ভুল স্বীকার করা নবীদের গুণ
- সর্বশেষ আপডেট ১০:২৮:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 111
মানুষের জীবনে ভুল হওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয়। পৃথিবীর প্রথম মানুষও ভুল করেছিলেন, সেই ধারাবাহিকতায় সব মানুষেরই ভুল হতে পারে। তবে ভুলের পর তা স্বীকার করা ও অনুতপ্ত হওয়াই মনুষ্যত্বের পরিচয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে। আর ভুল করার পর যারা তওবা করে তারা উত্তম।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫১)
ভুল স্বীকার না করা এবং ভুলের ওপর অটল থাকা আল্লাহ পছন্দ করেন না। বরং ভুল করার পর বান্দা অনুতপ্ত হবে, এটাই আল্লাহর পছন্দ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যদি তোমরা পাপ না করতে তবে আল্লাহ এমন মাখলুক বানাতেন, যারা পাপ করত এবং আল্লাহ তাদের মাফ করে দিতেন।” (সহিহ মুসলিম: ৬৮৫৬)
ইসলামের শিক্ষা হলো—ভুল স্বীকার করা মানুষের দুর্বলতা নয়। কারণ সৃষ্টিগতভাবেই মানুষের মধ্যে ভুল করার প্রবণতা রয়েছে। তাই ভুল হলে স্বীকার করে নেওয়াই যৌক্তিক এবং উত্তম বান্দার বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “প্রতিটি মানুষ ভুল করে, সর্বোত্তম ভুলকারী সে-ই, যে অনুতপ্ত হয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে।” (সুনানে তিরমিজি: ২৪৯৯)
ভুল স্বীকারকারীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ক্ষমা লাভের উপযুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, “এবং অপর কতক লোক নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। তারা এক ভালো কাজের সঙ্গে অন্য মন্দ কাজ মিশ্রিত করেছে। আল্লাহ হয়তো তাদের ক্ষমা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা তাওবা: ১০২)
ভুল স্বীকারকারীর ব্যাপারে বান্দাদের প্রতিও মহান আল্লাহর নির্দেশ রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, “যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন।” (সুরা আলে ইমরান: ১৩৪)
ভুল স্বীকারের গুণ মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। একজন ব্যক্তি যখন সাহসের সঙ্গে নিজের ভুল স্বীকার করে এবং আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়, তখন তা অন্যের মনে তার প্রতি সম্মান বাড়িয়ে দেয়। অকপট স্বীকারোক্তি সাময়িকভাবে কিছুটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করলেও তার ফল সুদূরপ্রসারী।
আবু দারদা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর মধ্যে বিতর্ক হয়। আবু বকর (রা.) ওমর (রা.)কে রাগিয়ে দেন। ওমর (রা.) রাগান্বিত হয়ে চলে গেলে আবু বকর (রা.) তার কাছে ক্ষমা চাইতে থাকেন। কিন্তু ওমর (রা.) ক্ষমা না করে দরজা বন্ধ করে দেন। পরে আবু বকর (রা.) নবী করিম (সা.)-এর কাছে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তখন রাসুল (সা.) বলেন, “তোমাদের এই সঙ্গী আবু বকর আগে কল্যাণ লাভ করেছেন।” (সহিহ বুখারি: ৪৬৪০)
ভুল স্বীকার করা নৈতিক শক্তির প্রমাণ। এটি দুর্বলতা নয়; বরং শক্তির পরিচায়ক। ইসলামের দৃষ্টিতে ভুলের ওপর অটল থাকা নিন্দনীয়। আল্লাহ ভুল স্বীকারকারীদের ক্ষমা করেন। এর সবচেয়ে বড় উপকার হলো, আল্লাহর ক্ষমা লাভ করা সহজ হয়ে যায়।
কোরআনে উল্লেখ আছে, আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহর আদেশ অমান্য করে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেলেছিলেন। পরে অনুতপ্ত হয়ে তারা বলেছিলেন, “হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।” (সুরা আরাফ: ২৩) আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন। পক্ষান্তরে ইবলিস অহংকারবশত নিজের ভুল স্বীকার করেনি; বরং আল্লাহর সঙ্গে বিতর্ক করে। ফলে সে চিরদিনের জন্য অভিশপ্ত হয়। এখান থেকে শিক্ষা মেলে—ভুল স্বীকার করা নবীদের গুণ, আর ভুলে অটল থাকা শয়তানের বৈশিষ্ট্য।
ইউনুস (আ.) নিজের সম্প্রদায়ের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা না করেই চলে যান। পরে মাছের পেটে বন্দি হয়ে অনুতপ্ত হৃদয়ে দোয়া করেন, “তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তুমি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।” (সুরা আম্বিয়া: ৮৭) আল্লাহ তার এই স্বীকারোক্তি কবুল করে তাকে বিপদ থেকে মুক্ত করেন।
হজরত আবু বকর (রা.)-এর জীবনের আরেকটি ঘটনা থেকে আমরা শিখতে পারি। একবার জমি-সংক্রান্ত বিরোধে তিনি রাবিআহ আল-আসলামি (রা.)-কে কষ্টদায়ক কথা বলেন। সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হয়ে তিনি প্রতিশোধ নিতে রাবিআহকে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাবিআহ (রা.) অস্বীকৃতি জানান। পরে আবু বকর (রা.) নবী করিম (সা.)-এর কাছে যান। নবী (সা.) রাবিআহকে বলেন, “না, তুমি কটু কথা বলবে না; বরং বলবে—হে আবু বকর! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন।” এই শিক্ষা শুনে আবু বকর (রা.) অশ্রুসিক্ত হন। (মুসনাদ আহমাদ: ১৬৬২৭)
ভুল স্বীকার না করলে তার পরিণতি ভালো হয় না। যে ভুল স্বীকার করে না, সে নতুন ভুলের দিকে ধাবিত হয়। একই ভুল বারবার করতে থাকে, ফলে উন্নতি থেমে যায়। আবার অহংকার জন্ম নেয়, মানুষ নিজেকে নির্ভুল ভাবতে শুরু করে। আর এ অহংকার ধ্বংস ডেকে আনে।
সর্বোপরি, ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি এমন এক শক্তি, যা মানুষকে নৈতিকভাবে দৃঢ় করে। যে ব্যক্তি ভুলকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হিসেবে নেয়, সে-ই দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হয়।
লেখক: ইমাম ও খতিব





































