কবর থেকে তুলে পোড়ানো হলো ‘নুরাল পাগলা’র লাশ
- সর্বশেষ আপডেট ০৯:৫৫:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 352
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নিজেকে ‘ইমাম মাহাদি’ দাবি করা নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’র কবর থেকে মরদেহ তুলে পদ্মার মোড়ে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর ঈমান-আকিদা রক্ষা কমিটির ব্যানারে আয়োজিত বিক্ষোভ শেষে উত্তেজিত জনতা তার দরবার শরিফে হামলা চালায়। এতে ভক্ত, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সাধারণ মানুষসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন।
এ সময় রাসেল মোল্লা (২৮) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
নুরুল হক দীর্ঘদিন ধরে গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে নিজ বাড়িতে একটি দরবার শরিফ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অনুসারীদের কাছে তিনি ছিলেন ‘নুরাল পাগলা’।
চলতি বছরের ২৩ আগস্ট ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা গেলে তাকে দরবার প্রাঙ্গণে মাটি থেকে উঁচু বেদিতে দাফন করা হয়। যেখানে কারা শরীফের আদলে কবর তৈরি করা হয়।
এ নিয়ে স্থানীয় আলেম সমাজের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা কবর সমতল করা, দেয়ালের রঙ পরিবর্তন ও ‘ইমাম মেহেদি দরবার শরিফ’ লেখা সাইনবোর্ড অপসারণের দাবি জানায়।
ঈমান-আকিদা রক্ষা কমিটি সংবাদ সম্মেলন করে নুরুল হকের দরবারে অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগ তোলে এবং আল্টিমেটাম দেয় শুক্রবার জুমার নামাজের পর কর্মসূচি পালনের।
প্রশাসন একাধিক বৈঠক করে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করে এবং দরবার কর্তৃপক্ষ কবর নিচু করার মতো কিছু দাবি পূরণ করে।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে আনসার ক্লাব মাঠ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। বিক্ষোভকারীরা দরবারের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় সংঘর্ষ শুরু হয়।ভাঙচুর করা হয় গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি, পুলিশের দুটি গাড়ি এবং অন্যান্য স্থাপনা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষুব্ধ জনতা দেয়াল টপকে দরবারে প্রবেশ করে ইটপাটকেল ছোড়ে, ভাঙচুর চালায় এবং ভক্তদের মারধর করে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে যখন তারা কবর থেকে নুরুল হকের মরদেহ তুলে এনে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পদ্মার মোড়ে প্রকাশ্যে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত ২২ জনকে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে তিনজনকে ভর্তি রেখে ১৯ জনকে গুরুতর অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহতদের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পাঁচ পুলিশ সদস্য ও প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা রয়েছেন।
ঘটনার পর রাজবাড়ীর পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। তবে স্থানীয়দের মধ্যে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদুর রহমান বলেন, “আমরা বারবার চেষ্টা করেছি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বিক্ষুব্ধরা দরবারে হামলা চালায়, ভাঙচুর করে এবং মরদেহ পুড়িয়ে দেয়।”
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি রাকিবুল ইসলাম বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটবে তা অনুমান করা যায়নি। আমাদের কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন।”
লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। একইসঙ্গে এ জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে সরকার। শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অন্তর্বর্তী সরকার গোয়ালন্দে নুরুল হক মোল্লা, যিনি নুরাল পাগলা নামেও পরিচিত, তার কবর অবমাননা ও মরদেহে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানায়। এই অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজটি আমাদের মূল্যবোধ, আমাদের আইন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য সমাজের মৌলিক ভিত্তির ওপর সরাসরি আঘাত।’
এতে আরও বলা হয়, ‘এ ধরনের বর্বরতা কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না। অন্তর্বর্তী সরকার আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এবং প্রতিটি মানুষের জীবনের পবিত্রতা, জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরেও রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা জনগণকে আশ্বস্ত করছি যে, এ জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। যারা এই ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, ঘৃণা ও সহিংসতাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করুন, সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোন এবং ন্যায়বিচার ও মানবতার আদর্শকে সমুন্নত রাখতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা গড়ে তুলুন।’
































