরিচিত টুটুল, মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক ছিলেন। শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই, সাবেক মন্ত্রী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর পুত্র এবং তৎকালীন মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর ডান হাত ছিলেন তিনি। অনেকে তাকে সাদিকের ক্যাশিয়ারও বলতেন। নগরীর হাট-ঘাট-বাজার-বাসস্ট্যান্ড সবকিছুই ছিল টুটুলের নিয়ন্ত্রণে। এসব স্থাপনার ইজারাদারি নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে সাদিক আব্দুল্লাহর আয়-বাণিজ্যের বিষয়গুলো দেখতেন তিনি।
কুয়াকাটা ভ্রমণে গিয়ে সাদিকের পিস্তলের গুলিতে ডান পা হারানো টুটুলকে বরিশালে সবাই ডাকত ‘টুটুল মামা’ নামে। পা হারানোর পর কিছুদিন ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলার পর পরে লাগিয়ে নেন কৃত্রিম পা। এক পায়ের টুটুল তখন ছিল নগরীর আতঙ্ক। তার আয়ের প্রধান উৎস ছিল মাছের ব্যবসা। ছিলেন বরিশাল ইলিশ মোকামের অঘোষিত সম্রাট। মাছের বাজার ও বিআইডব্লিউটিএর ঘাটসহ পুরো এলাকার ইজারাদার ছিলেন তিনি। ইলিশসহ সব মাছের কেনা-বেচা চলত তার হুকুমে, দর পর্যন্ত ঠিক করতেন। বৈধ ও অবৈধ উপায়ে এভাবে শত কোটি টাকার মালিক হওয়া টুটুলের বরিশালে রয়েছে ১০ তলা বাড়িসহ বিপুল ভু-সম্পত্তি। কলকাতার জামাইয়ের কাছেও রয়েছে বাড়িসহ নানা স্থাপনা।
৫ আগস্টের পর ভারতে পালাতে গিয়ে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে ধরা পড়েন টুটুল। রহস্যজনকভাবে তখন ছাড়া পেয়ে চলে যান কলকাতায়। তারপর থেকে আছেন সেখানেই। কলকাতা থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন বরিশালের ইলিশ মোকামের ব্যবসা। বরিশালে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে হয়েছে ৭টি মামলা।
এ বছর ভারতে ইলিশ রপ্তানির জন্য ৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিয়েছে সরকার, তার মধ্যে ৪টি টুটুলের। এগুলো হলো—মাহিমা এন্টারপ্রাইজ, তানিসা এন্টারপ্রাইজ, নাহিয়ান এন্টারপ্রাইজ এবং এআর এন্টারপ্রাইজ। মাহিমা ও তানিসা টুটুলের দুই মেয়ের নামে লাইসেন্স করা হয়েছে। বাকি দুটি লাইসেন্স করা হয়েছে তার ছোট মামা বাবর ও মামাতো ভাই আকাশের নামে। ২০১৯ সালে পূজার সময় বাংলাদেশ থেকে প্রথমবার ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেয় সরকার, তখন থেকেই প্রতিবছর রপ্তানি করছেন টুটুল। এ বছরও তার ৪টি প্রতিষ্ঠান রপ্তানির অনুমতি পেয়েছে।
শুধু অনুমতি পাওয়া নয়, ভারতে ইলিশ রপ্তানিও শুরু করেছে টুটুলের প্রতিষ্ঠান। বেনাপোল স্থলবন্দরের মৎস্য কোয়ারেন্টাইন বিভাগের কর্মকর্তা আকসাদুল ইসলাম জানান, “তানিসা এন্টারপ্রাইজ বৃহস্পতিবার ১,৩৬০ কেজি ইলিশ পাঠিয়েছে ভারতে।” অন্য একটি সূত্র জানায়, বুধবার থেকে শুরু হওয়া রপ্তানির আওতায় দুই দিনে প্রায় ২ হাজার কেজি ইলিশ ভারতে পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্য তিনটি লাইসেন্সে এখন পর্যন্ত মাছ যায়নি। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এ বছর একটি লাইসেন্সের বিপরীতে ২০–৫০ টনের বেশি ইলিশ পাঠানো যাবে না। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ৪টি লাইসেন্সে রপ্তানির অনুমতি নিয়েছেন টুটুল, যাতে কম করে হলেও ২শ টন ইলিশ পাঠানো সম্ভব হয়, যার দাম পড়বে প্রায় ৩০ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
পোর্ট রোডে থাকা ইলিশ মোকামের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, টুটুলের পক্ষে মোকাম থেকে মাছ সংগ্রহ করছেন তার লোকজন। হাসিনা সরকার পতনের পরও যারা রয়েছেন, তারা বহাল তবিয়তে ব্যবসা চালাচ্ছেন। ৫ আগস্টের আগের মতোই মোকামে আসা এলসি সাইজের (৬শ থেকে ৯শ গ্রাম) প্রায় সব ইলিশ কিনে নিচ্ছেন তারা। এখনো টুটুলের রাজত্ব চলছে। ভারতে অবস্থান করেই চালাচ্ছেন ব্যবসা।
বেশ কয়েকজন আড়তদার বলেন, “বর্তমানে যারা মোকাম নিয়ন্ত্রণ করছেন, তারাই মূলত টুটুলের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। রপ্তানি ব্যবসাও চলছে তাদের সহযোগিতায়। ৫ আগস্টের পর মোকামের সভাপতি-সম্পাদক পদে বসা দুজনই বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের নেতা। তারা চাইলে এখান থেকে উৎখাত বা ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারতেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা হয়নি।”
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কলকাতায় অবস্থানরত নিরব হোসেন টুটুলের ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ধরেননি। মৎস্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মৎস্যজীবী দলের মহানগর সদস্য সচিব কামাল সিকদার বলেন, “এই মোকাম তো আমার একার নয়। এখানে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ সব দল আছে। আমি চাইলেই কারও ব্যবসা বন্ধ করতে পারি না। টুটুল নেই, কিন্তু তার লোকজন ব্যবসা চালাচ্ছে। এখানে আমার কি করার আছে? তাছাড়া ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে তো সরকার। আমি বাধা দেওয়ার কি করার আছে?”
সূত্র: যুগান্তর
































